1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কোনো লাভ নেই'

রাজনৈতিক নেতারা বিরোধী দলে থাকলে ‘ক্রসফায়ারের' বিরোধিতা করে আর সরকারে থাকলে পক্ষে অবস্থান নেন৷ এতদিন অন্তত এমনটাই হতো৷ কিন্তু এখন তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে৷ ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ-ও এবার এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন৷

সরকারি দলে এই ‘ক্রসফায়ার বিরোধিতা' অবশ্য নতুন কোনো মানবিক চেতনার উন্মেষের কারণে ঘটেছে বলে মনে হয় না৷ এর পিছনে প্রধান কারণ হলো ক্রসফয়ারে শাসক দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা-কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনাটি৷ আর যে ক্রসফায়ারটি নিয়ে শাসকদলে বিভক্তি তা হলো ‘আরজু ক্রসফায়ার'৷ গত ১৭ই আগস্ট রাজধানীর হাজারিবাগে চুরির অভিযোগে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷ এ ঘটনায় অভিযুক্ত হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগ সভাপতি আরজু মিয়া সেই দিন রাতেই র‌্যাব-এর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন৷ এই আরজু যে এলাকার ছাত্র নেতা, সেই এলাকার সংসদ সদস্য হলেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, যিনি কিনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাত ভাইয়ের ছেলে৷

ফজলে নূর তাপস কোনোভাবেই তাঁর অনুগামী ছাত্রলীগ নেতার এই ক্রসফায়ারকে মেনে নিতে পারেননি৷ তাই তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন৷ সংবাদমাধ্যমে জানান নিজ প্রতিক্রিয়া৷ বলেন, ‘‘এভাবে ক্রসফায়ার মেনে নেয়া যায় না৷''

প্রভাবশালী এই সংসদ সদস্য আরজুর ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পরই পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নেয়৷ রবিবার আরজুর রড় ভাই মাসুদ রানা ঢাকার সিএমএম আদালতে র‌্যাব ২-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ রানা, র‌্যাব ২-এর ইন্সপেক্টর শাহিদুর রহমান, ইন্সপেক্টর ওয়াহিদুজ্জামান এবং র‌্যাব-এর সোর্স রতনকে আসামি হত্যা মামলা দায়ের করেন৷ তার আগে ঐ বন্দুকযুদ্ধের পরদিন, অর্থাৎ ১৮ই আগস্ট, হাজারিবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাঈনুল ইসলামকে বদলি করা হয়৷ এখানেই শেষ নয়৷ র‌্যাব-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ রানাকেও প্রত্যাহার করা হয় সোমবার৷

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘‘আরজুর ক্রসফায়ারের ঘটনা অনুসন্ধানে প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে৷ র‌্যাব-এর অপরাধ থাকলে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে৷''

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের দাবি, ‘‘র‌্যাব ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটনায় না৷'' বলা বাহুল্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র‌্যাব-এর অভিভাবক৷ তিনি তো এ কথা বলবেনই৷ অথচ এর আগে তিনি বলেছিলেন,‘‘অপরাধী ধরতে গেলে দু-একটি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটতেই পারে৷''

২০০৪ সালে র‌্যাব যখন প্রতিষ্ঠা হয়, সে সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি৷ তখন বিএনপি সরকার র‌্যাব-এর ক্রসফায়ারের পক্ষেই ছিল৷ বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ছিল ক্রসফায়ার বিরোধী৷ মানবাধিকার সংগঠন-এর হিসাব অনুযায়ী, র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ১,৬৫৩ জন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন৷ এছাড়া চলতি বছরে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৬৭ জন৷

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, নিহতদের মধ্যে বড় একটি অংশ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী৷ আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী৷ যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন ক্রসফয়ারের শিকার হন তাদের বিরোধী পক্ষের সদস্যরা৷

তাই প্রচলিত নিয়মে সরকার ক্রসফায়ারের পক্ষে আর বিরোধীরা বিপক্ষে৷ তবে এবার তার কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেল৷ কারণ ক্রসফায়ারে পড়ে গেছেন সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের নেতারা৷ এঁদের মধ্যে একজন আবার সরকার দলীয় অতি প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের অনুগামী৷

কিন্তু র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতস্যদের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই অবস্থান নিয়েছে৷ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার র‌্যাব-এর কার্যক্রম বন্ধ অথবা পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও র‌্যাব-এর এই ধরণের কর্মকাণ্ড বন্ধের কথা বলেছে৷ কিন্তু সরকার চাপে থাকলেও তা আমলে নেয়নি৷

অভিযোগ, গত বছরের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং একজন আইনজীবীসহ সাতজনকে হত্যা করে র‌্যাব৷ তারা নিহতদের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বিপূল পরিমান টাকা নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়৷ ঐ ঘটনাতেও প্রথমে দায়ী র‌্যাব সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হয়নি৷ পরে অবশ্য ব্যাপক প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে দায়ী র‌্যাব অধিনায়কসহ অন্য র‌্যাব সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়৷ তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আদালতে এরইমধ্যে চার্জশিটও দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু প্রতিবাদ এবং চাপ না থাকলে কী হত তা বলা মুশকিল৷ দায়ী র‌্যাব সদস্যরা আদৌ আইনের আওতায় আসতেন কিনা আমি নিশ্চিত নই৷ এখানেও নিহতদের মধ্যে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম শাসক দল আওয়ামী লীগের একজন নেতা৷ তাই হয়ত ‘মানবাধিকার' রক্ষা হয়েছে৷

কিন্তু এই একটি-দু'টি ঘটনায় বিচার বা তদন্তে কী হবে! প্রায় দুই হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার বা তদন্ত কে করবে? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার বিরোধী, বেআইনি৷ তাই এটি হত্যাকাণ্ডই৷ কোনো আইনে বা বিবেচনাতেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা বা দায়ীদের দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ নেই৷ তাই প্রতিটি ঘটনার তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন৷

DW-Korrespondent in Bangladesch, Harun Ur Rashid Swapan

ডিডাব্লিউ-র ঢাকা প্রতিনিধি হারুন উর রশীদ স্বপন

যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ডেসমন্ড সোয়েইন এখন ঢাকা সফর করছেন৷ তিনি মঙ্গলবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ৷ এখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ ও মেনে চলা জরুরি, তার অর্থ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সহ্য করা যায় না৷ একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলতে পারে না৷''

তার মানে ক্রসফায়ার বন্ধ করেই এখন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে৷ নয়ত মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কোনো লাভ নেই৷

সরকারি দলের অথবা সরকারি দলের প্রভাবশালী কোনো নেতার অনুসারীকে ক্রসফায়ারে দিলে ক্রসফায়ার অবৈধ হবে আর বিরোধী বা সাধারণ মানুষকে ক্রসফায়ারে দিলে তা ‘বৈধ' হবে – এ কেমন কথা! মনে রাখা ভালো, ‘দানব' কারুর বন্ধু হতে পারে না৷ একদিন সে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে মালিককেই হয়ত বধ করবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়