1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ‘বোনাস' চাই না, শুধু বিচার চাই

ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আর লিখবো না৷ কিছু হলেই তাঁকে জানানো বা তাঁর কাছে সমাধান চাওয়াও তো প্রায় ফ্যাশনই হয়ে গেছে৷ কিন্তু কথাগুলো যেহেতু শেখ হাসিনাই বলেছেন, কিছু বলতে চাইলে তাঁকেই তো বলতে হবে!

সব কিছুকেই অবশ্য ‘ফ্যাশন' বলা ঠিক নয়৷ কোনো ফ্যাশনই তো সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বা অনুসরণীয় হয়না৷ হলে হয়তো মোসাহেবদের মিছিল হতো দেশে দেশে৷ ‘জ্বী আপা', ‘জ্বী হুজুর' বা ‘জ্বী ম্যাডাম'-ই হয়ে যেত বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান৷ কেউ কিছুর প্রতিবাদ করতো না৷ কিন্তু প্রতিবাদ তো হয়, হচ্ছে৷ হয় বলেই ইতিহাসে '৫২ হয়, '৭১ হয়, '৭৫-এর প্রতি ঘৃণা জন্মায়, স্বৈরাচার নিপাত যায় আর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তারপরও চলতে থাকে৷

বাংলাদেশে বড় কিছু ঘটলেই ভুক্তভোগীর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শরণাপন্ন হওয়াটাকে ‘ফ্যাশন' বলা ঠিক হবে কিনা জানিনা৷ তবে এই রীতি অনেকেই অনুসরণ করেছেন, করছেন৷ যাঁরা এখনো করেননি সম্ভব হলে তাঁরাও নিশ্চয়ই অনুসরণ করবেন৷ না করে উপায়ই বা কী! শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ ছাড়া অনেক কিছুই যে হয়না৷

প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ না নিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় হয়না৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতি চলতেই থাকে৷ মানবসেবা করতে গিয়ে কারাবন্দি হতে হয় তরুণদের, প্রধানমন্ত্রী মুখ না খুললে পুলিশের হুকুম নড়েনা৷ আর কত বলবো!

হ্যাঁ, আরো দুটি ঘটনার কথা বলতেই পারি৷ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে ‘বিশেষজ্ঞ' পরিচয় দিয়ে মতামত দেওয়ার পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি ‘বিশেষজ্ঞ' তানভীর হাসান জোহা৷ অনেক অপেক্ষা এবং চেষ্টা-তদ্বিরেও যখন আর তাঁকে ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন জোহার এক নিকটাত্মীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘‘আমি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান৷ মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবা আলমগীর হোসেন যশোরে শহীদ হন৷ সেই পরিবারের নাতি তানভীর হাসান জোহা আজ নিখোঁজ৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটাই আকুতি - ভুল ক্রুটি ক্ষমা করে জোহাকে ফিরিয়ে দিন৷''

এই লেখার পর সাত দিন নিখোঁজ থাকা জোহাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

কবি নির্মলেন্দু গুণের স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণের ঘটনাটিও না বললেই নয়৷ স্বাধীনতা পদক না পাওয়ায় ভীষণ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘‘শেখ হাসিনা স্বাধীনতা পদকের মুলোটি আমার নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রেখেছেন৷ কিন্তু কিছুতেই সেটি আমাকে দিচ্ছেন না৷ উনার যোগ্য ব্যক্তির তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে আকাশ ছুঁয়েছে৷ কিন্তু সেই তালিকায় আমার স্থান হচ্ছে না৷ আমাকে উপেক্ষা করার বা কবি হিসেবে সামান্য ভাবার সাহস যার হয়, তাকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার ভিতরে অনেক আগে থেকেই ছিল, এখনও রয়েছে৷''

এই লেখার পর কবিকে শুধু পুরস্কারই নয়, সঙ্গে দু'টাকা ‘বোনাসও' দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ বোনাসটা কেন দেয়া হয়েছিল তা খবর পড়লেই সবাই জানতে পারবেন৷

আজ ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি এবং সেরকম লেখালেখির অভিযোগে ব্লগার হত্যার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে দু-একটা কথা বলতে চাই৷ শেখ হাসিনা জানতে চেয়েছেন, ‘‘আমার ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি নোংরা কথা লেখে, সেটা কেনো আমরা বরদাশত করবো?'' তাঁর মতে, ধর্মের বিরুদ্ধে লেখা এখন ‘ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা মুক্তচিন্তার ধারক!'

এমন লেখালেখিকে নোংরামি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘‘আমি আমার ধর্ম মানি, যাকে আমি নবি মানি তার সম্পর্কে নোংরা কথা কেউ যদি লেখে সেটা কখনোই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়৷ ঠিক তেমনি অন্য ধর্মের যারা, তাদের সম্পর্কে কেউ কিছু লিখলে তাও কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না৷

আশীষ চক্রবর্ত্তী

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

যারা এগুলো করে তা তাদের সম্পূর্ণ নোংরা মনের পরিচয়, বিকৃত মনের পরিচয়৷ এটা পুরোপুরিই তাদের চরিত্রের দোষ এবং তারা বিকৃত মানসিকতার৷ একজন মুসলমান হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত আমার ধর্মকে অনুসরণ করে চলি৷ কাজেই সে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ লিখলে আমি কষ্ট পাই৷''

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি উপভোগ করেছেন৷ কারো কারো লেখায় ‘নোংরামি' থাকতেই পারে, সেক্ষেত্রে ‘নোংরামি' শব্দটি তিনি উচ্চারণ করতেই পারেন৷ কারো ‘নোংরামি' বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়ে থাকলে তাদের মানসিকতায় বিকৃতিও তিনি খুঁজে পেতেই পারেন৷ এমন কোনো লেখা পড়ে থাকলে কষ্টও পেতেই পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷

তবে ‘এসব লেখার জন্য কোনো অঘটন ঘটলে তার দায় সরকার নেবে না' - এই কথাটা কি কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন? এসব বলে কি হত্যাকারীদের এক ধরণের সবুজ সংকেত দেয়া হলো না? তার মানে কি ধর্মবিরোধী লেখালেখির অজুহাতে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকবে? সরকার শুধু দায়-দায়িত্ব এড়াবে?

তবু ভালো যে ব্লগারদের ঢালাওভাবে ‘বিকৃত মানসিকতার' মানুষ এবং তাঁদের লেখালেখিকে ‘নোংরামি' বলেই তিনি থামেননি৷ হত্যাকারীদের উদ্দেশ্যেও বলেছেন, ‘‘মানুষকে খুন করার মধ্য দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান নেই৷ যারা এগুলোর জন্য খুন করছে তাও ইসলাম বিরোধী৷ বিচারের দায়িত্ব আল্লাহ তাদের দেয়নি৷ যাদের কথা পছন্দ হলো না, তাদের খুন করে ফেলার মতো ঘটনাও সরকার বরদাশত করবে না৷''

‘অঘটনের দায়' নেবেন না, ‘খুন করে ফেলার মতো ঘটনাও সরকার বরদাশত করবে না' – এটা কেমন অঙ্ক হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী৷ সমাজে এমন মানুষও থাকে যারা চোরকে চুরি করতে বলে গৃহস্থকেও বলে সজাগ থাকতে৷ সেখানে তো তবু চুরি বন্ধের সুযোগ থাকে৷ কিন্তু অঘটন, অর্থাৎ হত্যার দায়িত্ব না নিলে, পাশাপাশি হত্যাকারীদের বরদাশত না করার হুমকিও দিলে কি হত্যা কখনো বন্ধ হবে?

হত্যা সত্যি সত্যিই বরদাশত না করলে হত্যাকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী৷ দেখিয়ে দিন বরদাশত না করে আপনার সরকার ব্লগার, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক, যাজক, পুরোহিত হত্যাকারীরও বিচারও করে৷

নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, সঙ্গে দুই টাকা ‘বোনাসও' পেয়েছেন৷ আমরা শুধু দ্রুত বিচার চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়