1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

মুক্তিযুদ্ধ

বিপদেও হাল ছাড়েননি নারী মুক্তিযোদ্ধা মাজেদা

শুধুমাত্র স্বাধীনতা যুদ্ধই নয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শুরু করে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সংঘটিত নানা আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম সাথী মাজেদা শওকত আলী৷

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের পরশ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁকে সাহস যুগিয়েছে৷

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ১৯৪৭ সালে জন্ম মাজেদা শওকত আলীর৷ পিতা আব্দুল ওয়াহেদ এবং মা সালমা ওয়াহেদ৷ পাকিস্তান সেনা বাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন শওকত আলীর সাথে বিবাহের পর থেকেই স্বাধিকার আন্দোলনের ব্যাপারে সোচ্চার হন মাজেদা৷ দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য চলমান প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি৷ কারণ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয় তাঁদেরই একজন কর্নেল (অবঃ) শওকত আলী৷ তাই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে সেই ছেষট্টি সাল থেকেই আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল, নির্যাতন - এসব কিছুর মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে সংগ্রামী দম্পতি মাজেদা ও শওকত আলীকে৷

ডয়চে ভেলের সাথে টেলিফোন আলাপচারিতায় এসময়ের লোমহর্ষক ঘটনার কথা জানালেন নারী মুক্তিযোদ্ধা মাজেদা শওকত আলী৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন শওকত আলী তখন কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন৷ তখন আমাদের প্রথম সন্তানের বয়স ছিল মাত্র দশ মাস৷ সেসময় তিনি আমাকে একদিন বললেন যে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে৷ আর এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ মুজিব ভাই৷

তখন থেকেই আমি জানতাম যে, তারা একটা পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য৷ তখন আমাদের বিবাহিত জীবনের মাত্র এক-দেড় বছর পেরিয়েছে৷ তখন তিনি বলছিলেন যে, এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে, ধরা পড়ে গেলে আমার শাস্তি হতে পারে৷ শাস্তিতে আমার মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে৷ এমন কঠিন কথা শুনে আমি খুব বিব্রত এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়েছিলাম৷ তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, দেশকে ভালোবাসতে হলে জীবন দিতে হয়৷ তোমার মতো অনেক মেয়ে বিধবা হয়ে যাবে৷ তোমার বাবুর মতো অনেক বাবু তাদের বাবাকে হারাবে৷ কিন্তু তারপরেও দেশের জন্য যুদ্ধ করতে হবে৷ দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং আমাদের বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে৷ সেই থেকেই আমি জানতাম যে, যে কোন উপায়েই হোক বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে৷ এটা ১৯৬৬ সালের কথা৷''

কুমিল্লা থেকে পরে করাচিতে বদলি করা হয় সেনা কর্মকর্তা শওকত আলীকে৷ তাঁর সাথে স্ত্রী মাজেদা এবং শিশুপুত্র করাচি চলে যান৷ কিন্তু ১৯৬৮ সালের ১০ই জানুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হন শওকত আলী৷ এসময়ের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরলেন সাহসী ও ত্যাগী নারী মাজেদা শওকত আলী৷ তাঁর ভাষায়, তাঁকে বন্দি করে করাচি থেকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ এরপর তাঁর আর কোন খবর পায়নি৷ আমি জানতাম না যে, তিনি কোথায় কিংবা কী অবস্থায় আছেন৷ তিনি বেঁচে আছেন কিনা তাও জানতাম না৷ সেখানে ১৯৬৭ সালের ৬ই জুন আমাদের দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীতে আসে৷ এসময় দু'টি সন্তান নিয়ে গৃহবন্দি অবস্থার মতো সেখানে ছিলাম এক মাস৷ বাংলাদেশে আসার মতো কোন ব্যবস্থা ছিল না৷ আমার কাছে ভাড়ার টাকাও ছিল না৷ আমার সাথে বাঙালি বা অবাঙালি কেউ যোগাযোগ করতো না৷ তবে আমার স্বামী বন্দি হওয়ার প্রায় ২৫ দিন পর এক বাঙালি তরুণ সেনা কর্মকর্তা খুব ঝুঁকি নিয়ে আমাদের বাসায় আসে৷ আমার সামান্য কিছু জিনিস ছিল৷ সেগুলো বিক্রি করে তিনি আমাদের বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করে দেন৷''

ইতিমধ্যে প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে যায় কিন্তু মাজেদা তাঁর স্বামীর কোন খোঁজ পাননি৷ ছয় মাস পরে ঢাকা সেনানিবাসে বিশেষ আদালতে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিচার শুরু হয়৷ এরপর ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি গণ আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৪ জন ছাড়া পেয়েছিলেন৷ শুধুমাত্র সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনানিবাসে বিচারাধীন অবস্থায় জেল-হাজতের ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানান মাজেদা৷ তিনি আরো জানান, ‘‘১৯৬৮ সালের ১৯শে জুন যেদিন বিশেষ আদালতে বিচার শুরু হয়৷ সেদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল আদালত প্রাঙ্গণে৷ সেদিন আদালত প্রাঙ্গণ ছিল লোকে লোকারণ্য৷ সবার খুব মন খারাপ ছিল৷ কারণ প্রায় ছয় মাস ধরে আমরা কারো পিতা, কারো স্বামী, কারো ছেলে যারা আটক ছিল তাদের কোন খবর জানতাম না৷ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ আমি খুব কাঁদছিলাম৷ হঠাৎ করে আমার মাথায় কারো হাত আমি অনুভব করেছিলাম৷ তাকিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ তিনি আমার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন৷ বললেন, তোরা কাঁদবি না, ওদেরকে আমি ফিরিয়ে আনবো৷ এদেশের মানুষ আমাদের মুক্ত করে আনবে৷''

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই
সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়