1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিতর্ক ও ইস্যু

পক্ষপাতের উর্ধ্বে উঠে বিচারিক মন নিয়ে বিচারকরা বিচার করবেন – এটা সব সমাজের চিরন্তন নীতি৷ সভ্যতার শুরুর দিকে শাসকই ছিলেন বিচারকদের প্রধান৷ তবে সভ্যতা গণতান্ত্রিক পথে পা বাড়ানো শুরু করলে পৃথক বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে৷

বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় এসে সম্পূর্ণরূপে পৃথক বিচার ব্যবস্থার ধারণা গড়ে উঠে৷ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তাতেই বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কথা বলা হয়েছে৷

বাহাত্তরের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে৷

তবে সংবিধানে এই ধরনের বিধান থাকলেও বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বহু জায়গায় রাষ্ট্রের অন্য বিভাগের সঙ্গে একাকার হয়েছিল৷

এমনকি নিম্ন আদালতের বিচারকরা নিয়োগও পেতেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে৷ বদলিসহ অন্যান্য কাজ করতো আইন মন্ত্রণালয়৷

এ অবস্থার অবসানে আইনি লড়াই হয় উচ্চ আদালতে৷ দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ মাসদার হোসেন মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় দেয়৷ রায়ে বিচার বিভাগকে পৃথক করতে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় আদালত৷

তবে এই রায়ের পরও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণে আট বছর পেরিয়ে যায়৷ এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আমল পেরিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক হয়ে যায়৷

নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনায় ঘুরে ফিরে এটা আসে৷ বর্তমানে নিয়োগের কাজটি করে থাকে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন৷ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে বদলি-পদোন্নতির কাজটি করে থাকে আইন মন্ত্রণালয়৷ 

এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট একটি বিচার বিভাগীয় সচিবালয় করতে চায়৷ এই লক্ষ্যে পুরাতন সড়ক ভবনে এই ‘সচিবালয়ে'-র জন্য একটি জায়গা উদ্বোধনও হয়েছে৷ তবে এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে৷

এখনো সুপ্রিম কোর্টের ওই সচিবালয় এলাকায় আদালতের প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তারা বসেন৷ সু্প্রিম কোর্টের কাজ করেন৷ নিম্ন আদালত চলে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই৷ তবে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেয়া হয়৷

এই পরামর্শের ব্যতিক্রম যে হয় না, সেটা নয়৷ তবে সমালোচকদের বক্তব্য হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের ইচ্ছার বাইরে নিম্ন আদালতে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ থাকাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার হুমকি৷

এক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হচ্ছে, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের নেই৷ তাছাড়া তারা সুপ্রিম কোর্টের ইচ্ছাতে কেবল সাচিবিক কাজই করেন৷

তবে সম্প্রতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশে সরকার বারবার সময় নিচ্ছে৷ এটা চূড়ান্ত হলে নিম্ন আদালতের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও খর্ব হবে বলে অনেকে মত দেন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

উচ্চ আদালত

বিচারে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের উপর সরকারের প্রভাব বিস্তার করা কঠিন৷ আদালত অবমাননার অভিযোগে বিশেষ করে সরকারের দুই মন্ত্রীর দণ্ড হওয়ার পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনার বিষয়ে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়৷

তবে অনেকে উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগ-অপসারণকে এই আলোচনায় যুক্ত করে দেখেন৷ এই দুই ক্ষমতা সরকারের কাছে থাকলে কিছু কিছু সংকট তৈরি হতে পারে৷ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিকে বাধাগ্রস্থ করতে বিএনপি সরকার ইচ্ছা করে আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ দেয়নি বলে তখন অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগের৷

পর্যাপ্ত বিচারক না থাকার বাস্তবতাও সে সময় দেখা যায়৷ আবার অনেক বিচারপতি বিব্রতও হয়েছেন ওই সময়৷ যেটাকে ‘অস্বাভাবিক' মনে করেছেন অনেকেই৷

সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনায় যোগ হয়েছে মাত্রা যোগ হয়েছে৷

বিচারকদের অপসারণ পদ্ধতি

বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়৷ এই সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়, এই অনুচ্ছেদের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না৷

এরপর বলা হয়, এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে৷

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে চলে যায়৷ পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ওই সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়৷ এরপর বিচারকদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়৷

এই পদ্ধতিতে কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক তদন্ত করেন৷ সর্বশেষ শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী রাজীব হায়দারের বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষপূর্ণ' লেখা বিতরণের অভিযোগ ওঠার পর এক বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তে নামে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল৷ তবে তদন্তের পর তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়৷

জিয়ার আমলে করা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী উচ্চ আদালতে বাতিল হলেও এই অংশ অক্ষত থেকে যায়৷

বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের আগের মেয়াদে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়েও এখানে হাত দেয়নি৷

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে ফিরিয়ে আনা হয় ৭২-এর সংবিধানের এ সংক্রান্ত বিধান৷ তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত আইন করার ঘোষণা দেন আইনমন্ত্রী৷

এই সংশোধনীর উদ্যোগ নেয়ার পর উচ্চ আদালতের অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এর বিরোধিতা করেন৷ সংশোধনী পাস হওয়ার পরও এই সমালোচনা অব্যাহত থাকে৷

এর মাঝেই সরকার সবচেয়ে বড় সমর্থনটি সম্ভবত আইন কমিশন থেকে পায়৷ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর আইন কমিশন একটি আইনেরও প্রস্তাব করে৷

এই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক৷ যিনি পঞ্চম সংশোধনী মামলায় বিচারকের দায়িত্বে থাকলেও রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করেননি৷

২০১৪ সালের নভেম্বরে এই সংশোধনী নিয়ে রুল দেয় হাই কোর্ট৷ শুনানির পর ১৬ সালের ৫ মে ওই সংশোধনী বাতিলের রায় হয়৷ রায়ে এই সংশোধনীকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়৷ 

এই মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে৷ আপিল বিভাগে এই শুনানিতে গত ৯ মে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে৷

বিচারপতি নিয়োগ

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণে সংবিধান সংশোধন, আইন তৈরি ইত্যাদি পর্যন্ত গড়ালেও নিয়োগের কোনো আইন বা বিধান নেই৷ সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতায় রাষ্ট্রপতি তাদেরকে নিয়োগ করে থাকেন৷ এক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেয়ার চল রয়েছে

তবে এক্ষেত্রেও পরামর্শের ব্যতিক্রম হয়েছে বলে নানা সময়ে শোনা যায়৷ বিচারক নিয়োগে দিক নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে একটি মামলাও হয়েছিল৷ ওই বছরের ৬ জুন আদালত এ বিষয়ে রুল দেয়৷ সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে গত ১৩ এপ্রিল পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে দেয় হাই কোর্ট৷

সুলাইমান নিলয়

সুলাইমান নিলয়, সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

গত ২২ মে ওই রায় প্রকাশিত হয়েছে৷ হাই কোর্টের বিচারক হিসাবে যোগ্য লোক খুঁজে পেতে বিভিন্ন মাপকাঠির কথা রায়ে বলা হয়েছে৷ তবে যেহেতু পুরো প্রক্রিয়া রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি সম্পন্ন করে থাকেন, তাই আদেশ জারি করেনি৷ নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও এই রায়ে বলা হয়েছে৷ নীতিমালা তৈরি সংসদের সার্বভৌম এখতিয়ার হওয়ায়-আদালত সেখানেও কোনো নির্দেশনা দেয়নি৷

অবশ্য আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের শেষের দিকে হাই কোর্টে অস্থায়ী বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেয়ে পরে বিএনপি আমলে স্থায়ী নিয়োগ বঞ্চিত হয়েছিলেন কিছুসংখ্যক বিচারক৷ তাঁদের মধ্যে ১০ জন এক মামলায় ‘নিয়োগ না দেয়াকে' চ্যালেঞ্জ করেন৷ ওই রায়ে সর্বোচ্চ আদালত এ ধরণের নীতিমালা করতে নির্দেশনা দিয়েছিল৷

সাম্প্রতিক এই রায়ে পূর্বের ওই রায়ের কথাও উদ্বৃত করে আদালত বলে, নীতিমালা প্রণয়নে সংসদের একান্ত এখতিয়ারে নির্দেশনা দিলে সেটা ভবিষ্যতে অসাংবিধানিক বিবেচিত হতে পারে৷
একইসঙ্গে সর্বশেষ এই মামলায় রুলের জবাব দিতে আদালতে না আসায় এবং আদালতকে সহযোগিতা না করায় বিবাদী আইন সচিব, মন্ত্রি পরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের সমালোচনা করেন৷

বিবাদীদের আদালতে না আসাসহ সার্বিকভাবে রায়ের এই পর্যায়ে এসে বলা যায়, বিষয়টির সমাধান এবং ভবিষ্যত গতিপথ সরকারের উপরই নির্ভর করছে৷

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গও সামনে আসে৷ এটা নিয়েও কথা থাকে৷ নিম্ন আদালতের ব্যয় সংস্থানের কাজটি আইন মন্ত্রণালয় করে৷ উচ্চ আদালত সরকার থেকে বরাদ্দ পায়৷ এ বিষয়টিও নিয়মের মধ্যে আসা উচিত – এমন আলোচনা আইন অঙ্গনে শোনা গেছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়