যৌন শিক্ষার ভয় ভাঙছে, তবে যেতে হবে অনেক দূর | আলাপ | DW | 10.11.2015
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

যৌন শিক্ষার ভয় ভাঙছে, তবে যেতে হবে অনেক দূর

সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলকুচা এলাকার ঘোড়াচড়া উচ্চ বিদ্যালয়৷ এই বিদ্যালয়ে ঘটে গেছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা৷ প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলটি স্বাস্থ্য বিশেষ করে যৌন শিক্ষার ক্ষেত্রে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে৷ কথায় বলে না, ‘শূন্য থেকে শুরু'?

আসলে স্কুলটিতে যৌন শিক্ষা আজ আর কোনো লজ্জার বিষয় নয়৷ প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা সহজেই তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন কখন, কী করতে হবে৷ কোন ধরণের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ আর শিক্ষার্থীরা বুঝে গেছে বয়ঃসন্ধিকাল কাকে বলে৷ বুঝে গেছে এর লক্ষণ৷ এটা যে স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নিয়ম – তা আর তাদের এখন বুঝতে বাকি নেই৷ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা ইয়াসমিন বললেন, ‘‘আমার মা-বাবাও এখন বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে কথা বলেন স্বাভাবিকভাবেই৷ আমিও আমার মাকে জানাই, কথা বলি৷''

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক সাইদুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘শুরুতে অবশ্য বিষয়টি এত সহজ ছিল না৷ শিক্ষকরাও প্রথমে যৌন শিক্ষা বা প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টিকে সহজেভাবে নিতে পারেননি৷ তাই তাদের আগে বোঝাতে হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, উপজেলা প্রশাসনকেও বোঝাতে হয়েছে৷ আর তাদের মাধ্যমেই স্কুলের টয়লেট এবং পানির সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ এমনকি স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্যও ফান্ড দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন৷''

তবে বাংলাদেশের সব এলাকাতেই যে একইরকম চিত্র, তা কিন্তু নয়৷ বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন অন্তর্ভুক্ত হলেও, স্থানীয়ভাবে পাঠদানের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়তে হয়৷ প্রথমত শিক্ষকরা এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি৷ ছাত্র-ছাত্রীরাও বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে না৷ তাছাড়া কখনো কখনো অভিভাবকরাও আপত্তি করেন৷ তাই অনেক শিক্ষক ক্লাসে এই বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত আর পড়ান না৷''

বাংলাদেশে ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুয়ায়ী, ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে৷ শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নামের বইয়ে একটি অধ্যায় বরাদ্দও করা হয়েছে৷

সপ্তম শ্রেণির বইয়ে বিষয়গুলো এভাবে রাখা হয়েছে – আমাদের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, ভ্রান্ত ভাবনা, নিরাপদ থাকার উপায়, ঝুঁকি ও নিরাপত্তা প্রভৃতি৷ এছাড়া এইডস ও এইচআইভি নিয়েও আলাদা অধ্যায় আছে৷

বাংলাদেশ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক টেক্সটবুক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র পাল ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমরা প্রতিবছরই লেখাগুলো ‘আপডেট' করি৷ যদি কোনো ভুল থাকে, তা সংশোধন করি৷ নতুন বছরের বইয়ে স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আরো নতুন লেখা এবং তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি৷

Change Makers Studentinnen mit Grundgesetz

চলছে যৌন শিক্ষার ক্লাস...

‘ওয়েলনেস অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ হেল্থ' বিশেষজ্ঞ ডা. রিফাত লুসি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘১১ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল৷ আমরা ১১ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত যদি ধরি, তাহলে তারা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৩ ভাগ৷ আর এদের জন্য যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা যে কোনো শিক্ষার মতোই সমান প্রয়োজন৷ এটা না থাকায় অনেকেই ভুল ধারণা নিয়ে বড় হয়, যা তাদের পরবর্তী জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷ তাই এই শিক্ষা স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য খুবই প্রয়োজন৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘এই শিক্ষা না থাকা মেয়ে বা ছেলে উভয়েরই অল্প বয়সে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ এর বাইরে নানা রোগ সম্পর্কেও তারা সচেতন থাকে না৷''

শিক্ষা গবেষক এবং ‘বয়ঃসন্ধিকাল ও শিক্ষা' বইয়ের লেখক ফারহানা মান্নান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যৌনশিক্ষা একটি জরুরি বিষয়৷ বয়ঃসন্ধিকালে মেয়ে এবং ছেলে উভয়েরই নানা ধরণের শারীরিক পরিবর্তন আসে৷ তারা নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়৷ তাদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়৷ তারা এই পরিবর্তন নিয়ে তুলনা করে হতাশায় ভুগতে পারে৷ কিন্তু বিষয়টি যদি তাদের কাছে পরিষ্কার থাকে৷ তারা যদি জানে যে এটা স্বাভাবিক পরিবর্তন, তাহলে তাদের মধ্যে কোনো সংকোচ থাকবে না৷ তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে৷''

তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের দেশে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বা শিক্ষা না থাকায় বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েরা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়৷'' তাই তাঁর মতে, ‘‘যৌন শিক্ষার সঙ্গে যদি ‘জেন্ডার' বিষয়টিও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে অনেক অপরাধও কমে আসবে৷ ‘ইভ টিজিং'-সহ নানা ধরনের যৌন হয়রানি কমবে৷ তবে শিক্ষা হতে হবে গল্পের মতো করে৷''

বাংলাদেশে পাঠ্য পুস্তকে যে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা থেকে ফল পেতে আরো অনেক দূর যেতে হবে৷ কারণ একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী এরইমধ্যে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে৷ তারা পাঠ্যপুস্তক থেকে যৌন শিক্ষা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে৷ চালাচ্ছে নানা অপপ্রচারও৷

এ নিয়ে টেক্সটবুক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র পাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা অপপ্রচারে কান দেই না৷ কারণ দেশের মানুষের বড় একটি অংশ এখন বুঝতে পারছেন যে, কেন যৌন শিক্ষা প্রয়োজন৷ তাঁদের ভয় এবং লজ্জা ভাঙতে শুরু করেছে৷ তবে এর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রয়োজন৷''

অন্যদিকে ডা. রিফাত লুসি মসে করেন, ‘‘শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, সবাইকে এই শিক্ষা নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে৷ মনে রাখতে হবে, যৌন শিক্ষা মানে যৌনতা নয়৷ যৌন শিক্ষা আমাদের স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য৷’’

আপনি কি পাঠ্য-পুস্তকে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে? জানিয়ে দিন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন