‘মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা বিচারের বিরোধিতা নয়′ | বিশ্ব | DW | 05.11.2014
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা বিচারের বিরোধিতা নয়'

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ৷ সুপ্রিম কোর্টে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছে৷

বাংলাদেশে এখন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত অভিযুক্তের সংখ্যা ১,১৭২ জন৷ তাদের দেশের বিভিন্ন কারাগারের ‘ডেথ সেলে' বন্দি রাখা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অপেক্ষায়৷ চলতি বছরে বাংলাদেশে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি৷ তবে আগস্টেই সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে৷ এছাড়া অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে যুদ্ধাপরাধের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে তিন জামায়াত নেতার৷ ২০১৩ সালে ২২০ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালত৷

সর্বশেষ জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখার পর, মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে এই দণ্ড স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে৷ সংগঠনটি সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিরেধিতা করে বলেছে যে, মৃত্যুদণ্ড ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না৷ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায়ের পর, ইউরোপীয় ইউনিয়নও এক বিবৃতিতে এ দণ্ডের বিরোধিতা করেছে৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এক বিবৃতিতে বলেছে, যে কোনো অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী৷

এর আগেও কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করাসহ জামায়াত নেতাদের প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর পরই এ দণ্ডের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মৃত্যুদণ্ড বিরোধী সংগঠন এবং জোট৷ কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি গ্যাব্রিয়েলা নল এবং সামারি এক্সিকিউশন বিষয়ক প্রতিনিধি ক্রিস্টোফার হেনস৷

বাংলাদেশে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের সবদেশ থেকে মানবাধিকারের দিক থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিলোপ চায়৷ সেজন্যই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের৷ এটা বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়৷''

তিনি বলেন, ‘‘সেই অবস্থানের কারণেই শুধু বাংলাদেশ নয়, যে কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে অ্যামনেস্টি অবস্থান নেয়৷'' তাঁর মতে, ‘‘এই অবস্থানটি যদি জানা থাকে তাহলে সবার কাছে স্পষ্ট হবে যে, অ্যামনেস্টি বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই অবস্থান নেয়নি৷ বরং অ্যামনেস্টিও বিচার চায়, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড নয়৷''

অধ্যাপক কলিমুল্লাহ বলেন, ‘‘আমি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একজন কর্মী হিসেবে সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী৷ মানবতারিরোধী অপরাধের জন্য প্রয়োজনে ৩০০ বছর বা আরো বেশি কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে৷ কিন্তু মৃত্যুদণ্ড নয়৷ কারণ মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকারের লঙ্ঘন৷''

বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে৷ ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাসহ দু'জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়৷ ২০১২ সালে এক, ২০১১ সালে দুই, ২০১০ সালে নয়, ২০০৮ সালে পাঁচ এবং ২০০৭ সালে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে৷

২০০৪-২০১৩ পর্যন্ত, অর্থাৎ এই দশ বছরে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে, এমন দেশের সংখ্যা বেড়েছে৷ ২০১৩ সালের শেষে বিশ্বের মোট ৯৮টি দেশ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন তুলে দিয়েছে৷ দশ বছর আগে ২০০৪ সালে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ ছিল ৮৫টি দেশে৷ এছাড়া কিছু দেশে আইনত মৃত্যুদণ্ড চালু থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না৷ এই ধরনের দেশের সংখ্যা ৫২৷ অর্থাত্‍ মোট ১৪০টি দেশে এখন মৃত্যুদণ্ড হয় আইনত নিষিদ্ধ অথবা নিষিদ্ধ না হলেও মৃত্যুদণ্ড আর কার্যকর করা হয় না৷ বিশ্বের মোট ৫৮টি দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, যাদের অন্যতম বাংলাদেশ৷

তবে মানবাধিকারের প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের মধ্যে ৩২টিতেই এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে৷ মৃত্যুদণ্ড নেই মাত্র ১২টি স্টেটে৷ চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ২৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়৷ শুধু তাই নয়, আরো ১৬ জনকে এই বছরেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে৷ ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড ফিরে আসার পর, এ পর্যন্ত ১,৩৮২ জনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে৷ আর যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের পক্ষে৷

২০১৩ সালে বিশ্বের ২২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মোট ৭৭৮টি৷ চীনকে বাইরে রেখে বিশ্বে যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তার মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ কার্যকর করা হয়েছে মাত্র তিনটি দেশে –ইরান, ইরাক এবং সৌদি আরবে৷ চীনের মৃত্যুদণ্ডের হিসাব পাওয়া দুষ্কর৷

বাংলাদেশের মানবাধিকার নেতা নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতাকে এক করে দেখলে চলবে না৷ এ থেকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না যে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করছে বা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে৷ তারাও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে তার বিচার চায়৷''

তিনি বলেন, ‘‘তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের যে কোনো দেশে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান৷ কারণ তারা মনে করে, শাস্তি হিসেবে জীবন কেড়ে নেয়া মানবাধিকারের লঙ্ঘন৷ এটাকে তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও মনে করে না৷''

নূর খান মনে করেন, ‘‘যত বড় অপরাধীই হোক মৃত্যুদণ্ড তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি নয়৷ বরং তাকে বাঁচিয়ে রেখে শাস্তি দেয়াই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়