1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘ভালোবাসার স্বাধীনতা'

উপরের শিরোনামটি যত সহজ মনে হচ্ছে আমি যে বিষয়টির অবতারণা করবো সেই বিষয়টি অনেকের কাছেই তত সহজ মনে হবে না৷ আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তো নয়ই৷

তবে বিষয়টি যে যেভাবেই দেখুন না কেন এটা নিয়ে আলোচনা করতেই হবে, কারণ বিষয়টি শারীরিক, মনোজাগতিক এবং বাস্তব৷

গত শনিবার ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিলে মোড়ক উন্মোচন হওয়া এক কমিক স্ট্রিপে এই ‘ভালোবাসার স্বাধীনতা'র কথা বলা হয়েছে৷ এই স্ট্রিপে ধী নামে একটি মেয়ের গল্প বলা হয়েছে যে নাকি আরেকটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে৷ ধী বাংলাদেশের মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে৷ তবে তার ভালোবাসা, ভালোলাগা, জীবনবোধ আর দশজনের মতো নয়৷ সে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, তার ভালবাসা সমলিঙ্গের প্রতি৷ এই ধী হলো বাংলাদেশের প্রথম সমকামী কমিক চরিত্র৷

এই চরিত্রটি সামাজিক প্রচলিত মূল্যবোধের কারণে দ্বিধায়ও পড়ে, পড়ে সংশয়ে৷ ধী তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না যে সে কি করবে- তার পরিবারকে খুশি করার জন্যে কোনো পুরুষকে বিয়ে করবে, আত্মহত্যা করবে নাকি তার মন যা চাইছে সে সেটাই করবে৷

বয়েজ অব বাংলাদেশ (বব) নামের একটি সমকামী গ্রুপ এই কমিক স্ট্রিপটি তৈরি করছে৷ তারা বলছেন, ‘‘এই কার্টুন চরিত্রটির মধ্য দিয়ে সারা দেশে ‘ভালোবাসার স্বাধীনতার' বার্তা পৌঁছে যাবে৷'' তাদের কথা, ‘‘কে কাকে ভালোবাসবে এই সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতা তার নিজের৷''

গ্রুপটির সদস্যরা জানিয়েছেন, ‘‘বাংলাদেশে সমকামিতা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত৷ তাই সমকামী নারী ও পুরুষকে গোপনে জীবনযাপন করতে হয়৷ অনেকে সাধারণ একটি পরিবারের ভেতরে থেকেও দ্বৈত জীবনযাপন করেন৷''

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমন্ত্রণ পেয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে অল্প কিছু লোক এই সমকামী কমিক স্ট্রিপটি দেখেছেন৷ কিছু দেশি এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যম খবরটি পরিবেশন করেছে৷ তবে সব পরিবেশনায় যেন একটু চাপা ভাব লক্ষ্য করা গেছে৷ হয়তো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অথবা সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে এমনটি হয়েছে বলে আমার ধারণা৷ তবে এই চাপা স্বর হয়তো ধীরে ধীরে উচ্চকিত হবে৷ এবার কমিক চরিত্রের মাধ্যমে হলো৷ এরপর হয়তো সত্যিকার বাস্তব চরিত্রের মাধ্যমে হবে৷ কারণ বাংলাদেশে সমকামিতা একটি বাস্তবতা৷ সেটা আমি গ্রহণ করি বা না করি৷ তারা আছেন এটাই সত্য৷ আইনে নিষেধ থাকায় তারা গোপনে আছেন, কিন্তু আছেন৷

DW-Korrespondent in Bangladesch, Harun Ur Rashid Swapan

হারুন উর রশীদ স্বপন, ঢাকা

সমকামিতা বাংলাদেশে আইনসিদ্ধ না হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশকিছু দেশে সমকামিতা আইনসিদ্ধ৷ আর ভারতে এনিয়ে আছে বিতর্ক৷ ২০০৯ সালে ভারতের আদালত একে বৈধতা দিলেও ২০১৩ সালে তা আর টেকেনি৷ ২০০৯ সালে ভারতের আদালতের রায়ের বক্তব্যটি বেশ কৌতূহল উদ্দীপক৷ ২০০৯ সালের ২রা জুলাই দিল্লি হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ‘‘প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সম্মতিক্রমে সমকামিতার আচরণ অপরাধের আওতায় পড়েনা৷ এই রায়ে আরো বলা হয়েছে যে ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকার রক্ষা নীতির পরিপন্থি৷'' কিন্তু ২০১৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর সমকামিতাকে অবৈধ ঘোষণা করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট৷

সমকামী শব্দটি দিয়ে লিঙ্গবৈচিত্র্য পুরোপুরি প্রকাশ করা যায়না৷ এর সঙ্গে আছে উভকামিতা৷ আছে রূপান্তরিত লিঙ্গ৷ আর সব মিলিয়ে বলা হয় সংখ্যালঘু লিঙ্গ৷ এখন মানবাধিকারের ছাতায় সংখ্যালঘু লিঙ্গও অন্তর্ভুক্ত৷ বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেনে হিজরারা৷

সমকামিতার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে বিজ্ঞান৷ আর তাতে দেখা যায় সমকামিতা প্রধানত জিনগত ও হরমোনগত৷ এক কথায় বলা যায় বয়োলোজিক্যাল৷ আরো একটু বিস্তারিত গবেষণায় বলা হয়েছে সমকামিতা মনোজৈবিক৷

সমকামিতা কি যৌন ও মানসিক বিকৃতি? এ নিয়ে না বোধক উত্তরই এসেছে অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায়৷

বাংলাদেশের সমকামীদের জন্য প্রথম অনলাইন গ্রুপ ‘গে বাংলাদেশ'৷ বর্তমানে বয়েজ অফ বাংলাদেশ হলো দেশের বৃহত্তম সমকামী সংগঠন৷ এটি ২০০৯ থেকে তারা সক্রিয়৷ এখন প্রশ্ন সমকামিতা আর ভালোবাসার স্বাধীনতাকে কী এক করে দেখা যায়?

সে প্রশ্নের জবাব আমি না দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন-এর ‘লিঙ্গসূত্র' থেকে লম্বা একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি৷ আশা করি বিরক্তিকর হবে না৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘লিঙ্গ কিন্তু তত সহজ নয়, যত সহজ বলে একে ভাবা হয়৷

লিঙ্গ শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানসিক, মনস্তাত্বিকও৷ অধিকাংশ লোক ভাবে জগতের সব সুস্থ মানুষই বুঝি শরীরে পুরুষ, মনেও পুরুষ; অথবা শরীরে নারী, মনেও নারী৷ কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে৷ ব্যতিক্রমটা বুঝতে হলে জেন্ডার বা মনোলিঙ্গ বুঝতে হবে৷ শরীরে যেমন লিঙ্গ থাকে, মনেও এক ধরনের লিঙ্গ থাকে, লিঙ্গবোধ থাকে৷ যাদের শারীরিক জৈবলিঙ্গের সঙ্গে মনোলিঙ্গের কোনও বিরোধ নেই, তাদের আজকাল ‘সিসজেন্ডার' বলা হয়৷ জগতের সবাই সিসজেন্ডার নয়, অনেকে ট্রান্সজেন্ডার, সিসজেন্ডারের ঠিক উল্টো৷ পুরুষের শরীর নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু মনে করে না যে সে পুরুষ, মনে করে সে নারী; আবার ও দিকে নারীর শরীর নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু মোটেও সে বিশ্বাস করে না যে সে নারী, তার দৃঢ় বিশ্বাস সে পুরুষ৷ এই ট্রান্সজেন্ডাররা বা রূপান্তরকামীরা নড়নচড়নহীন রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘পেন ইন দি অ্যাস'৷ এদের দুর্ভোগ প্রতি পদে পদে৷ প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে গেলে সবাইকেই অবশ্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়৷''

ঢাকায় ধী এর গল্প এবার অনেকটা অনুচ্চ স্বরের কমিক চরিত্র৷ হয়তো এই চরিত্র এরপর ভালোবাসার স্বাধীনতার কথা আরো উচ্চস্বরে বলতে চাইবে৷ তসলিমা নাসরিন যে দুর্ভোগের কথা বলেছেন তা কমিয়ে আনতে বা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাইবে৷ যদি এই বাস্তবতা বায়োলোজিক্যাল হয় তাহলে এর বিরুদ্ধে আমি কীইবা বলতে পারি! যদি মনোজাগতিক গঠন সেরকম হয় তাহলে এটাতো বাস্তবতা৷ আর এই বাস্তবতা আমরা কী বাস্তবতার নিরিখে বুঝতে পারব? আমাদের আইন কী বলবে? আমাদের সমাজ এবং সামাজিক কাঠামোই বা কীভাবে দেখবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়