1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

মৃত্যুদণ্ড অর্থহীন, তার মূল্যও কম নয়

মৃত্যুদণ্ড এখনো মানবজাতির অন্যতম বড় ভুল সিদ্ধান্ত৷ গ্রেহেম লুকাস মনে করেন, সব প্রমাণই দেখিয়ে দিচ্ছে যে এটি একটি অমানবিক শাস্তি যা সন্ত্রাসবাদী বা অপরাধীদের কার্যকলাপ প্রতিরোধ করতে পারে না৷

মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তিগুলি অত্যন্ত জোরালো৷ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল-এর ভাষায় মৃত্যুদণ্ড বাঁচার অধিকার লঙ্ঘন করে এবং এটি একটি ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অমর্যাদাকর' শাস্তি৷ এ ক্ষেত্রে কী ভাবে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হচ্ছে, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়৷ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সেই ব্যক্তির মানসিক কষ্টের কথাও ভুললে চলবে না৷ তার থেকে বেশি কষ্ট আর হয় না৷

অনেক ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক প্রতারণা বা হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনানো হয়ে থাকে৷ কিন্তু এমন অনেক অপরাধের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যেগুলিকে ‘সিরিয়াস ক্রাইম' বলা চলে না৷ যেমন মাদক সংক্রান্ত অপরাধ৷ মনে রাখতে হবে, অনেক দেশের শাসকগোষ্ঠী মূলত জনগণকে ভয় দেখাতে, প্রতিশোধ নিতে, দুর্নীতিগ্রস্তদের শিক্ষা দিতে এবং প্রতিপক্ষকে নীরব করতে মৃত্যুদণ্ডের অপব্যবহার করে৷ ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি জার্মানিতেও মৃত্যুদণ্ডকে এভাবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ ফলে বোঝা যায়, এখন জার্মানিতে মৃত্যুদণ্ড কেন নিষিদ্ধ৷

যে দেশগুলি মৃত্যুদণ্ডকে শাস্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে, তারা হলো চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও সৌদি আরব৷ এর মধ্যে কোনো দেশেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নেই৷ ইরান ও সৌদি আরব ২০১৩ সালে যথাক্রমে ৩৬৯ ও ৭৯ জন মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে৷ তাদের মধ্যে এমন সব ব্যক্তিও ছিল, অপরাধের সময় যারা নাবালক ছিল৷ ২০১৩ সালে প্রায় ১,০০০ মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে চীন তালিকার শীর্ষে রয়েছে৷ ইরান, উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব ও সোমালিয়া প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে৷ আফ্রিকায় মৃত্যুদণ্ডের তালিকার শীর্ষে রয়েছে সুদান৷

২০১৪ সালে ইরাকে ১৬৯ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে৷ ইয়েমেনে সংখ্যাটা ১২-র বেশি৷ বাংলাদেশে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ আদালতের ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়ার পর অনেকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে৷ অনেককাল মৃত্যুদণ্ড বন্ধ রাখার পর পাকিস্তানও এবার ফাঁসি দেওয়া শুরু করেছে৷

অন্যান্য অনেক দেশেও বিচার প্রক্রিয়ায় এত ত্রুটি রয়েছে, যে অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচারের কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ বিশ্বের প্রথম সারির গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূলত গরিব ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়৷ অভিযুক্তদের বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ অ্যামেরিকান৷ প্রায়ই শোনা যায়, ডিটেকটিভরা কী ভাবে তথ্য-প্রমাণ নিয়ে খেলা করে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে৷ অথবা আদালতের কাছে প্রমাণ গোপন রাখা হয়, যাতে অভিযুক্ত বেকসুর খালাস না হয়ে যায়৷ হত্যার ঘটনার পর মানুষের মধ্যে প্রতিশোধের স্পৃহা শান্ত করতে ও নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সরকারি কৌঁসুলি অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ছাড়েন৷ এভাবে তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার আশা রাখেন৷ এমন প্রেক্ষাপটে নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঝুঁকি বেড়ে যায়৷ বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০০ জন মানুষকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে৷ অন্য যে দেশটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও নিয়মিতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, সেটি হলো জাপান৷

মৃত্যুদণ্ডের সপক্ষে যে যুক্তি সবচেয়ে জোরালোভাবে পেশ করা হয়, তা হলো এর ফলে নাকি অপরাধীরা ভয় পেয়ে যায়৷ কিন্তু এটা বার বার প্রমাণিত হয়েছে, যে মৃত্যুদণ্ড সত্ত্বেও হত্যা, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ, চোরাচালান বা অন্য কোনো অপরাধ বন্ধ হয় নি৷ উলটে অপরাধ ঘটার পর মৃত্যুদণ্ড সমঝোতা অথবা অপরাধীর পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ দেয় না৷ কারণ চূড়ান্ত পরিণতির পর আর কিছু সম্ভব নয়৷ যারা অপরাধের শিকার হয়, তাদের পরিবারের লোকজনের প্রতিশোধ স্পৃহা হয়তো কিছুটা শান্ত হয়৷ আপিলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটনার সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া আনে৷

Deutsche Welle DW Grahame Lucas

গ্রেহেম লুকাস, ডয়চে ভেলে

উলটে সব পক্ষের কষ্ট আরও বেড়ে যায়৷ তাছাড়া যে সব ক্ষেত্রে অপরাধের পেছনে কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি কাজ করে, সে সব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড অপরাধীকে শহিদ করে তোলে এবং তার মৃত্যুর প্রতিশোধ ও আরও হিংসার পথ প্রশস্ত করে দেয়৷

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে কারাগারের মধ্যে অপরাধীর চিত্তশুদ্ধিরও কোনো সুযোগ থাকে না৷ অনেক ক্ষেত্রে বন্দিরা অনুতপ্ত হয়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করে৷ অনেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলে এবং অপরাধের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করে৷ কেউ আরও শিক্ষা গ্রহণ করে, বই লেখে, ধর্মের আশ্রয় নেয়৷ নানা পথে তারা তাদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করে৷ যারা অনুতাপ দেখায় না, তাদের ক্ষেত্রেও এটা বার বার প্রমাণিত হয়েছে, যে বার বার যারা অপরাধ করে, মৃত্যুদণ্ডের বদলে তাদের কারাগারে পুরে রাখা সমাজের সুরক্ষার অনেক সস্তা উপায়৷ বছরের পর বছর ধরে আপিলের প্রক্রিয়ার আর্থিক মূল্য অনেক বেশি৷ কোনো অভিযুক্ত অপরাধীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়ার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা আরও অনেক ভালো কাজে লাগানো যায়৷ যেমন যারা হিংসার শিকার হয়েছে, তারা এর ফলে উপকৃত হতে পারে৷ অনেক আধুনিক সমাজে হিংসার সংস্কৃতির প্রসার রুখতেও সেই অর্থের সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়