1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

বাংলাদেশে ৮০ ভাগ শিশুই শারীরিক শাস্তির শিকার

বাংলাদেশে শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও, তা খুব একটা কাজে আসছে না৷ এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না৷ শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে শারীরিক শাস্তির শিকার হচ্ছে বেশি৷

বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা বরিশালের মুলাদি উপজেলার ফজলুল উলুম সেরাতুল কুরআন মাদ্রাসার শিশু শ্রেণির ছাত্র মাহিম হাওলাদার৷ বৃহস্পতিবার ( ১৪.০১.১৬) সে বাড়ি থেকে গোসল না করে ক্লাসে যায়৷ আর এই অপরাধে তাকে ঠান্ডা পানিতে দাঁড় করিয়ে পেটে আগুনের ছেঁকা দিয়ে শাস্তি দেয় তার ক্লাস শিক্ষক৷ শিশু মাহিম এখন হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করছে৷

গত ৪ঠা জানুয়ারি মাগুরা সদর উপজেলার আলোকদিয়া পুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র সাকিবুল ইসলাম সাকিবকে বেত্রাঘাত করেন ইংরেজি শিক্ষক মো. মুজাহিদুল ইসলাম৷ আঘাত এত গুরুতর ছিল যে, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়৷ সাকিবের অপরাধ, সে ঐ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া বাদ দিয়েছিল৷

২০১৫ সালের ২৩শে আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার এস কে এম এইচ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল-নির্ধারিত টেইলার্স থেকে ড্রেস না বানানোয় ১৫ জন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেন প্রধান শিক্ষক৷ এছাড়া ২৫ জন ছাত্র-ছাত্রীকে এক ঘণ্টা স্কুল মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখেন৷

Bangladesch Hotline Hilfe gewalt gegen frauen und Kinder

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে হটলাইন

স্কুলে শিশুদের শারীরিক শাস্তির উদাহরণ আরো দেয়া যাবে৷ কিন্তু এবার একটি ভিন্নধর্মী শাস্তির ঘটনা বলা যাক৷ ঘটনাটি গত বছরের ১লা আগস্টের৷ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের ২০০ শিক্ষার্থীকে রাস্তার দু'পাশে বৃষ্টির মধ্যে দুই ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়৷ কারণ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে স্বাগত জানানো৷

বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িতে শারীরিক শাস্তি নিয়ে ইউএনডিপি একটি জরিপ পরিচালনা করে ২০১৩ সালে৷ সাক্ষাৎকার ভিত্তিক সেই জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন জানিয়েছে যে তারা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে৷ তাছাড়া প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন শিশু জানায় যে তারা বাড়িতে অভিভাবকদের হাতে শারীরিক শাস্তি পেয়ে থাকে৷

অন্যদিকে ইউনিসেফ-এর জরিপ বলছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৯১ ভাগ এবং বাড়িতে শতকরা ৭১ ভাগ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার৷ জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে বেত বা লাঠির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এবং ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছাত্র এই বেত বা লাঠির শিকার হয়৷

এই দু'টি জরিপেই স্পষ্ট যে বাংলাদেশের শিশুদের গড়ে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং বাড়িতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়৷

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এ রকম ২৬৭টি সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক, যারা শিশুদের অধিকার ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করে৷ তাদের হিসাব মতে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে দুই হাজারের বেশি শিশু৷ ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২,১৯৭ এবং ২০১৩ সালে ১,১১৩ জন৷

Bangladesch Kinderheirat

বাল্যবিবাহ আর একটি অপরাধ

শিশু অধিকার ফোরাম-এর পরিচালক আব্দুস শহিদ মাহমুদ ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেয়া কমেছে, তা বলা ঠিক হবে না৷ তবে সচেতনতা কিছুটা হয়ত বাড়ছে৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেত দিয়ে পেটান, চড়-থাপ্পড়, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, ওঠ-বস করানো, বেঞ্চের ওপর দাঁড় করানো, রোদে দাঁড় করানো – এই শাস্তিগুলো এখনো প্রচলিত আছে৷ এছাড়া পরিবারে বা বাড়িতেও শিশুদের চড় থাপ্পড় মারা হয়, এমনকি পেটানোর ঘটনাও ঘটে৷''

তবে তাঁর মতে, ‘‘শিশুদের আরো একটি বড় শারীরিক শাস্তি হলো – কোনো মন্ত্রী-এমপিকে স্বাগত জানাতে স্কুলের শিশুদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে বা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা৷ আমরা প্রায়ই এ ধরনের ঘটনায় শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও পাই৷''

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইউ সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে আইনগত সহায়তা দেয়ার কাজ করে৷ ব্লাস্ট-এর উপ-পরিচালক মাহবুবা আক্তার ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘২০১১ সালে হাইকোর্ট শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেয়ার বিষয়টি বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে৷ হাইকোর্ট-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি পরিপত্রও জারি করে৷ এই পরিপত্রই আইন৷''

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা শাস্তিগুলো হলো: হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টার জাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা, কান টানা বা ওঠ-বস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নীচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রমআইনে নিষিদ্ধ৷

এই পরিপত্রে শাস্তির কথাও বলা হয়েছে৷ বলা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিলে ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থি হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে৷ অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে৷ প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে৷

অবশ্য ব্লাস্ট-এর উপ-পরিচালক মাহবুবা আক্তার জানান, ‘‘এখনো এই আইনটি সেই অর্থে কার্যকর হচ্ছে না৷ কেউ সেভাবে অভিযোগও করছে না৷ অভিভাবকরা বাড়িতে শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিলে আইনের আশ্রয় কে নেবে?''

তাঁর কথায়, ‘‘আমরা গত পাঁচ বছরে শিশুর শারীরিক শাস্তির ব্যাপারে ২৬টি অভিযোগ গ্রহণ করে তা মানবাধিকার কমিশনে পাঠিয়েছি৷ আমরা দেখেছি ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে শিশুদের শারীরিক শাস্তি শতকরা তিন ভাগ বেড়েছে৷''

বাংলাদেশে এখনো শারীরিক শাস্তির কিছু আইন আছে৷ এর মধ্যে ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে আইন, চাবুক আইন অন্যতম৷

শিশু অধিকার ফোরাম-এর পরিচালক আব্দুস শহিদ মাহমুদ এবং ব্লাস্ট-এর উপ-পরিচালক মাহবুবা আক্তার দু'জনই মনে করেন, শিশুদের শারীরিক শাস্তি বন্ধ করতে পুরনো আইন বাতিলের পাশাপাশি নতুন আইন প্রণয়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা এবং প্রচারণা৷ শিক্ষক এবং অভিবাবকদের বোঝাতে হবে শারীরিক শাস্তি শিশুর বিকাশে সহায়তা তো করেই না, উল্টে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে৷ তাই তাঁরা যদি সচেতন হন, তাহলে শিশুদের শারীরিক শাস্তি কমে আসবে৷''

শিশুদের শারীরিক শাস্তি রোখার জন্য গণসচেতনতা আনার উপায় কী বলে আপনি মনে করেন? জানান নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়