1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা - দুই

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ এলেন জাতীয় সংগীত হয়ে৷ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাংলাদেশের সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ধ্যান ধারণা পাল্টে গেলো৷

Rabindranath Tagore (1861 - 1941) undatierte Aufnahme

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কি আমাদের নয়, অবসান ঘটলো এই বিতর্কের৷ অবিসংবাদিতভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন আমাদের কবি৷ এমন কি একদিন যাঁরা ছিলেন রবীন্দ্রনাথবিরোধী, তাঁরাও হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রপ্রেমিক৷ বিশিষ্ট এক প্রাবন্ধিক লিখেছেন: ‘‘পাকিস্তানকালে যাঁরা পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে কিংবা বিবৃতি দিয়ে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের কিংবা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের কথা বলে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বর্জনের দাবি তুলেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সকলের আগে তাঁদেরই কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে মহিমান্বিত করে বই লিখেছেন৷''

কিন্তু বাংলাদেশে, বিতর্ক রবীন্দ্রনাথকে পরিত্যাগ করলো না৷ বস্তুত রবীন্দ্রনাথ নিজে এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম সর্বদাই বিতর্ক পরিবেষ্টিত৷ এ বিতর্ক তাঁর জীবদ্দশাতেই শুরু, মৃত্যুর পরও বহমান৷

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই সাপ্তাহিক বিচিত্রা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন এক বিতর্কের অবতারণা করে – ‘‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের সংগ্রামী হাতিয়ার৷ আজ স্বাধীন বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ কি আগের মতনই আমাদের সংগ্রামী প্রেরণার উৎস হতে পারবেন? নাকি তিনি ক্রমশ হারিয়ে যাবেন সংগ্রামী চৈতন্য থেকে?''

বলাবাহুল্য এ বিতর্কেও দুটি পক্ষ অংশ নেয়৷ স্বস্তির কথা, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রবর্জনের প্রয়াস এই বিতর্কে একেবারেই ওঠেনি৷ তবে এই বিতর্ক থেকে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, রবীন্দ্রনাথকে যে নতুন মাত্রা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, তার অপরিহার্যতা দেখা দেয়৷

এ কাজে এগিয়ে এলেন প্রাবন্ধিক ও গবেষকগণ৷ রবীন্দ্রমানসের বিচিত্র দিক উম্মোচিত হলো তাঁদের কলমের মাধ্যমে৷ তাঁদের কাজের বিষয়পরিধি থেকেই তার প্রমাণ অনেকটা পাওয়া যাবে৷ উদাহরণ হিসেবে কিছু গ্রন্থের কথা এখানে উল্লেখ করা হলো – আহমেদ হুমায়ুনের লেখা – বিপরীত স্রোতে রবীন্দ্রনাথ; আহমদ রফিকের লেখা রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ; মুহম্মদ মজিরউদ্দীনের রবীন্দ্র ছোটগল্পে সমাজ ও স্বদেশচেতনা; সৈয়দ আকরম হোসেনের রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস: চেতনালোক ও শিল্পরূপ; সনজিদা খাতুনের রবীন্দ্র সংগীতের ভাবসম্পদ; গোলাম মুরশিদের রবীন্দ্র বিশ্বে পূর্ববঙ্গ: পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা; মঞ্জুশ্রী চৌধুরীর রবীন্দ্রনাথের রূপক সাংকেতিক নাটক; মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ; মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের রবীন্দ্রচেতনা; আবু জাফরের রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ইত্যাদি৷

গতশতকের ষাটের দশকের সাম্প্রদায়িক তর্কবিতর্ক এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের প্রগতিশীলতা নিয়ে বিতর্কের বাইরে গিয়ে এই সব গ্রন্থ স্বচ্ছ দৃষ্টিতে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথকে অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়৷ এ সুযোগ ছিল না পাকিস্তান আমলে৷ কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে নানান অবস্থানে দাঁড় করিয়ে নিত্যই দেখিয়ে দিচ্ছে- রবীন্দ্রনাথ আমাদের দূরের নন, কাছের মানুষ৷

পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলের মতোই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার দ্বারা আক্রান্ত হন৷ তাঁর রচিত জাতীয় সংগীতকেও আক্রমণ করা হয়৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপশক্তি পুনরায় হার মানে৷

বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার অন্য এক ধারা বহমান রেখেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও সংস্থা৷ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের কবিতার আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য, রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এই ধারা যথেষ্ট বেগবান৷ শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, এই ধারা লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশের সর্বত্র৷

এই সব সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বা সংস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ছায়ানট, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, উদীচী, রবিরাগ, সুরের ধারা, সংগীত ভবন ইত্যাদি৷ সম্প্রতি কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তির সি.ডি. তৈরিতে অর্থ সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে৷

বাংলা একাডেমী রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করা ছাড়াও রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান করে থাকে বিভিন্ন উপলক্ষে৷ রবীন্দ্রচর্চা প্রসারের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও কম নয়৷ বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য প্রতিটি স্থানে রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালিত হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়৷

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালিত হয়েছিল ভীতি আর সাম্প্রদায়িক বিতর্কের পরিবেশে৷ কিন্তু সার্ধশতবর্ষ পালিত হচ্ছে স্বাধীন দেশের মুক্ত পরিবেশে৷ এ অনুষ্ঠান চলবে গোটা বছর ধরে৷ সার্ধশতবার্ষিকের আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা জানার সুযোগ পাবো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা, ভাষাচিন্তা, শিক্ষাচিন্তা, সমাজচিন্তা, কৃষিচিন্তা ইত্যাদি বিষয়াবলি -যেগুলো জানার প্রয়োজন ও অভিপ্রায় আমাদের সহজে শেষ হবে না৷

প্রতিবেদন: ফরহাদ খান

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল ফারূক

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়