1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

ভারতে গৃহকর্মীদের ‘শ্রমিক'‌ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি

এদেশে গৃহকর্মীদের অল্প বেতনে কাজ করানো, বেতন না দেওয়া, শারীরিক নির্যাতন, অতিরিক্ত কাজের বোঝা ও অমানুষিক আচরণ করার অভিযোগ নতুন নয়৷ সাপ্তাহিক ছুটি, কাজের ফাঁকে বিশ্রাম অথবা বেতন নিয়ে দর কষাকষির তাঁদের কোনো সুযোগই নেই৷

‌অন্যান্য পেশার মতো মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন, ন্যূনতম বেতন আইনের আওতায় আসেন না ভারতের অসংখ্য গৃহকর্মীরা৷ দেশে বেশ কয়েকটি শ্রম আইন থাকলেও কেনোওটিতেই গৃহকর্মীদের সুরক্ষার কথা বলা নেই৷ এদেশে নিয়োগকারীর ইচ্ছায় গৃহকর্মী নিযুক্ত হন৷ পছন্দ না হলে নিয়োগ কর্তার ইচ্ছাতেই ছাঁটাই হন৷ কোনো সরকারি নিয়ম বা আইনের বালাইটুকুও নেই৷

পরিচারক অথবা পরিচারিকাদের ‘‌অতিকষ্টে'‌ কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, এমন দু'টি আইন অবশ্য ভারতে আছে৷ যার মধ্যে একটি হলো, ‘‌অসংগঠিত কর্মীদের সামাদিক সুরক্ষা আইন – ২০০৮'‌ এবং ‘‌কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইন — ২০১৩'৷ আইন হলেও প্রথমটি একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প৷ দ্বিতীয়টি কর্মরত মহিলাদের যৌন হয়রানি রোখার আইন৷ আইনি সুরক্ষা তো দূর, কোথাও গৃহকর্মীদের ‘‌শ্রমিক'‌ অথবা ‘‌কর্মী'‌ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উল্লেখ নেই৷

পশ্চিমবঙ্গের গৃহকর্মীদের দাবি আদায়ে লড়ে চলেছে সারা বাংলা পরিচারিকা সমিতি৷ সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজার৷ সংগঠনের সম্পাদিকা পার্বতী পাল একাধিকবার আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন৷ জাতীয় পরিস্থিতি তাঁর নখদর্পনে৷ পার্বতী দেবীর কথায়, ‘‘গৃহকর্মীদের পেশায় মহিলাদের সংখ্যাই বেশি৷ বেকারত্বের সংখ্যা যতবেশি বাড়ছে, মেয়েরা তত বেশি পরিচারিকার কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন৷ ন্যাহ্য দাবি আদায়ে ২০০০ সাল থেকে আন্দোলন চালাচ্ছি৷ কেন্দ্র সরকার এখন যেটা প্রচার করছে, ২০০৯ সাল থেকে তার খসড়া প্রস্তাব তৈরি হচ্ছিল৷ আমাদের দাবি আমরা সরকারকে জানিয়েছি৷ মাসিক ১৮,০০০ টাকা বেতনের দাবি জানানো হয়েছে৷ সেইসঙ্গে সপ্তাহে একদিন ছুটি দিতে হবে৷ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে৷ ঐ সময়ে সরকারকে বেতনের বন্দোবস্ত করতে হবে৷ এছাড়াও পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে৷ রাজ্যে আমাদের আন্দোলনের জেরে কয়েকটি জায়গায় এই দাবিগুলির কয়েকটি আদায় করা সম্ভব হয়েছে৷ আন্দোলনের মাধ্যমেই বাকি দাবিগুলি আদায় হবে৷'' 

অডিও শুনুন 06:13

‘আন্দোলনের মাধ্যমেই বাকি দাবিগুলি আদায় হবে’

‘‌অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস'‌-‌এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অমরজিৎ কৌর বললেন, ‘‘‌সবার আগে গৃহকর্মীদের ‘‌কর্মী'‌ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ এ জন্য জাতীয় স্তরে একটি নীতি নির্ধআরণ অত্যন্ত জরুরি৷ তারপর বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন৷'' 

তবে সম্প্রতি গৃহকর্মীদের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‌ভারতের শ্রম মন্ত্রক একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে৷ সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে৷ কিন্তু সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে আওয়াজ উঠছে, গৃহকর্মীদের প্রতি অন্যায় রুখতে হলে গৃহকর্মীদের নিয়োগ ও কাজ নিয়ে বিশেষ আইনি সুরক্ষার প্রয়োজন৷ শ্রম কল্যাণ দপ্তরের মহা নির্দেশক রাজিত পুনহানির কথায়, ‘‘‌পরিচারক ও পরিচারিকাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা, নিয়োগের শর্তাবলী, অভিযোগ নথিভুক্ত করার জায়গা এবং তার সমাধান করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক গঠনতন্ত্র তৈরি করতে চাইছে শ্রম মন্ত্রক৷ এমনটা বাস্তবাযিত হলে গৃহকর্মীরাও অন্যান্য কর্মীর মতোই মর্যাদা পাবেন৷ যে যার রাজ্যের শ্রম দপ্তরে নাম নথিভুক্ত করাতে পারবেন৷'' ভারতের মতো দেশে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও যাবতীয় সুযোগ-‌সুবিধা প্রদান করা নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন (‌আইএলও)‌-‌র৷ তারা ভারত সরকারের নীতি নির্ধারণের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে৷

দেশে গৃহকর্মীর সংখ্যা কত?‌ সরকারের কাছে সেই অর্থে কোনও হিসেব নেই৷ অবশ্য ‘‌ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিস'‌-‌এর একটি হিসেব অনুযায়ী, গোটা দেশে ৪০ লক্ষ থেকে এক কোটি গৃহকর্মী ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন৷ এঁরা বেশিরভাগই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করেন৷ দেশের পূর্বের রাজ্যগুলি যেমন, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগঢ়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্যান্য রাজ্যে রুটি-‌রুজির জন্য পাড়ি দেয় এঁরা৷

অডিও শুনুন 02:48

‘এঁরা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের অমানবিক, অনৈতিক আচরণের শিকার’

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দাবি-‌দাওয়া নিয়ে কাজ করেন কলকাতার অম্বিকেশ মহাপাত্র৷ তিনি মনে করেন, দেশভাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা এসেছিল ১৯৪৭ সালে৷ তারপর ১৯৫০ সালে সংবিধান গৃহিত হয়েছিল৷ এর ৬৭ বছর পরেও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন৷ এটা দুর্ভাগ্যজনক৷ তাঁর কথায়, ‘‘‌দেশের বহু মানুষ অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে বেঁচে আছেন৷ এঁরা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের অমানবিক, অনৈতিক আচরণের শিকার৷ শ্রমিক হিসেবে তো দূর, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতিটুকুও মেলে না অনেক সময়৷ কিন্তু এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ জরুরি৷ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে৷ সেইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে গৃহকর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও আইন তৈরি করতে হবে৷'

একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তার প্রশ্ন, ‘‘সরকারের খসড়া শুধুমাত্র ‘‌গাইডলাইন'‌৷ আইন মেনে অপরাধ দমনের উপযুক্ত নয়৷ যৌন নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা, বন্দি করে রাখার মতে ঘটনা ঘটলে কী হবে?‌ গৃহকর্মীরা কি আদালতে যেতে পারবেন?‌ দর কষাকষি ছাড়া একটি বেতন নীতি তৈরি হওয়া উচিত৷ এবার এ সব নিয়ে সরকারের ভাবা উচিত৷''

রাজধানী দিল্লির পার্শ্ববর্তী শহর নয়ডায় এক বহুতলে অভিজাত পরিবারে পরিচারিকার কাজ করতেন বাংলাদেশ থেকে আসা ২৬ বছরের মালতী (‌নাম পরিবর্তিত)‌৷ গত জুলাই মাসে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন তিনি৷ অভিযোগ, তাঁকে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি চুরির অভিযোগে বন্দি করে রেখেছিল গৃহকর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা৷ শেষমেশ মালতীর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা ঐ আবাসনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখানোর পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়৷ পরে তদন্তে জানা যায়, দু-'মাস ধরে বেতন দেওয়া হয়নি মালতীকে!‌ এই একটি ঘটনা থেকে গোটা ভারতে গৃহকর্মীদের দুর্দশার আঁচ পাওয়া যেতে পারে৷

চলতি বছরের গোড়ায় মুম্বইয়ের অভিজাত আবাসন কমপ্লেক্সের আবাসিকদের দুর্ব্যবহার ও উপযুক্ত মজুরি না দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট করেছিলেন গৃহকর্মীরা৷ তখনকার মতো গৃহকর্মীদের দাবি মেনে নেন আবাসিকরা৷ কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আন্দোলনকারী সমস্ত গৃহকর্মীকে কাজ থেকে বের করে দেওয়া হয়৷

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের বক্তব্যের যেটুকু নির্যাস পাওয়া গেল তা হলো, সরকারি নীতি নির্ধারণ করে অন্যান্য কর্মীদের মতোই গৃহকর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি পরিচারক ও পরিচারিকাদের প্রতি সাধারণ মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি৷ তেমনটা সম্ভব হলে তবেই গৃহকর্মীদের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং তাঁরা সুরক্ষিত বোধ করবেন৷

প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়