1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

মানসিকতায় অনার কিলিং!

পাকিস্তানে ‘অনার কিলিং’-এর কথা প্রায়ই শোনা যায়৷ এই বর্বরতা সেখানে যেন সামাজিকভাবেই স্বীকৃত৷ পরিবারের ‘সম্মান রক্ষায়’ আত্মীয়-স্বজনের, এমনকি বাবা-ভাইয়ের হাতে পরিবারের কোনো সদস্যকে হত্যা সেখানে প্রায় নিয়মিত ঘটনা৷

এর বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থা কী? বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবস্থায় অনার কিলিং নেই৷ আইনে যে কোনো ধরণের হত্যাকাণ্ড কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ তারপরও কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক৷

১.মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করায় মাকে পিটিয়ে হত্যা

ঘটনাটি এবছরেরই ২০ এপ্রিলের৷ বগুড়ার বৃন্দাবনপাড়ায় জেসমিন আক্তার তুহিন নামে এক বিউটিশিয়ানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী আব্দুল গফুর৷ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তাদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে তিন্নি খাতুন ঘটনার কিছু দিন আগে প্রেম করে বিয়ে করে৷ মেয়ের বিয়ে নিয়ে আব্দুল গফুর তার স্ত্রী তুহিন বেগমকে দোষারোপ করে আসছিলেন৷ ঘটনার দিন মেয়ের বিয়ে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়৷ এক পর্যায়ে স্ত্রী তুহিন বেগমকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ ঘরে ফেলে রেখে স্বামী আব্দুল গফুর পালিয়ে যায়৷

২. চাচাতো বোনের সঙ্গে প্রেম করায় পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

এই ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়, গত ১১ অক্টোবর৷ ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় জাহিদ হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷ ডেমড়া থানার ওসি কাওছার আহম্মেদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান,‘‘জাহিদ তার চাচাতো বোন নিগার (ছদ্মনাম)-এর সঙ্গে প্রেম করতো৷ এই ঘটনা জানতে পেরে  ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নিগারকে দিয়ে ফোন করে জাহিদকে ডাকিয়ে আনে তার চাচা সিদ্দিক এবং চাচাতো ভাই গাজি ও মাসুদ৷ পরে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে রাখে৷''

৩. ধনীর ছেলের প্রেমে পড়ে জীবন দিলেন নিপা

ময়মনসিংহে মিনারা আক্তার নিপা এক পিঠা বিক্রেতার মেয়ে৷ তবে ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইন্সটিউট থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়৷ একই প্রতিষ্ঠানে এক ইয়ার নীচে পড়তো ধনাঢ্য পরিবারের মুহিব্বুল আরেফিন সাকিব৷ এক বছর পর সে-ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়৷ সেখানেই পরিচয় এবং ভালোবাসা৷ সাকিব পরিবারের অমতে ২০১৫ সালে বিয়ে করে নিপাকে৷ কিন্তু সাকিবের পরিবার তা মানেনি৷ পরে নানা দেনদরবারের পর সাকিবের পরিবার নিপাকে মেনে নিয়ে ঘরে তোলে৷ গত মার্চে নতুন করে বিয়ের দিন ঠিক করা হয়৷ কিন্তু তার আগেই লাশ হয় নিপা৷ ২৮ ফেব্রুয়ারি তার শ্বশুর বাড়িতে স্বামীর কক্ষ থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়৷ এসময় সাকিব বাসায় ছিলেন না৷ নিপার পরিবারের অভিযোগ, তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে৷ পুলিশ এখনো মামলাটির তদন্ত শেষ করতে পারেনি৷

অডিও শুনুন 02:32

‘‘অনার কিলিংয়ের মানসিক অবস্থা এখানে বিদ্যমান’’

এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে৷ আর এই ধরণের ঘটনার প্রধান শিকার নারী৷ হত্যাকাণ্ডের বাইরে নির্যাতন, চুল কেটে দেয়া, একঘরে করে ফেলা, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানোর মতো ঘটনাও অনেক আছে৷ পরিবারের সম্মান রক্ষা বা সম্মান হানির জবাব দিতে এসব ঘটনা ঘটানো হয়

উপরের তিনটিসহ আরো কিছু ঘটনা বিশ্লেষণে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়:

১.বাংলাদেশে এখনো অবিবাহিত নারী- পুরুষের প্রেমের সম্পর্ককে সহজভাবে নেয়া হয় না৷ এর ‘দায়' বিশেষ করে নারী বা মেয়ের পরিবারের ওপর চাপানো হয়৷ আর ছেলের পরিবারও এমন সম্পর্ককে অপমান মনে করে৷

২. সামাজিক অবস্থান এবং আর্থিক অবস্থার ব্যবধানকে বড় করে দেখা হয়৷ আর অসম বয়সের প্রেমকেও নিন্দার চোখে দেখা হয়৷

৩. বিবাহিতদের বিবাহের বাইরে প্রেম ‘নিষিদ্ধ'৷

৪. পারিবারিক সম্মান বা অবস্থানের মর্যাদার নামে বাংলাদেশেও হত্যাকাণ্ড অথবা নির্যাতনের ঘটনা ঘটে৷

অডিও শুনুন 02:21

‘‘এটা বেড়ে গেলেতো আমাদের ভাবতে হবে’’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অনার কিলিংয়ের মানসিক অবস্থা এখানে বিদ্যমান৷ পাকিস্তানের মতো এখানে এটা প্রকট নয়৷ তবে যা হচ্ছে তা ব্যক্তি ও পরিবারের অহংবোধ থেকে৷ এখানে সমস্যাটি হলো ধনী-গরীবের ব্যবধান নিয়ে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘পরিবারের সম্মানকে কেউ কেউ তাদের বিবেচনায় দেখেন৷ আর তখন তারা মানবিকতা হরিয়ে ফেলেন৷ এটা এখানে ধর্মীয় কারণেও ঘটে৷ এটা একটা মনোজাগতিক অবস্থা৷ আমরা কেউ স্বীকার করি আর না করি, এই মানসিক পরিস্থিতি বিদ্যমান৷''

অনার কিলিং প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,‘‘আইনে তো আমাদের দেশে যে কোনো হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান আছে৷ আর সামাজিক অবস্থাও অনার কিলিংয়ের নয়৷ এটা সামন্তবাদী বা ফিউডাল সমাজ নয়, যেমনটা পাকিস্তান বা অন্যকোনো দেশ৷ তবুও বিষয়টি আমাদের এখানে আলোচনায় আসা উচিত৷ কিছু ঘটনা ঘটছে৷ তবে তা সংখ্যায় খুবই অল্প বলে হয়তো আমরা তা নিয়ে ভাবছি না৷''

জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার মতে,‘‘এটা বেড়ে গেলেতো আমাদের ভাবতে হবে৷ আইনের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনত হবে৷ আইনের কথা ভাবতে হবে৷ তবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনার কিলিংয়ের পক্ষে অবস্থান নেয় না৷''

অডিও শুনুন 01:37

‘‘অল্প হোক, তারপরও অনার কিলিং আছে’’

এবার ২০১৪ সালের একটি ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে যা তখন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে৷ শেরপুর সদর উপজেলার বেতমারী গ্রামের এক হিন্দু ছেলের সঙ্গে এক মুসলিম মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ তারা ঘর বাঁধতে পালিয়ে চলেও যায়৷ আর এই ঘটনা জানাজানি হলে ওই গ্রামে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যায়৷ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তখন আক্রমণ করে কিছু দুর্বৃত্ত৷ কয়েকটি হিন্দু পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়৷ তারা মুসলমান মেয়ের সঙ্গে হিন্দু ছেলের বিয়ে মানতে নারাজ৷ পরে ছেলে-মেয়ে দু'জনকে আটক করে যার যার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় সেখানকার পুলিশ৷

এ বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক নারী কন্ঠ শিল্পী ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেন এক মুসলিম যুবককে৷ তাতে ক্ষুব্ধ হন মেয়ের পরিবারের সদস্যরা৷ থানায় মামলা ঠুকে দেন৷ পুলিশ দু'জনকেই আটক করে৷ পরে মেয়েটিকে ছাড়া হলেও ছেলেটি মামলার ঘানি টানছে৷

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে বিয়ের ব্যাপারে ধর্মীয় ব্যবস্থা বেশ কঠিন৷ আইনে আন্ত:ধর্ম বিয়েতে কোনো বাধা না থাকলেও সামাজিক এবং ধর্মীয় বাধা আছে৷

অডিও শুনুন 01:47

‘‘বাংলাদেশে সেই অবস্থা নেই’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান মনে করেন, ‘‘অল্প হোক, তারপরও অনার কিলিং আছে৷ আমরা হয়তো সেটাকে সেভাবে দেখি না৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরাই এর প্রধান শিকার৷ আর ধর্ম, সামাজিক অবস্থান এখানে কাজ করছে৷ আগে নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হতো৷ হাইকোর্ট সেটা বন্ধ করেছে৷ আমি মনে করি, অনার কিলিং নিয়েও আমাদের ভাবার সময় এসেছে৷''

তবে মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘‘পাকিস্তানে যেমন অনার কিলিংয়ে ক্ষমা পাওয়া যায়, কমিউিনিটি এটাকে গ্রহণ করে, বাংলাদেশে সেই অবস্থা নেই৷ এ ধরণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান আছে৷ কিন্তু যেটা হয়, তা হলো পারিবারিক বা অন্যকোনোভাবে ঘটনাকে গোপন করা হয়৷ আলামত নষ্ট করা হয়৷ ধামাচাপা দেয়া হয়৷''

অ্যাডভোকেট এলিনা খান আরো বলেন,‘‘আমি মনে করি, এক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে৷ পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে এ ধরণের ঘটনা প্রমাণে গুরুত্ব দিতে হবে৷ হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে৷ দরকার আইন ও বাস্তবায়ন৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়