1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

মুক্তিযুদ্ধের করুণ স্মৃতি এখনও কাঁদায় জিনাতের মন

স্বাধীনতা আর মুক্তি৷ পরম আনন্দের, পরম পাওয়া৷ কিন্তু এর অর্জন কখনই সহজ নয়৷ সম্মুখ যুদ্ধ, গোপন হামলা, গুপ্তচরবৃত্তিসহ অসংখ্য ত্যাগ, তিতিক্ষা আর হারানোর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সাথে৷

default

জিনাত রহমান

জিনাত রহমান৷ নারায়নগঞ্জে জন্ম ১৯৬২ সালের ১ জানুয়ারি৷ পিতা নুরুল ইসলাম এবং মা আছিয়া বেগম৷ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো এখনও জীবন্ত হয়ে জেগে আছে জিনাত রহমানের জীবন দর্পনে৷ কম বয়স হওয়ার কারণে সম্মুখ যুদ্ধের সুযোগ না পেলেও কৌশলে গুটি গুটি পায়ে বোমা পেতে রেখে শত্রুব্যুহ ধ্বংস করার মতো কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন জিনাত৷ ডয়চে ভেলের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন কীভাবে নৌকায় রেখে আসেন বোমা ভর্তি মাছের ডোলা আর পাক সেনারা সেই নৌকায় উঠলে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে সেখানেই মারা যায় শত্রু সেনারা৷

তিনি বলেন, ‘‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমরা শহর থেকে গ্রামে চলে যায়৷ কিন্তু তারপর একদিন খবর আসে পাক সেনারা গ্রাম ঘিরে ফেলেছে৷ ফলে বাবা, চাচা, মা, বোন সবার সাথে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে যাচ্ছি৷ এমন সময় নদীর কাছে এসে মানুষের ভিড়ে আমি বাবা, চাচাদের হারিয়ে ফেলি৷ বেশ খানিকটা পেছনে পড়ে যায়৷ ফলে ভয় পেয়ে যায় আমি৷ এমন সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা এসে আমাকে বলেন, আমি যদি তাঁর হাতে থাকা মাছের ডোলাটা নদীর তীরে থাকা নৌকায় রেখে আসতে পারি, তাহলে তিনি আমাকে আমার বাবা-ভাইদের কাছে পৌঁছে দেবেন৷ আমি রাজি হয়ে যায়৷ দৌড় দিয়ে এগিয়ে যায় নৌকাটির দিকে৷ কিন্তু পেছন ফিরে দেখি সেই লোক নেই৷

Kaptai Lake in Bangladesh Flash-Galerie

নৌকায় বোমা রেখে পাক সেনাদের মেরেছেন নয় বছরের জিনাত

আমি থমকে দাঁড়ালে তিনি আবার শস্য ক্ষেতের মাঝ থেকে হাত ইশারা করে জানান যে, তিনি সেখানে লুকিয়ে আছেন৷ এরপর আমি নৌকার মধ্যে রেখে আসি ঐ মাছের ডোলা৷ ফিরে এসে তাঁর সাথে কিছুক্ষণ ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে থাকলাম৷ প্রায় ২০ মিনিট পর দেখলাম ৫০ থেকে ৬০ জন পাক সেনা এসে ঐ নৌকায় উঠল নদী পার হওয়ার জন্য৷ ঠিক তখনই বোমাগুলো বিস্ফোরিত হলো৷ আর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো সবগুলো পাক সেনা৷

এরপর তিনি আমাকে নিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে পৌঁছে দিলেন৷ সেখানে পরে আমাকে খুঁজে পান আমার আত্মীয় স্বজন৷ কিন্তু সেসময় শিবিরগুলোতে খাদ্য সংকট এমন ছিল যে, আমরা প্রায় সারাদিনই তেমন কিছু খেতে পাইনি৷ এরপর পাশের আরেক গ্রাম থেকে বালতিতে করে ডাল আর ভাত নিয়ে আসল কেউ একজন৷ কিন্তু এতো মানুষের জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়৷ তখন বড়রা বললেন যে, ছোটদের আগে খেতে দাও৷ বড়রা পরে খাবে৷ তখন অল্প অল্প করে সেই ডাল আর ভাত খেয়েই ক্ষুধা মেটাই আমরা৷ ডাল-ভাতই তখন আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যেন খুব সুস্বাদু খাবার৷ এরকম অনেক কষ্টের দিন গেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়৷

Zinat Rahman Dinajpur The Daily Uttarbangla Bangladesch

দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত নিজের পত্রিকা ‘দৈনিক উত্তরবাংলা’য় কাজে ব্যস্ত জিনাত

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কীভাবে প্রতিদিন মাথায় করে খাবার বহন করতেন জিনাত, তার গল্প শোনান তিনি৷ বললেন, ‘‘এরপর দাদির বাড়িতে কাটিয়েছি আমি যুদ্ধের অনেকটা সময়৷ তখন দাদি আমাকে প্রতিদিন ভাত, রুটি, খিচুড়ি জাতীয় খাবার রান্না করে সেগুলো একটা গামলায় গামছা দিয়ে বেঁধে দিতেন৷ সেই খাবারগুলো আমার মাথায় তুলে দিয়ে বলতেন, এগুলো ধান ক্ষেতের কাছে রেখে আয়৷ তখন আমি ঠিক বুঝতাম না যে, ওগুলো কেন ক্ষেতের কাছে রেখে আসবো৷ দাদি বলতেন, ওখানে রেখে আয়৷ ওগুলো আমাদের জন্য নয়৷ কাজের লোকেরা খাবে৷ আমি বলতাম যে, কই মাঠে তো কেউ কাজ করছে না৷ তবুও তিনি সেখানে রেখে আসতে বলতেন৷ আর ফুফুরা সব যুবতী ছিল তাই তারা বাসায় থাকতো না৷ অন্য জায়গায় থাকতো, বাংকারে ঢুকে থাকতো পাক সেনাদের ভয়ে৷ কারণ সুন্দরী মেয়েদের পাক সেনারা ধরে নিয়ে যেতো, ধর্ষণ করতো৷ তাই বাসায় শুধু বুড়া-বুড়ি আর আমরা ছোটরা বাসায় থাকতাম৷ তাই প্রতিদিন আমি ধান ক্ষেতের কাছে খাবার দিয়ে আসতাম৷ আর গ্রামের যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল তাদের দু'য়েক জন এসে খাবার নিয়ে যেতো৷ খাবার খেয়ে প্রশিক্ষণ করতো, যুদ্ধ করতো৷

আরেকদিনের নির্মম ঘটনা স্মরণ করে এখনও প্রাণ কাঁদে জিনাতের৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় দশ-পনেরো দিন আগে পাক সেনারা আবার আমাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে৷ সেদিন ছিল শুক্রবার৷ জুমার নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হয়েই পাক সেনাদের আসার খবর পায় সবাই৷ তখন গ্রামের তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই আবার মসজিদে আশ্রয় নেয়৷ কিন্তু তবুও রক্ষা পায়নি গ্রামের প্রায় সাড়ে তিনশ' পুরুষ৷ তাদেরকে পাশেই নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা৷ মেরে সবাইকে নদীতে ফেলে দেয়৷

মুক্তিযুদ্ধের এমনই সব করুণ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জিনাত রহমান৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই

সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন