1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

ভালোবাসা ছাড়া পাহাড় বাঁচে না, প্রাণ যায় মানুষেরও

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা ছাড়া পুরো বাংলাদেশই মোটামুটি সমতল৷ যদিও সিলেটের দিকে কিছু ছোট পাহাড়, টিলা রয়েছে৷ যে রকমটা রয়েছে আরো কয়েকটি অঞ্চলে৷ তবে পাহাড়ি এলাকা বলতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাই৷

এই পাহাড়ে এক সময় বাস করতো কেবল কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠী৷ সমতলের বাঙালি বসতির খুব কাছে হলেও এই পাহাড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালিরা খুব একটা বাস করতে যায়নি৷ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গেলেও ফিরেছে সমতলে৷ দুর্গম পথঘাট আর খাড়া পাহাড়ের জুমচাষের জীবন বাঙালিদের খুব একটা আকর্ষণও করেনি৷

তবে গত শতাব্দীতে বেশ কয়েকবার পাহাড়ে পরিকল্পিত বাঙালি বসতি স্থাপনে সেখানকার এই জনমানচিত্র পাল্টে গেছে৷ পাহাড়ে পাহাড়িদের দুঃখের যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প৷ কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এ রকম একটি প্রকল্প৷ এই প্রকল্পে ভিটেবাড়ি হারানো মানুষের দুঃখের গল্পও আলোচিত হয়েছে নানা সময়ে৷ তবে রাস্তাঘাটের মতো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও অনেক এলাকায় ভিন্ন ধরনের কষ্ট বাড়িয়েছে পাহাড়িদের জীবনে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাহাড়ে যখন যেখানে রাস্তা হয়, সেই রাস্তা ধরে বাঙালিরাও পৌঁছে যায় গহীনে৷ 

পাহাড়ে আমি অনেকবার গিয়েছি৷ আমার মনে হয়েছে, কালো পিচঢালা রাস্তার সাথে বাঙালি বসতির একটা সম্পর্ক রয়েছে৷ কয়েক বছর পূর্বে একবার গিয়েছিলাম অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড় সাকা হাফং-এ৷ ওই পাহাড়ের একেবারে পাদদেশে অবস্থিত হাজরাই পাড়া৷ এরপর ওই পাহাড়ের চূড়ার পথে উঁচুতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জনবসতি নেফিউ পাড়া৷ এই দুই পাড়াসহ আশেপাশের আরো অনেক আদিবাসী পাড়া রয়েছে৷ এই এলাকায় নেই কোনো বাঙালি৷ এসব এলাকায় সভ্যতাও যেন তেমন একটা পৌঁছায়নি৷

সাকা হাফং থেকে ফেরার পথে হাজরাই পাড়া থেকে খুব ভোরে বের হয়ে টানা হেঁটে রাত ৮টার দিকে জিন্নাপাড়ায়  পৌঁছাই৷ সেখানে ওই এলাকার প্রথম বিজিবি ক্যাম্প পাই আমি৷ তার মানে, ওইসব এলাকায় সরকারি বিভিন্ন বাহিনীরও স্থায়ী উপস্থিতি চোখে পড়েনি৷ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এসব পাড়ায় পানির কষ্ট হয়ত আছে৷ হয়ত দূরে থেকে পানি আনতে হয়৷ বিশেষ করে নেফিউ পাড়ার পানি নীচ থেকেই নিতে হয়৷ এটাই সেখানে স্বাভাবিক৷ এখন ভাবুন, সেই উৎসের পানিও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাঁরা কি বসবাস করতে পারবে?   আদিবাসীরা তাঁদের জীবনাচার দিয়ে ওই প্রবাহ ঠিক রাখে৷

এটা কত দুর্গম এলাকা, সেটা একটা দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা যাবে, সেখানে পর্যটকরা গেলে এসব পাড়ার মানুষ কাতর কণ্ঠে এক পাতা নাপা ট্যাবলেট চায়৷ অল্প দামের দুই-একটা ওষুধ চায়৷ হয়ত এটাই তাঁদের কোনো প্রিয়জনের প্রাণ রক্ষা করে দেবে৷ সেটা তাঁদেরকে দিতে পারলে তাঁরা এত খুশি হবে যেন হঠাৎ কোটিপতি হয়ে গেছে৷ পাহাড়ের বহু পাড়াই এক সময় এরকম ছিল৷

নীলাচলের কথাই বলা যাক৷ সেখানেও এক সময় আদিবাসী পাড়া ছিল৷ সেখানে এখন আর তাঁরা নেই৷ সেখানে ঝকঝকে রাস্তা হয়েছে৷ রিসোর্ট হয়েছে৷ আমরা গিয়ে আনন্দও পাই৷ আমাদের সেই আনন্দের পেছনে হারিয়ে যাওয়া একদল মানুষের কান্নাও রয়েছে৷

পাহাড়ে রাস্তা হলে হয়ত নাপা ট্যাবলেটের জন্য আকুল হয়ে বসে থাকা পাহাড়ির ওই ট্যাবলেট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়৷ কিন্তু একই সঙ্গে উচ্ছেদের আতঙ্কও তাঁদের উপর ভর করে৷

পাহাড়ে দখল-উচ্ছেদ-বন উজাড়ে আদিবাসীরা ঘরহারা হওয়ার পাশাপাশি নানা প্রাকৃতিক সমস্যাও সৃষ্টি হয়৷ প্রথমদিকে শুনে আমিও বেশ আশ্চর্য হয়েছিলাম৷ পরে বুঝেছি, পাহাড়ের চিরায়ত জ্ঞানের পরশ ছাড়া এখানকার প্রকৃতিও ভালো থাকে না৷

যেমন, ধরা যাক, আপনার একটা পাহাড় রয়েছে৷ সেই পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঝিরি বয়ে গেছে৷ তার তীরে আপনি বাস করেন৷ হয়ত এক সময় সেই পাহাড়ের গাছ কেটেই আপনার জীবিকা চলতো৷ এখন আপনি একটা ব্যবসা করবেন৷ সেই পাহাড়ে সব গাছ কেটে বিক্রি করে পুঁজি সংগ্রহ করতে চান৷ বা অন্য কোনো কারণে আপনি সব গাছ কেটে ফেলতে চান৷

সাধারণ দৃষ্টিতে এতে কী সমস্যা? নিজের গাছ আপনি বিক্রি করবেন, কে এখানে বাধা দিতে পারে?

কিন্তু এখানেই বিষয়টা শেষ হয়ে যায় না৷ কারণ, এটা পাহাড়৷ পাহাড়ি প্রকৃতি৷ মনে করেন, আপনি সব গাছ কেটে ফেললেন, এরপর কী হবে, জানেন? পাহাড়ে গাছ না থাকায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে সেই ঝিরির পানির ধারা৷ পানির উৎস না থাকলে আপনি সেখানে বসবাসও করতে পারবেন না৷ গাছ কেটে ব্যবসার পুঁজি সংগ্রহ হয়তো করতে পারবেন৷ কিন্তু সেটা আপনাকে বসত ঘর থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে৷

আবার ধরেন, বুঝতে পারার পর আপনি সেই ন্যাড়া পাহাড়ে গাছ লাগিয়ে দিলেন৷ গাছ বড় হলো, কিন্তু ঝিরিতে পানি এলো না৷ হ্যাঁ, এটাও হতে পারে৷ কারণ,  যে কোনো গাছ লাগালেই হবে না৷ কোন প্রজাতির গাছ ঝিরিতে পানি ফেরাতে পারবে, সেটা আপনাকে জানতে হবে৷ কাজ করতে হবে সেই অনুসারে৷ আবার পাহাড়ের গাছ কাটলে সেটা পাহাড় ধ্বসেরও কারণ হতে পারে৷ 

বছরখানেক আগে গিয়েছিলাম খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলায়৷ পাহাড়ের গাছ, পাহাড়িদের জীবন আর পানি ফেরানোর লড়াই যেন সেখানে একাকার হয়ে গেছে৷ দিঘীনালা থানার ঘোনাপাড়ার কার্বারি সন্তোষ কুমার ওই সময় আমাকে বলেছিলেন, আমাদের পাড়ার পাশে একটি ছড়া থেকে আমরা পানি পাই৷ ১৫ বছর আগেও সারা বছর এই ধারা থাকলেও এখন ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে সেই ছড়াতে আর পানি পাওয়া যায় না৷ 

নিজের পাড়া থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ভৈরপা ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, তখন আমাদেরকে এই ছড়া থেকে পানি নিতে হয়৷ পানি কমার কারণ হিসাবে আগের মতো গাছপালা না থাকাকে উল্লেখ করেন ৫৫ বছর বয়সি এই পাহাড়ি অধিবাসী৷

শুষ্ক মৌসুম এলেই এত দূর থেকে পানি নেওয়া পরিবারের প্রধান কাজ হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি জানান, কখনো নিজেকে, কখনো তাঁর স্ত্রী আবার কখনো ছেলেদের এসে পানি নিতে হয়৷ তবে পরিবারের প্রায় সবাইকে গোসলের জন্যও  কখনো দূরে আসতে হয় বলেও জানান তিনি৷

পাশের অন্য এক পাড়ার বাসিন্দা পূণ্যমনি চাকমা বলেন, এই এলাকায় এক সময় পালা ছাগলের পালের মতো বন্য শুকর, ভাল্লুক ও হরিণ দেখা যেতো৷ বাঘও চোখে পড়ত প্রায়ই৷ জমিতে বা পাহাড়ে কাজ করতে বা অন্য কোথাও যেতে মানুষকে দল বেঁধে যেতে হতো৷

‘ওইসব এখন স্বপ্নের মতো' উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমতল থেকে আসা বাঙালিদের কাঠ ব্যবসা, ব্রিকফিল্ড আর তামাক চাষের কারণে সেই বন হারিয়ে গেছে৷

তবে পানির উৎস ফেরানোর সংগ্রাম এখানকার কয়েকটি পাড়াতেই দেখেছি৷ এখানকার মানুষের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাঁরা ভারত প্রত্যাগত৷ উজাড় পাহাড় আবাদ করে পানির উৎস গড়ে তাঁরা এই এলাকায় বসবাস করার সংগ্রাম করছেন৷ পাহাড়ি বনে গাছ লাগিয়েছেন৷ কয়েক বছর ধরে ঝিরিতে পানির প্রবাহ বাড়ছে৷

আরণ্যক ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা এই এলাকায় এ বিষয়ে কাজ করলেও তারা কাজে লাগিয়েছে আদিবাসীদের চিরায়ত জ্ঞানকেই৷

DW | Muha Suliman (privat)

সুলাইমান নিলয়, সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

এই ঝিরির সঙ্গে পাহাড়ের আরো বহু কিছুর সম্পর্ক রয়েছে৷ ছোট ছোট এসব ঝিরি হচ্ছে পানির উৎস৷ অনেকগুলো ঝিরির পানি দিয়ে তৈরি হয় ঝরনা, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে নদীতে৷ সব স্তরেই এসব পানির উৎসের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে বহু পাড়া, বহু মানুষ৷

এসব ঝিরিতে পানি না থাকলে শুকিয়ে যায় ঝরনা, পানি থাকে না নদীতে৷ সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ের বিভিন্ন নদীতে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র হয় পানির স্বল্পতা৷ কোনো কোনো নদী শুকিয়েও যায়৷ নদীতে পানি না থাকা অনেকের চোখে পড়ে৷ চোখে পড়ে না পানিশূন্যতার কারণ৷

পাহাড়ের গাছ উজাড় হলে বেড়ে যায় ভূমিক্ষয়৷ ক্ষয় হয়ে যাওয়া মাটিতে ভরে যায় ঝিরি-নদী৷ ফলে বর্ষায় বন্যা হয়, যা অন্য ধরনের দুর্দশা ডেকে আনে পাহাড়িদের জীবনে৷

এভাবে পাহাড়ের প্রকৃতি নির্ভর জীবনে একটির সঙ্গে অন্যটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত৷ এক জায়গায় ছেদ পড়লে পুরো সিস্টেম পাল্টে যায়৷ রুদ্ররূপ ধারণ করে প্রকৃতি৷ তাই পাহাড়কে পাহাড়ের মতো রাখতে, মানুষের বাসযোগ্য রাখতে রক্ষকদের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়