1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

মানবদরদি রুশ লেখক টলস্টয়ের মৃত্যুশতবর্ষ

বিখ্যাত রুশ লেখক লেভ নিকোলাইয়েভিচ টলস্টয়'এর মৃত্যু শতবার্ষিকী ২০ নভেম্বর৷ তাই জার্মানিতে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের৷

default

লেভ নিকোলাইয়েভিচ টলস্টয়

মিউনিখের সাহিত্যভবন লেখকের জীবন ও জার্মানির সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধনের কথা তুলে ধরছে এক প্রদর্শনীতে৷

টলস্টয়ের জীবন

অসাধারণ প্রতিভাশালী লেখক লেভ টলস্টয় ছিলেন সাহিত্য জগতের এক অপার বিস্ময়৷ দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বের মানুষকে জয় করেছেন তিনি শুধু লেখালেখি দিয়ে নয়, ভালবাসা দিয়েও৷ জন্ম তাঁর ১৮২৮ সালের ২৮ আগস্ট রাশিয়ার তুলা প্রদেশের ইয়াস্নায়া পলিয়ানা নামের এক অঞ্চলে, এক অভিজাত পরিবারে৷ ছোটবেলাতেই হারান মা বাবা৷ এক আত্মীয়ের কাছে বড় হয়ে ওঠেন তিনি৷ স্কুল কলেজের ধরাবাধা গণ্ডি তেমন ভাল লাগতো না মেধাবী টলস্টয়ের৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়শোনা শুরু করেন প্রাচ্য ভাষা নিয়ে৷ পরে ভর্তি হন আইন বিভাগে৷ শেষ পর্যন্ত ক্ষান্ত দেন পড়াশোনায়৷ নিজের পরিশ্রম ও চেষ্টায় শিখেছেন বহু ভাষা: ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, গ্রিক, হিব্রু ইত্যাদি৷ সংগীত ও চিত্রাঙ্কনেও আগ্রহ ছিল তাঁর৷ তবে বারবারই ফিরে এসেছেন লেখালেখির জগতে৷ বিষয় সম্পত্তির মোহ ছিল না তাঁর৷ ধর্মে বিশ্বাস থাকলেও গির্জা ও যাজকদের সমালোচনা করতে ছাড়েননি৷ ফলে খ্রিষ্ট ধর্ম থেকে বহিষ্কৃত হতে হয় তাঁকে৷ জারতন্ত্রের সমালোচনায় মুখর ছিলেন৷ সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন তিনি৷ প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, খুলেছেন স্কুল৷ সুবিচারের আকাঙ্খা ছিল তীব্র৷ বিচারের নামে প্রহসন ছিল তাঁর কাছে অসহ্য৷ সমাজের উঁচুতলা থেকে নীচুতলার মানুষদের মধ্যে ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ৷ আর এইসব মানুষের চিত্রই ফুটে উঠেছে টলস্টয়ের উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গল্পে৷ তাঁর উপন্যাস ওয়ার অ্যান্ড পিস, আনা কারেনিনা'র খ্যাতি বিশ্বজোড়া৷ বড়গল্প ইভান ইলিচের মৃত্যু, ফাদার সিয়ের্গি; একাধিক নাটক এবং আরো অসংখ্য অমর সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা লেভ টলস্টয়৷

NEU NEU Tolstoj und Deutschland Ein Licht mir aufgegangen Ausstellung in Literaturhaus München Die Ausstellung Flash-Galerie

জার্মানির সঙ্গে টলস্টয়'এর বন্ধন নিয়ে প্রদর্শনী

জার্মানির সঙ্গে বন্ধন

জার্মানি ও জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যেন ছিল তাঁর আত্মিক যোগ৷ তাই তো ১৮৬১ সালে জার্মান ইহুদি লেখক বের্টল্ড আওয়ারবাখের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বলে উঠেছিলেন টলস্টয় জার্মান ভাষায় ‘‘আমার মধ্যে যেন আলো জ্বলে উঠলো৷'' জার্মান ভাষাটা ভালই জানা ছিল টলস্টয়ের৷ জার্মান ভাষায় লেখা বহু পান্ডুলিপিও রয়েছে তাঁর৷ জার্মানি ভ্রমণের দিনলিপি, জার্মান পাঠকদের সঙ্গে পত্রের আদান প্রদান এবং মূল্যবান অন্যান্য দলিলপত্র দেখা যাবে মিউনিখের সাহিত্যভবনে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে৷ এতে বোঝা যায়, টলস্টয় কতটা ভালভাবে জার্মানিকে চিনতেন জানতেন৷ মস্কোর টলস্টয় মিউজিয়ামের টলস্টয়ের পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ স্তেভলানা নভিকোভা বলেন, ‘‘তিনি জার্মানিকে ভালবাসতেন, ভালবাসতেন জার্মান সংগীত, বেটোফেন, বাখ ও দার্শনিকদের৷ পছন্দ করতেন জার্মান লেখকদের লেখাও, যা জার্মান ভাষাতেই পড়তে পারতেন তিনি৷''

ফ্রিডরিশ রোয়সেল নামে এক জার্মান গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে শেখেন তিনি জার্মান ভাষা৷ মিউনিখ শহরের সাহিত্যভবনের পরিচালক ডোরিং স্মিরনোভ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘সাধারণ দলত্যাগ করা এক জার্মানসেনা ছিলেন রোয়সেল৷ পেশায় চর্মকার৷ কিন্তু তাঁর এমন এক গুণ ছিল, যা থেকে টলস্টয় শিক্ষা নিতে পেরেছিলেন৷ আর তা হল, সমবেদনা এবং সহানুভূতি৷''

সুবিচারের আকাঙ্খাটা জেগে উঠেছিল আরেক জার্মান অধ্যাপক মায়ারের কাছ থেকে৷ আইনবিদ মায়ার ১৭ বছরের টলস্টয়কে রাশিয়ার তৎকালীন জার ক্যাথারিন দ্য গ্রেটের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণের পুরোধা দার্শনিক মতেসকিউ'এর তুলনা করে লিখতে বলেন৷

ডোরিং স্মিরনোভ বলেন, ‘‘টলস্টয়ের মনে তা এতই দাগ কাটে যে, তিনি জারতন্ত্রকে সমালোচনার চোখে দেখতে শুরু করেন৷ বিশেষ করে খেটে খাওয়া কৃষকদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ববোধ জেগে ওঠে তাঁর মনে৷''

জার্মানির সঙ্গে তাঁর বন্ধনটা আরো দৃঢ় হয় ১৮৬২ সালে জার্মান বংশোদ্ভূত রুশ সোফিয়া আন্ড্রেইভনাকে বিয়ে করার পর৷ ১৩ সন্তানের জনক জননী তাঁরা৷ দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকটা সুখের হলেও পরে অশান্তি দেখা দেয়৷ স্বামীর সবকিছু ছেড়েছুড়ে সাধারণ সাধু সন্ন্যাসীর মত জীবনযাপন করাটা মোটেও মনঃপূত ছিলনা সোফিয়ার৷

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে পত্রবন্ধুত্ব

ভারতের সঙ্গেও এক গভীর বন্ধন ছিল তাঁর৷ ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিজের জীবনদর্শনের মিল খুঁজে পেতেন তিনি৷ ঔপনিবেশিক শাসনামলে স্বাধীনতাকামী অনেক ভারতীয় নেতার সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর যোগাযোগ, পত্রবন্ধুত্ব৷ এর মধ্যে অন্যতম মহাত্মা গান্ধী৷ এই দুই মহাপুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপনের পদ্ধতির মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক সাযুজ্য৷ দুজনেই বলেছেন সবার ওপরে মানবধর্মের কথা৷ বেছে নিয়েছিলেন সাধু সন্ন্যাসীর জীবন৷ নিজের কাজ নিজেই করতেন তাঁরা৷ খাওয়াদাওয়াও ছিল অতি সামান্য৷ ১৯০৯ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত অসংখ্য চিঠি চালাচালি হয়েছে এই দুই মহান ব্যক্তির মধ্যে, যেগুলো পরে এক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় গড়ে তোলেন গান্ধী ‘টলস্টয় ফার্ম'৷

সুনামের শীর্ষে পৌঁছেও পারিবারিক অশান্তিটা কুরে কুরে খাচ্ছিল টলস্টয়কে৷ একদিন কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে চলে যান তিনি৷ এই ধাক্কা আর সামলানো সম্ভব হয়নি৷ প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক রেলস্টেশনে ১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান মহিরুহ এই লেখক৷

প্রতিবেদন: রায়হানা বেগম
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক