1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

মৃত্যুদণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা – এক ‘শহিদ-কন্যার' জবানি

শহিদ পরিবারের সন্তানরা যখন তাঁদের বাবা-মায়ের হত্যার বিচারের অপেক্ষায়, তখনই তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন৷ শহিদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সন্তান আমি, আমিও তাঁদের একজন৷

ইউরোপীয় ইউনিয়ন মৃত্যুদণ্ডবিরোধী এক কনভেনশনে স্বাক্ষর করার পর থেকেই প্রশ্নটি উঠছে৷ এমন একটি কনভেনশনে স্বাক্ষর করা যে খুব ভালো উদ্যোগ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ তবে বিশ্ব থেকে মৃত্যুদণ্ড মুছে দেয়ার এ আন্দোলন তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত, এমনকি সব মানবাধিকার সংস্থা পর্যন্ত যাওয়া উচিত৷ সেদিকে নজর না দিয়ে যেসব যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের বিচার চলার সময়, এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটা বিচারপ্রার্থীদের জন্য খুব দুঃখজনক৷ বিষয়টি আরো দুঃখজনক, কারণ, অপরাধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনেও যুদ্ধাপরাধীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে৷ যেসব দেশের সার্বভৌমত্ব এমনকি জাতিসংঘেও স্বীকৃত, তেমন কোনো দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করার আগে কেন আন্তর্জাতিক আইন থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি বাদ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে না?

এমন চাপের কারণে সুবিচারের প্রশ্নের চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলোই মুখ্য হয়ে ওঠে৷ এ কারণেই শহিদ পরিবারের সন্তানরা মৃত্যুদণ্ড রহিত করার বর্তমান উদ্যোগের পাশে থাকতে পারছে না৷ এতগুলো বছর তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় থেকেছে, বিচারের দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করেছে৷

মেঘনা গুহঠাকুরতার ছবি...

মেঘনা গুহঠাকুরতা, শহিদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সন্তান

শহিদ পরিবারের সন্তানদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য আন্তর্জাতিক ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় আইনে সর্বোচ্চ যে শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, সেটাই শুধু গ্রহণযোগ্য৷ মৃত্যুদণ্ড রহিত করার জন্য একটা নির্দিষ্ট দেশ বা আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করার চেষ্টা যথেষ্ট নয়, বরং সবার আগে আন্তর্জাতিকভাবে বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে হবে৷

‘যেন ভুলে না যাই'

দিনটা আজও মনে আছে৷ ঐতিহাসিক ‘গণ আদালত'-এর ক'দিন পর৷ প্রজন্ম একাত্তরের সদস্য হিসেবে আমারও ডাক পড়ে সাক্ষ্য দিতে৷ স্থান সোহরাওয়ার্দি উদ্যান৷ সেদিন লাখো মানুষের জমায়েত হয় সেখানে৷ তারিখ: ২৬শে মার্চ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস৷

বিএনপি সরকার পুলিশকে সেই জমায়েত রোখার নির্দেশ দিয়েও জমায়েত রুখতে পারেনি৷ তা সত্ত্বেও বিএনপি প্রথমে দাবি করেছিল যে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে কোনো জমায়েতই হয়নি! লোকজন নাকি ঢাকায় এসেছিল স্বাধীনতা দিবসের আলোকসজ্জা দেখতে৷ তারপর সরকারের সুর বদলে যায়: গুজব শোনা যায়, গণ আদালতের উদ্যোক্তা আর সাক্ষীদের নাকি দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বিচার করা হবে৷

একদিন সন্ধ্যায় আমি ‘দৈনিক করতোয়া'-র এক রিপোর্টারের টেলিফোন পাই৷ তিনি উদ্বিগ্ন গলায় জানান যে, অ্যাটর্নি-জেনারেলের কার্যালয় নাকি সত্যিই দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে চলেছে৷ অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন সম্মানীয় ব্যক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী: তিনি নাকি সেই নির্দেশে এত বিরক্ত হয়েছিলেন যে, আইনের বই দেয়ালে ছুঁড়ে মেরেছিলেন৷ তিনিই আমাকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে আত্মগোপন করতে বলেন, কেননা গণ আদালতের সাক্ষী হিসেবে আমার নামেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়ে থাকতে পারে৷

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযু্দ্ধে বাবার মৃত্যু, যে দেশের জন্য বাবা প্রাণ দিয়েছেন, সেই দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে আমাকে মানুষ করতে গিয়ে মায়ের সংগ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে আমার উঠতি ক্যারিয়ার – এ সবই যেন অর্থহীন হয়ে পড়ল৷ তার পরের কয়েক দিন এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আরেক আত্মীয়ের বাড়ি পালিয়ে বেড়ানোর পর শেষ পর্যন্ত যখন যাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের তালিকা বের হলো, তখন দেখা গেল, তাতে আমার কিংবা প্রজন্ম একাত্তরের অন্য কোনো সদস্যের নাম নেই৷

আমার চিন্তা দূর হলো, কিন্তু সেদিন শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এক দল বিশিষ্ট মানুষ – যাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ তোলা হলো – তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন৷

অন্যদিকে গণ আদালত যাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সেই গোলাম আযম, যিনি পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরেন ১৯৭৮ সালে, তাঁকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ঘোষণা করা হয় তাঁকে৷

আজ সারা দেশ যখন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে, তখন অতীতের সেই সব ঘটনা স্মরণ করার প্রয়োজন আছে বৈকি৷

এটা মনে রাখা দরকার যে, একটির পর একটি সরকার বাংলাদেশের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও, সেই জনগণই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাষ্ট্রকে সচেতন করে দিয়ে আসছে যে, যুদ্ধাপরাধীদের জনগণের মধ্যে জায়গা করে দেওয়া আমাদের নিজেদের নাগরিকত্ব বাতিল করার সমতুল৷

মেঘনা গুহঠাকুরতা শহিদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার একমাত্র সন্তান৷ ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা৷ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপনা ছেড়ে ‘রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ' (আরইবি) নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে কর্মরত আছেন মেঘনা৷

বন্ধু, কেমন লাগলো আপনার এই লেখা? জানান মতামত, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়