1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

মহানবিকে নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য, প্রশ্নবিদ্ধ বাকস্বাধীনতা

তারক বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের একজন ব্লগার৷ কিন্তু সম্প্রতি তাঁর একটি আপত্তিকর ফেসবুক পোস্টের জেরে ভারতে আবারো ঘনিয়ে উঠেছে অসহিষ্ণুতা বিতর্ক৷ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে৷

ব্লগার তারক বিশ্বাস স্বঘোষিত নাস্তিক৷ তিনি তাঁর লেখায় প্রায়ই ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করে লেখেন৷ বিতর্ক খুঁচিয়ে তুলতে চান, যাতে মৌলিক ভাবনার জায়গায় নাড়া পড়ে৷ কিছুদিন আগে সেরকমই একটি লেখা তারক বিশ্বাস নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে পোস্ট করেছিলেন, যা স্পষ্টতই হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বিরোধিতা করে লেখা৷ লেখাটা দেখে এক তৃণমূল নেতা সেটা সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বলে চিহ্নিত করে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন৷ শুধু তাই নয়, পাঁচশ'রও বেশি মুসলমান, তারক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করার অভিযোগ এনে পুলিশের কাছে যান৷ এ সব অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ তারক বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পেশ করে এবং বিচারকের নির্দেশে তাঁকে সাতদিনের পুলিস হেপাজতে পাঠানো হয়৷ শোনা যাচ্ছে, ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘‌এপিডিআর' তারকের হয়ে উকিল দাঁড় করিয়েছে, করা হয়েছে জামিনের আবেদনও৷ ২৯ সেপ্টেম্বর সেই আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা৷ এরই মধ্যে কলকাতায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে তারক বিশ্বাসের গ্রেপ্তারির প্রতিবাদে পথসভা, বিক্ষোভ হয়েছে৷ ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারকের সমর্থনে-বিরোধিতায় চলছে বিতর্কও৷ মূল ঘটনা হলো এটাই৷

তারক বিশ্বাস ঠিক কাজ করেছিলেন না ভুল, সে নিয়ে স্পষ্টতই দ্বিমত আছে৷ সেই বিভাজনটা কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়, আদর্শগত৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাঁরা নিজেদের মতামত জানিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম৷ তাঁরা মনে করছেন, তাঁদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দিয়ে তারক অনুচিত কাজ করেছেন৷ পুলিশও নিশ্চিত একই কথা মনে করছে৷ কারণ সে কারণেই তারকের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫-এ ধারা (‌ধর্মের অবমাননা)‌ এবং ২৯৮ ধারায় (‌ধর্মীয় আবেগে আঘাত)‌ মামলা দায়ের হয়েছে৷ সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৬৬, ৬৭ এবং ৬৭-এ ধারা, ইন্টারনেটে আপত্তিকর পোস্ট বা মেসেজ পাঠানোর মতো অপরাধের ক্ষেত্রে যা প্রযুক্ত হয়৷

রাজ্য সরকারের মনোভাব এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় – সামাজিক শান্তি বজায় রাখা৷ সেখানে সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা দেওয়ার চেষ্টা যে বা যারা করবে, তাদের শুরুতেই কড়া হাতে শাসন করা হবে৷ অন্যদিকে যুক্তিবাদীরা, নাস্তিকরা, বিজ্ঞানমনস্করা বা গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষায় সতর্ক যাঁরা, তাঁরা তারক বিশ্বাসের হেনস্থার প্রতিবাদ করছেন৷ এঁদের মূল বক্তব্য দু'টো – এক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কী হবে, যা ভারতীয় সংবিধান-স্বীকৃত অধিকার?‌ আর দুই, তারক বিশ্বাস এর আগেও অন্যান্য ধর্ম নিয়ে ‘‌আপত্তিকর'‌ বা বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন৷ তাছাড়া শুধু তারক বিশ্বাসই নন, অন্য অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে এ রকম বলে বা লিখে থাকেন৷ তা তখন কেন তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে, হচ্ছে?‌

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর আগে দেওয়া যাক৷ তারক বিশ্বাস বা অন্য কেউ এর আগে যখন অন্য ধর্মের অবমাননা করে ‘পোস্ট' করেছিলেন, তখন কি কেউ পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন?‌ যদি করে থাকেন, তাহলে কি প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল?‌ নাকি নেয়নি?‌ যদি এ রকম কোনো উদাহরণ থেকে থাকে, একমাত্র তা হলেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনা যায় বা প্রশাসনকে অতি তৎপরতার দায়ে দোষী দাবি করা যায়৷ আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সংবিধান-স্বীকৃত, তেমইন ধর্মীয় আবেগে আঘাতের বিরুদ্ধেও তো আইন আছে!‌ পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচারবিভাগের হাত-পা সেই আইনে বাঁধা৷ অর্থাৎ স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা পরোক্ষে বলা আছে, পাছে তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশ্বাস কিংবা আবেগে আঘাত করে৷ যদি কেউ সেই স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে না পারেন, তা হলে বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হয়৷ অবশ্য শুধু ধর্মবিশ্বাসে আঘাত কেন, ব্যক্তিমানুষের মানহানিও তো দণ্ডনীয় অপরাধ! কারও অসম্মান করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দেওয়া যায় কি?‌‌ যায় না৷ কারণ, আইন সেটাই বলছে৷ যদি এই ভাবনার বদল করতে হয়, তা হলে দেশের আইন বদলাতে হবে যেহেতু সরকার বা বিচারবিভাগকেও আইন মেনে চলতে হয়৷ আইনের নিজস্ব, অন্যতর ব্যাখ্যার সুযোগও সেখানে থাকে না৷

প্রশ্ন হলো, তাহলে কি ধর্ম নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে, আবেগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই?‌ অবশ্যই আছে৷ তবে অকারণ আক্রমণ এড়িয়ে৷ নয়ত ব্যাপারটা বাতুলতা হয়ে যায়, নষ্ট হয় উদ্দেশ্যও৷ এক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছে৷ তারক বিশ্বাস ঠিক কী চেয়েছিলেন, সেটা এখনই তর্কসাপেক্ষ হয়ে উঠেছে৷ কারণ যুক্তিবাদীদেরই একাংশ এখন বলছেন, প্রসঙ্গহীনভাবে, কোনো নির্দিষ্ট রেফারেন্স বা তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিতর্কিত মন্তব্য করাটা পদ্ধতিগত ভুল৷ ভুল ছিল তাঁর ভাষা আর প্রকাশভঙ্গীতেও৷ নাস্তিকরা যদি এটাকে নিজেদের মতাদর্শের প্রচার হিসেবেই দেখেন, তা হলে এই ধরনের হঠকারিতাও এড়িয়ে চলা উচিত, যাতে অযথা বিতর্ক ছড়ানো ছাড়া কিছুই হয় না৷ বরং চেষ্টাটাই ভুল রাস্তায় চলে যায়৷

ওদিকে তারক বিশ্বাসের জামিন নিয়ে ইতোমধ্যেই তৎপর হয়েছে একট হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী৷ তারা তাদের মতো করে বিষয়টার ব্যাখ্যা করছে৷ নিজেদের তরফ থেকে উকিল দিতে চাইছে তারাও, যাতে ‘‌দুর্গাপুজোর আগে'‌ তারক জামিন পেয়ে ঘরে ফিরতে পারেন৷ ‘‌নাস্তিক'‌ তারক বিশ্বাস কি সেটাই চেয়েছিলেন?‌ সম্ভবত না৷

শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা

দেবারতি গুহ

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়