1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

যেসব কারণে বিচারহীনতা আজ চরমে

বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশে একটি পরিচিত কথা৷ বলা হয়ে থাকে, এই সংস্কৃতির কারণেই এখানে অপরাধীরা বেপরোয়া৷ তারা আইনকে গুরুত্ব দেয় না, অপরাধ করতে ভয় পায় না৷ তারা মনে করে অপরাধ করে পার পাওয়া যায়৷

সম্প্রতি একটি মামলায় খালাসের ঘটনা বেশ সমালোচিত হয়েছে৷ গৃহকর্মী এক শিশুকে নির্যাতনের মামলায় সস্ত্রীক খালাস পেয়েছেন ক্রিকেটার শাহাদাৎ হোসেন রাজীব এবং তাঁর স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্য৷

গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ হ্যাপী নামে এক গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে ঢাকার মিরপুর থানায় ক্রিকেটার শাহাদাৎ ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে৷ ঐ শিশুটিকে নির্যাতনের পর রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়েছিল৷ তাকে উদ্ধারের পর সে পুলিশের কাছে নির্যাতনের বর্ণনাও দেয়৷ ঐ মামলায় শাহাদাৎ এবং তাঁর স্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো হলেও পরে তাঁরা জামিন পান৷ এই মামলায় পুলিশ আদালতে দু'জনের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেয়৷ কিন্তু মামলার বিচারে গত ৬ নভেম্বর শাহাদাৎ ও তাঁর স্ত্রীকে খালাস দেন ঢাকার একটি আদালত

আদালতে নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ হলেও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি৷ তাহলে প্রশ্ন, শিশুকর্মী হ্যাপীকে নির্যাতন করেছে কারা, তাদের কি শাস্তি হবে না?

আসলে বিষয়টি অন্য৷ আর তা হলো মামলা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে হাজির করতে পারেনি পুলিশ৷ মামলার তদন্তেও ছিল ত্রুটি৷ এর সুবিধা পেয়েছে আসামিপক্ষ৷ আইনের ভাষায় ‘বেনিফিট অফ ডাউট' আসামিদের বাঁচিয়ে দিয়েছে৷ কারণ বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলা সন্দেহাতীতভাবে সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হয়৷

অডিও শুনুন 04:00

‘মামলার তদন্তে দক্ষতার অভাবই বিচার না পাওয়ার প্রধান কারণ'

এবার আরেকটি ঘটনা৷ ২০১৪ সালের আগস্টে ঢাকার জননিরাপত্তা আদালতের বিশেষ জেলা ও দায়রা জজ ফারুক আহম্মেদ অবসরের আগের ১৮ কার্যদিবসে ২৪ মামলার রায় দেন৷ এসব মামলার আসামিদের তিনি বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন৷ এছাড়া তিনি একদিনে ১০ মামলার সব সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শেষ করেন৷ শুনানি শেষে চার থেকে দশ দিনের ব্যবধানে ২০টি মামলার নিষ্পত্তি করেন৷

মামলা খালাসের পাশাপাশি বিচারক ফারুক আহম্মেদ ঐ বছরের জুন মাসেই দাগী আসামিসহ ৪৫ জন আসামিকে জামিন দিয়েছেন৷ ছয় মাসেই খালাস দিয়েছেন ৭৭ মামলার আসামিদের৷ এছাড়া জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ১০১ জন আসামিকে জামিন দিয়েছেন৷ ২০১৩ সালে ৭৯টি মামলার নিষ্পত্তি করেছেন৷ এর মধ্যে ৬০ মামলার আসামিকে খালাস ও ১৯ মামলার আসামিদের সাজা দেন তিনি৷

এই ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় এবং তাঁর দেয়া মামলার নথিপত্র জব্দ করা হয়৷ দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর অবৈধ সম্পদের তদন্ত করছে৷

অভিযোগ প্রমাণে পুলিশের ব্যর্থতার খতিয়ান

পুলিশ সদরদপ্তরের এক হিসেবে দেখা যায়, পুলিশ অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় ৭৬ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে৷ বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ ফৌজদারি মামলা হয়৷ সিআইডির প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১১ সালে সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় ২৪ শতাংশ অপরাধীর সাজা হয়েছে৷ ৭৬ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রে আসামির বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি৷ তবে ২০০৯ সালে সাজার হার ছিল ২৩ শতাংশ৷ এ সময় পুলিশ তদন্ত করে ৪১ শতাংশ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে৷ বাকি মামলার আসামিরা তদন্ত পর্যায়েই অব্যাহতি পেয়েছে৷

অপহরণ মামলার ক্ষেত্রে এই চিত্র আরো ভয়াবহ৷ দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া ২১২ অপহরণ মামলার মধ্যে ১৯০ মামলাতে খালাস পেয়েছে আসামিরা৷ সাজা হয়েছে মাত্র ২১ মামলায়৷ ৯০ শতাংশ আসামিই এসব মামলায় খালাস পেয়েছে৷ এসব মামলায় ২,১০৩ জন আসামি ধরা পড়লেও দুই হাজার আসামিই জামিনে বেরিয়ে যায়৷ আর গত ১২ বছরে সারা দেশে দায়ের করা ২৭,০৮০টি অপহরণ মামলা হয়েছে৷ ঢাকার আদালতগুলোতে বিচারাধীন ২,৩৭৯টি অপহরণ মামলার মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ৬১২টি মামলার বিচার কাজ৷

নির্যাতনের শিকার ২২,৩৮৬ জন, শাস্তি পেয়েছেন ১০১

গত বছরের মে মাসে একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়৷ তাদের অধীনে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের' আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ বছরে ২২,৩৮৬ জন নারী ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় চিকিৎসা নেন৷ এই ঘটনাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে এ সব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫,০০৩টি৷ রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২০টি, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের৷ শতকরা হিসাবে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার ০.৪৫ শতাংশ৷ আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে গড়ে মাত্র শতকরা চারভাগ অপরাধী শাস্তি পায়৷

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, জানুয়ারি ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর আওতায় ২,০৯৫টি মামলায় নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭৪টি৷ নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় আসামি ছিলেন ৪১০ জন৷ সাজা ২৭ জন পেলেও ৩৮০ জনই খালাস পেয়ে যান৷ এরমধ্যে প্রতারণা এবং ধর্ষণ মামলা বেশি৷

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, গত ১৫ বছরে তাদের মামলায় দুই-তৃতীয়াংশ আসামি খালাস পেয়েছে৷ ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩৫,০১০ জন আসামি খালাস পায়৷ আর সাজা পেয়েছে ১৮ হাজার আসামি৷

দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলারও একই অবস্থা৷ অধিকাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান৷ চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১২৫টি মামলার মধ্যে ৬৬ মামলার আসামিরা খালাস পেয়েছেন৷ ২০১৫ সালে ৩০৬ মামলার ২০৭টিতেই আসামিরা খালাস পান৷

এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তি দায়ের করা মামলা৷ কিন্তু এখন অনেক ঘটনা আছে যেখানে মামলা দায়ের করাই অসম্ভব৷ আর মামলা হলেও আসামিরা ধরাই পড়েনা বা তাদের ধরা হয় না৷ গত ১৮ অক্টোবর ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ৬৫ বছর বয়সের মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তার আহমেদ মৃধা ও তাঁর ছেলেকে নির্মম নির্যাতন চালায় আওয়ামী লীগেরই আরেকটি প্রভাবশালী গ্রুপ৷

এই ঘটনায় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবলীগের সভাপতি, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়৷ কিন্তু তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি৷ উল্টো তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে হুমকি দিচ্ছে৷ তবে নির্যাতনের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পুলিশ কিছুটা সক্রিয় হয়েছে৷

বিচারহীনতার কারণ

উপরের যে তথ্য-উপাত্ত তাতে বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রধান কারণগুলো হলো –

১. রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার প্রভাব

২. দুর্নীতি

৩. মামলার তদন্তে অদক্ষতা

৪. অপরাধ দমন, তদন্ত এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব

অডিও শুনুন 05:08

‘সঠিক তদন্তই হলো প্রথম কথা’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান ঢাকার পাঁচটি আদালতের এক বছরে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার ওপর জরিপ করেছেন৷ তাতে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ শতকরা ১৫ থেকে ১৬ ভাগ মামলায় অপরাধীরা শাস্তি পেয়েছে৷ আর ঐ তথ্যের সঙ্গে তিনি পুলিশ সদরদপ্তর থেকে তথ্য নিয়েও মিলিয়ে দেখেছেন৷ তাতেও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির হার একই রকম৷

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘মামলার তদন্তে দক্ষতার অভাবই বিচার না পাওয়ার প্রধান কারণ৷ আদালতে মামলা প্রমাণ করতে হলে মামলাটি প্রমাণ করতে হয় সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে৷ তাই তদন্তে যখন দুর্বলতা থাকে তখন সেটাই প্রধান গলদ৷'' তবে এর বাইরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার প্রভাব কারণ হিসেবে কাজ করে৷ কিন্তু তদন্তের এটিই প্রধান কারণ৷ তিনি বলেন, ‘‘দক্ষ এবং পর্যাপ্ত জনবলসহ তদন্ত এবং বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানো ছাড়া এ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই৷''

বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সঠিক তদন্তই হলো প্রথম কথা৷ এরপর সাক্ষী৷ অনেক মামলায় শেষ পর্যন্ত সাক্ষী পাওয়া যায় না৷ এর দু'টি কারণ: প্রথমত, অনেক সময় প্রভাবশালী বা সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাক্ষীরা আসেন না৷ দ্বিতীয়ত, সাক্ষীদের টাকার বিনিময়ে কিনে নেয়া হয়৷'' তিনি বলেন, ‘‘জনবল, অবকাঠামোর অভাব আছে৷ কিন্তু সেই সবের আগে সাক্ষীদের সুরক্ষা দিয়ে তাদের আদালতে আনতে হবে৷ আর প্রভাবমুক্ত এবং দক্ষ তদন্ত সংস্থা গড়ে তুলতে হবে৷''

তাঁর মতে, ‘‘দুর্নীতি আছে, কিছু রাজনৈতিক প্রভাব আছে৷ তবে বিচার বিভাগ এখন আর প্রশাসনের অধীনে নয়, তারা স্বাধীন৷'' তিনি বলেন, ‘‘বিচারহীনতা অবশ্যই অপরাধ বাড়ায়, অপরাধীকে বেপরোয়া করে৷ এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়