1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

যতদিন ‘কালো’ অশুভ, ততদিন সমাজে ‘অন্ধকার’

‘কালো যদি মন্দ তবে, চুল পাকিলে কান্দো কেনে?’ কত যুগ আগে করা হয়েছিল এই প্রশ্ন? অথচ অনেকের কাছেই ‘কালো’ এখনো অশুভ৷ ‘কালো’ মেয়ে অনেক ভালো হলেও তাঁর পাত্র মেলা দায়৷ অন্যদিকে সাদা মানেই নাকি শুভ্র, শুভ- শান্তির অপর নাম!

শ্বেত কপোত শান্তির প্রতীক৷ অন্যদিকে কালো কাক, কালো প্যাঁচা সবই নাকি অশুভ! কবে, কে ‘আবিষ্কার' করেছিল এ সব?

অনেকের কাছে ‘কালো' মেয়েও তথাকথিত সাদা বা ফর্সা মেয়ের তুলনায় তুচ্ছ৷ এমনিতেই কন্যা সন্তানের জন্ম আমাদের উপ-মহাদেশের অনেক পরিবারে যেন ‘শোকের বার্তা' বয়ে আনে৷ তার ওপর সেই কন্যার গায়ের রং যদি ‘চাপা', মানে ‘কালো' বা ‘ময়লা' হয়, তবে হতাশার কোনো সীমাই থাকে না৷ জন্মের পরমুহূর্ত থেকেই মেয়েটিকে নিয়ে বাবা-মা-র দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়৷ একটাই দুশ্চিন্তা – ‘মেয়ের বিয়ে দিতে পারবো তো?'

গায়ের রং একটা একেবারেই স্বভাবিক এক প্রকৃতিদত্ত ঘটনা৷ অথচ সমাজে মেয়েদের গাত্রবর্ণ নিয়ে ‘বর্ণবাদ' যুগ যুগ ধরে চলেই আসছে৷ এখনো চলছে কালো মেয়ের প্রতি নিষ্ঠুরতা৷ নইলে চাপা রঙের মেয়েকে জন্মলগ্নেই হত্যা করার মতো ঘটনা এ যুগে ঘটার কথা নয় (ভারতে কিন্তু এমন ঘটনা আজও ঘটছে)৷

গায়ের রং ফর্সা না হলে মেয়েকে বোধ হওয়ার পর থেকেই সইতে হয় গঞ্জনা৷ শুনতে হয় সে ‘সুশ্রী' নয়, ‘কুশ্রী'৷ বলে বলে মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় এমন ধারণা৷ ফর্সা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় স্নো-পাউডার, ‘ফেয়ারনেস ক্রিম'-এ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে মনন, জীবন৷

‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি'-র বিজ্ঞাপনের কথা মনে আছে? ঐ বিজ্ঞাপনে দেখানো হতো ধীরে ধীরে ফর্সা হওয়ার উপায়৷ উপায় একটাই – ‘ফেয়ারনেস ক্রিম'৷ ফর্সা হলে জীবন বদলে যায়৷ কালো, আত্মবিশ্বাসহীন মেয়েটি ফর্সা হয়, ফর্সা হয়েই হয়ে যায় আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভর৷ অথচ এই ‘ফেয়ারনেস ক্রিম' কিন্তু একটা সাধারণ ‘ব্লিচ' ছাড়া কিছুই নয়৷ তা মাখলে ভালো বিয়ে হয়, পুরুষরা পাত্তা দেয়, আত্মসম্মানও বাড়ে? অবাক কাণ্ড!

মেয়ে ‘কালো' হলে সে যেন করুণার পাত্র৷ তাঁর যত যোগ্যতাই থাক, বিয়ে দিতে গেলে পাত্রপক্ষকে যতভাবে সম্ভব খুশি করা সম্ভব করতে হয়৷ কৃষ্ণবর্ণকে বলতে হয় ‘শ্যামলা' বা ‘শ্যামবর্ণা'৷ এভাবে একটু ‘নরম' করে বলে গায়ের রং-টা যদি পাত্রপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় তাহলে তো ভালোই, না হলে সাধ্য অনুযায়ী যৌতুক দেয়া অবধারিত৷

ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনগুলো এখনো সমাজে সাদা প্রীতি এবং কালো ভীতি বা কালোর প্রতি বিরাগ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে৷ এখনো প্রায় সব ‘পাত্র চাই' বিজ্ঞাপনের শুরুতেই লেখা থাকে – ‘সুশ্রী, ফর্সা....পাত্রীর জন্য সুযোগ্য পাত্র চাই'৷ পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা আসবে শেষ দিকে৷ নাচ-গান বা খেলাধুলায় পারদর্শীতার বিষয়টি তো বলতে গেলে গুরুত্বই পায় না৷ এমনকি খবরের কাগজে নিজের মেয়ের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়ার সময়ও মা-বাবা প্রথমে পাত্রীর চেহারা, গায়ের রং, শরীরের গঠনের কথাই উল্লেখ করেন৷ এটা কি হীনমন্যতা নয়?

এমনিতে কিন্তু উপ-মহাদেশের মানুষ ঘরের বাইরে বেশ উদার৷ অন্য দেশের সাদায়-কালোয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে খুবই সোচ্চার৷ অথচ নিজের বা স্বজনের বিয়েতে তাঁদেররই দাবি থাকে ‘ফর্সা বউ'৷ বিয়ের দিন একরকম ‘চুনকাম' করেই কনে সাজে মেয়ে৷ চড়া মেকআপ নিয়ে মঞ্চে বসে৷ কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে বিউটি পার্লারে যায় শুধু একটু ‘ফর্সা রংয়ের সুশ্রী' হতে, যাতে দেখে সবাই বলে, ‘বাহ্, কী নিষ্পাপ, শ্বেত-শুভ্র পরীর মতো বউ হয়েছে!'

আসলে এই সাদা বর্ণ প্রীতি আর কালো বর্ণে বিদ্বেষ আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে আদিকাল থেকে৷ এই ভ্রান্তি, এই অনাচারে বিশ্বাসী মানুষের অভাব নেই আজকের এই তথাকথিত আধুনিক সমাজে৷

ক'দিন আগেও তো বাংলাদেশে ‘বর্ণবাদী‘ আক্রমণের শিকার হলেন এক অভিনেত্রী ও তাঁর স্বামী৷ ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর বর নজরুল ইসলাম একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর৷ বিদেশে পড়াশোনা করেছেন তিনি৷ কিন্তু তাতে কী? বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নবদম্পতির ছবিসহ বিয়ের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই শুরু হয়ে গেল আপত্তিকর মন্তব্য৷ শিমুর স্বামীর গায়ের রং, চেহারা নিয়ে ফেসবুকে, অনলাইনে সংবাদের নীচের ‘কমেন্ট বক্স'-এ কুৎসিত মন্তব্য করেছেন অনেকেই৷ তাও ভালো, এখানে বর ছিলেন ‘কালো'৷ কনে যদি কালো হতেন? তাহলে কী হতো একবার ভাবুন!

Deutsche Welle Debarati Guha

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সম্পাদক

আমাদের সমাজে এই তথাকথিত ফর্সা রং প্রীতি হয়ত ঔপনিবেশিক শাসনের ‘উপহার' তখনকার৷ শাসক ব্রিটিশদের গায়ের রং দেখেই হয়ত আমাদের মধ্যে এক ধরণের শ্বেতবর্ণ প্রীতি জন্মেছিল৷ তাই হয়ত এখনো অনেকে ভাবেন, ‘রাজা'-র রং সাদা, কালো মানেই ‘প্রজা'৷ এমন বিশ্বাস যেন আমাদের মগজে ঢুকে গেছে৷

যতদিন পর্যন্ত কালোকে অশুভ আর সাদাকে ‘শান্তির প্রতীক' হিসেবে দেখা হবে, সমাজ থেকে বর্ণবিদ্বেষের অন্ধকার কখনোই যাবে না৷ ‘কালো' কেন খারাপ? কেউ খারাপ কিছু করলে কেন তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়? তালিকার নাম কালোতালিকাই হতে হবে? কেন বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েরা কালো শাড়ি পরতে পারবে না? কেন শোকের রং-ও কালো? আমরা কি তবে ভুলে গেছি, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই কথাগুলো – ‘কালো আর ধলো বাইরে কেবল/ভেতরে সবার সমান রাঙা'? আমরা কি হীনমন্যতাবোধের কারণে সত্য, সুন্দরের জ্ঞানকে মনন থেকে একেবারে মুছে ফেলেছি?

আপনি কি দেবারতি গুহর সঙ্গে একমত? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন