1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিরোধিতার যত কারণ

জাতীয় সংসদে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ পাস হয়েছে৷ তবে এই আইন নিয়ে চলছে ব্যাপক বিতর্ক৷ আইনটির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে রিটও হয়েছে৷ বলা হচ্ছে, এই আইনের কারণে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাবে৷

একই সঙ্গে এই আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তো বটেই, আইনটি নিজেই নিজের বিরোধী৷ বাংলাদেশ বাল্য বিবাহের উচ্চহারের দিক দিয়ে বিশ্বের অষ্টম অবস্থানে আছে৷ বাল্যবিবাহ কমে আসছে দাবি করা হলেও এর মূল শিকার যে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সি মেয়েরা, তাদের পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই৷

আইনের ১৯ ধারাই আপত্তির মূল কারণ৷ এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে, উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না৷''

এই আইনে নারীদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১৮ এবং পুরষের ২১৷ কিন্তু ওই বিশেষ বিধানের কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের নীচে, তাদের বিয়ে বিশেষ বিবেচনায় বৈধতা দেয়া হয়েছে৷

অডিও শুনুন 02:55

‘আমরা শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি’

এই আইনের ৫ , ৬ ,৭, ৯ , ১০ এবং ১১ ধারায় বাল্যবিবাহের দায়ে শাস্তির বিধান আছে৷ আর এসব বিধানে বাল্যবিবাহ করা, বিবাহ দেয়া, পরিচালনা করা, তথ্য গোপন করা প্রভৃতি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে৷ আছে বিবাহ রেজিস্ট্রির লাইসেন্স বাতিলের বিধান৷ আইনের ৮ ধারায় বাল্যবিবাহ-সংশ্লিষ্ট পিতা-মাতাসহ অন্যান্য ব্যক্তির শাস্তির কথা বলা আছে৷ আর ৭ ধারায় বাল্যবিবাহ করলে কী শাস্তি হবে, তা-ও বলা আছে৷ কিন্তু  বিশেষ বিধানের কারণে এই শাস্তি দেয়াও শর্তসাপেক্ষ হয়ে পড়েছে৷ কারণ, বিশেষ বিধানের আওতায় বাল্যবিবাহ হলে তা বৈধ হবে এবং শাস্তির আওতায় আসবে না৷ এটা একই সঙ্গে বাংলাদেশের পেনাল কোড বিরোধী৷ সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদও এই আইনের বিশেষ বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক৷

সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না৷''  এখানে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে৷

গত ১০ এপ্রিল জাতীয় আইনজীবী সমিতি ও নারী পক্ষের রিটের প্রেক্ষিতে  হাইকোর্টের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জে বি এম হাসানের বেঞ্চ প্রাথমিক শুনানির পর চার সপ্তাহের রুল দেন৷ রুলে  বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে৷ চার সপ্তাহের মধ্যে ওই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে সরকারকে৷

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রধান ফাওজিয়া করিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি৷ এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুনানির কথা রয়েছে৷ তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো শো কজের কোনো জবাব দেয়া হয়নি৷'' 

তিনি বলেন, ‘‘এই আইনটি পাশের সময় সংসদে আলোচনা হয়নি৷ এমনকি খসড়া আইনে সাধারণ মানুষের মতামতেরও সুযোগ ছিল না৷ শুনানির সময় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন মতামতের জন্য অ্যামিকাস কিউরি গঠন করা হবে, যারা আইনটি নিয়ে তাদের মতাতমত দেবেন৷''

ফাওজিয়া করিম মনে করেন, ‘‘এই আইনটি সংবিধান, পেনালকোড বিরোধী এবং আইনটি নিজেও সাংঘর্ষিক৷ নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য , শিক্ষা এবং ক্ষতায়নও বাধাগ্রস্ত করবে এই আইন৷''

ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে তিনি বলেন, ‘‘পেনাল কোডে বলা আছে ১২বছর বা তার কম বয়সি কোনো মেয়ের সঙ্গে সেক্সুয়াল রিলেশন করলে, তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে৷ তাহলে বাল্যবিবাহ বৈধ হলে ওই আইনের কী হবে৷ ইন্দোনেশিয়ার নারী ইমামরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছেন৷ আমাদের দেশে ১৯২৯ সালের যে আইন প্রচলিত ছিল, তাতেও বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ এবং বেআইনি ছিল৷ কিন্তু ২০১৭ সালের আইনে তা বৈধ করে দেয়া হলো৷ কী অবাক করা ব্যাপার!''

বাংলাদেশ শিশু-নারী অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সদনগুলোর স্বাক্ষরকারী৷ চলতি বছরে  সিডও সনদে বাংলাদেশকে বাল্যবিবাহ রোধে সব ধরণের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে এবং বাংলাদেশও পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে৷ কিন্তু বিশেষ বিধান অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে যায়৷ ফাওজিয়া করিম বলেন, ‘‘সিডও সনদে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহ দূর করার অঙ্গীকার করে আসার পর বাল্যবিবাহের পক্ষে আইন করেছে৷''

অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ভয়ঙ্কর দিক হলো বিশেষ বিধানের সুযোগ নিতে পারে ধর্ষকরা৷ তারা ধর্ষণের পর রেহাই পেতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করতে পারে৷ আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় তা সহজেই সম্ভব৷ এরপর বিপদ কেটে গেলে সেই মেয়েকে ডিভোর্স দিতে পারে৷ কারণ, ডিভোর্স দেয়া তো আর বেআইনি নয়৷ তাই কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান গ্রহণযোগ্য নয়৷'' 

নূর খান মনে করেন, ‘‘এখানে ধর্ষণের এক ধরণের বিচারিক অনুমোদনের অশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে৷''

প্রসঙ্গত, ওয়াশিংটনভিত্তিক  থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিচার্স ইন্সটিউট(আইএফপিআরআই)-এর মার্চের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে গত দুই দশকে বাল্যবিবাহের হার শতকরা ৬২.৩ ভাগ থেকে কমে ৪৩ ভাগ হয়েছে৷ কিন্তু এর মধ্যে অন্য একটি ফাঁক আছে৷

আইএফপিআরআই-এর গবেষণায় দেখা যায় ১৯৯৬ থেকে থেকে ২০০৫ সালে বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার ছিল শতকরা ১৫.৯ ভাগ, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের বিয়ের হার ছিল ৪৬.৫ ভাগ৷ সব মিলিয়ে বাল্য বিবাহের হার ছিল শতকরা ৬২.৩ ভাগ৷

অডিও শুনুন 02:28

‘এখানে ধর্ষণের এক ধরণের বিচারিক অনুমোদনের অশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে'

আর ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার শতকরা ৫.৪ ভাগ, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের বিয়ের হার ৩৭.৮ ভাগ৷ সব মিলিয়ে বাল্য বিবাহের হার শতকরা ৪৩.২ ভাগ৷

দৃশ্যত বাল্যবিয়ের হার কমলেও তাতে আত্মতৃপ্তির তেমন কোনো কারণ নেই৷ কারণ, গত দুই দশকে ১৫ বছরের কম বয়সিদের বিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও মধ্যবর্তী ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের বিয়ের হার তেমন কমেনি৷ মাত্র ১০ ভাগের মত কমেছে৷

ফাওজিয়া করিম বলেন, ‘‘আমরা যদি এসডিজি অর্জন করতে চাই, তাহলে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে৷ কিন্তু নতুন আইন বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করবে৷'' আর নূর খান বলেন, ‘‘এই আইনটি আমাদের পেছনের দিকে নিয়ে যাবে৷''

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ চলতি বছরের ১১ মার্চ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে৷ এর মানে হলো, ওই দিন থেকেই আইনটি কার্যকর হয়ে গেছে৷ গেজেটে বলা হয়েছে, ‘‘১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনটিকে নতুন করে যুগোপযোগী করা হয়েছে৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়