1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারণ কী?

বাংলাদেশে গত প্রায় তিন বছর ধরে জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং সাম্প্রতিককালে উপর্যুপরি বড় ধরণের হামলার প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে – বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারণ কী?

জঙ্গিবাদকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে হলে অবশ্যই এই প্রশ্নের একটি গ্রহণযোগ্য উত্তরের সন্ধান করা দরকার, কেননা, যে কোনো কাউন্টার-টেরোরিজম কৌশলের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে, প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং তার উৎসের দিকে তাকানো৷ এই প্রশ্নটি কেবল যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই তা সমপরিমাণে সত্য৷

একটি দেশে কেন জঙ্গিবাদ বা সহিংস উগ্রপন্থা বিস্তার লাভ করে, কেন এ ধরনের আদর্শ মানুষকে আকর্ষণ করে, কারা জঙ্গিবাদের প্রতি আকর্ষিত হয়– এসব প্রশ্নের উত্তর গত কয়েক দশক ধরেই খোঁজার চেষ্টা করছেন সমাজবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা৷ যদিও এ নিয়ে আলোচনার ধারা পুরনো, কিন্ত এই বিষয়ে গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে৷

২০১৪ সালে তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেটের' আবির্ভাবের পর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘কেন ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে তরুণ-তরুণীরা পাড়ি দিচ্ছে'- সেই প্রশ্ন৷ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারন ও প্রকৃতি বুঝতে হলে এ যাবতকালে এই বিষয়ে যে সব গবেষণা হয়েছে, সেখান থেকে আমরা ধারণা লাভ করতে পারি৷ এই ধারনা লাভ পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে৷ কিন্তু পাশাপাশি জঙ্গিবাদ, সহিংস উগ্রপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন তাঁদের একটা সতর্কবাণীও স্মরণে রাখতে হবে – সেটা হলো, প্রত্যেকটি সমাজ ও রাষ্ট্রের, ঐ দেশের রাজনীতির ও সমাজের সুনির্দিষ্ট দিকগুলো বিবেচনায় না নিয়ে জঙ্গিবাদকে বোঝা যাবে না৷

জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক আলোচনায় গত দশকের গোড়াতে একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন অনেক রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক এই বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফলের চেয়ে নিজেদের ‘পূর্ব ধারণা'কেই ‘সন্ত্রাসবাদের কারণ' বলে উপস্থাপন করেছিলেন; এটা এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে অনেকেই একটা সহজ উত্তর খুঁজছিলেন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশের অনেক রাজধানীতেই আমরা এই প্রবণতা দেখতে পেয়েছিলাম৷ এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় দিক এই যে, তাঁরা ধরে নিলেন যে দারিদ্র্যই হচ্ছে সহিংস চরমপন্থার কারণ এবং সুযোগবঞ্চিত মানুষেরা জঙ্গি সংগঠনের আদর্শের প্রতি আকর্ষিত হয়৷

তালেবান নেতৃত্ব, পাকিস্তানের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাংগঠনিক কাঠামো ও আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানি কয়েকটি মাদ্রাসার ভূমিকার ওপরে নির্ভর করে অনেকে মাদ্রাসাকেই ইসলামপন্থী সহিংস চরমপন্থার উৎস বলে প্রচার করতে থাকেন৷ এসব ধারণা শিগগিরই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে শুরু করে; কেননা, দেখা যায় যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের অধিকাংশ নেতা কিংবা আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষিত নয়৷

এই পরিস্থিতির পর যে সব গবেষণা আমরা দেখতে পাই তাতে জোর দেয়া হয়েছিল যে সন্ত্রাসবাদের কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল কারণ রয়েছে৷ যদি তাই হয় তবে পদ্ধতিগতভাবে বললে বলতে হবে যে ঐসব কারণ থাকলেই সন্ত্রাসী তৈরি হবে এবং জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করবে৷ কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, একই রকমের আর্থসামাজিক অবস্থা সবাইকে সন্ত্রাসী করে তুলছে না৷ তা ছাড়া যারা এই ধরণের সন্ত্রাসী কাজে যুক্ত হয়, তারা কেবল পরিস্থিতির চাপে যোগ দেয় না, ক্ষেত্রবিশেষে কিছুর আকর্ষণেও যুক্ত হয়৷ সেটা বিশেষ করে কোনো নেতার আকর্ষণ হতে পারে, হতে পারে যে এই ধরনের সংগঠন তাকে এমন কিছু দিতে পারে, যা তাকে সমাজের অন্য কোনো সংস্থা, পরিবার বা বন্ধু দিতে পারছে না৷ এমনকি অ্যাডভেঞ্চারিজমও কারণ হতে পারে৷ তা ছাড়া মানুষ স্বেচ্ছায় অনেক কিছু করে, কেবল পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে করে না৷ মানুষের নিজস্ব এই বিবেচনাগুলোকে ধর্তব্যের মধ্যে না নিলে কারো জঙ্গী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কী কী উপাদান রয়েছে তা বোঝায় অপূর্ণতা থাকতে বাধ্য৷

গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশে যেখানে জঙ্গিবাদ প্রসারিত হয়েছে, যেসব ব্যক্তি জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয়েছে, যেসব জঙ্গি সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছে, তাদের ওপর সম্পাদিত গবেষণাগুলোয় যেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো, জঙ্গিবাদ বিকাশে কোনো একটি একক কারণ নেই৷ এই ধরণের একক কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা ভুল উপসংহারে উপনীত হতে পারি৷ আমরা দেখতে পাই যে, জঙ্গি হয়ে ওঠা এবং জঙ্গিবাদের প্রসারের ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয় চালকের ভূমিকা পালন করে৷ অর্থাৎ এই বিষয়গুলো ব্যক্তিকে সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দেয়, সমাজে জঙ্গিবাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে এবং সন্ত্রাসী সংগঠন তৈরি করে৷

এই ড্রাইভার বা চালিকাগুলোকে ভাগ করা হয়েছে চারটি ভাগে: অভ্যন্তরীণ সামাজিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈশ্বিক৷ অভ্যন্তরীণ চালকের মধ্যে রয়েছে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা বা প্রান্তিকতা অনুভব করা, সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হওয়া, হতাশার বোধ, অন্যদের তুলনায় বঞ্চিত অনুভব করা৷ রাজনৈতিক চালকগুলোর মধ্যে আছে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, সরকারের কঠোর নিপীড়ন ও সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা, স্থানীয়ভাবে অব্যাহত সংঘাত, সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এলাকা তৈরি হওয়া৷ সাংস্কৃতিক চালকের মধ্যে আছে এই ধারণা বিরাজ করা বা তৈরি হওয়া যে ইসলাম আক্রমণের বা বিপদের মুখোমুখি, নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হুমকির মুখে এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজের ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ বা সমাজে অন্যদের ওপরে নিজের ইসলামি সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া৷ বৈশ্বিক চালকের মধ্যে আছে নিজেদের ‘ভিকটিম' বলে মনে করা৷ একার্থে এটি সাংস্কৃতিক চালকের সঙ্গে যুক্ত৷

ইসলাম বিপদের মুখে—এই ধারণার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় যে মুসলিম জনগোষ্ঠী অন্যত্র অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার, যদি এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে বিশ্বব্যবস্থা মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য অন্যায্য, তাহলে তা এক শক্তিশালী চালকের ভূমিকা পালন করতে পারে৷

এ ছাড়া বৈশ্বিক চালকের আরেকটি হচ্ছে ‘কাছের শত্রু-দূরের শত্রু'র ধারণা৷ যখন অভ্যন্তরীণভাবে দেশের ভেতরে নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়, যখন ‘কাছের শত্রু'কে পরাজিত করতে সক্ষম হয় না, তখন দেশের বাইরে ‘দূরের শত্রু'র বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালানোর আগ্রহ তৈরি হয়৷ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শত্রু' বলে বিবেচনা করে, তার কারণগুলোর মধ্যে নিপীড়ক সরকারগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন অন্যতম বলেই তাদের দলিলপত্র, প্রচারণা ও সদস্য সংগ্রহের প্রচারণায় স্পষ্ট৷

এই ‘ড্রাইভার' বা চালকগুলো কি সব সময়, একই সঙ্গে, একই মাত্রায় কাজ করে বা করবে? অবশ্যই নয়৷ এই চালকগুলো একক ও সম্মিলিতভাবে কাজ করে; তবে সব জায়গায় সবগুলো না থাকলেও তার কার্যকারিতা অক্ষত থাকে বলেই দেখা গেছে৷ সহজ করে বললে, আমরা বলতে পারি যে, বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিই জঙ্গিবাদ তৈরি ও বিকাশের সূচনা করে, তাকে শক্তিশালী করে৷ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই৷

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে যে এর সূচনা ১৯৯০-র মাঝামাঝি সময়ে৷ সর্বসাম্প্রতিক কালে ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের যোগাযোগ কিংবা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের বাংলাদেশে উপস্থিতি, যেভাবেই আপনি পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেন না কেন, তার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ কার্যত পঞ্চম প্রজন্ম বা জেনারেশনে উপস্থিত হয়েছে৷ প্রথম প্রজন্ম হচ্ছে যারা আফগানিস্তানে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশে হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলাম বা হুজি প্রতিষ্ঠা করে; তাঁদেরকে আমরা ১৯৭৯-১৯৯২ পর্যায়ে দেখতে পাই৷

দ্বিতীয় প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে ১৯৯৬ সালে, যখন ‘কিতাল-ফি-সাবিলিল্লাহ' বলে সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়৷ এটিই ১৯৯৮ সালে এসে জামায়াত-উল-মুজাহিদিন বা জেএমবি'তে রূপান্তরিত হয়, যার সঙ্গে হুজি'র যোগাযোগ ছিল ওতপ্রোত৷ তৃতীয় প্রজন্ম হচ্ছে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হিযবুত-তাহরির৷ এদের সূচনা এবং বিকাশ বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে৷ চতুর্থ প্রজন্মের জন্ম হয় জামাতুল মুসলেমিন নামে ২০০৭ সালে, পরে যা আনসারউল্লাহ বাংলা টিম নামে কার্যক্রম চালায়৷ এরা অনুপ্রাণিত হয়েছে আনওয়ার আলওয়াকি'র দ্বারা এবং এরাই এখন আনসার-আল-ইসলাম বলে আল কায়েদার প্রতিনিধিত্বের দাবি করে৷ পঞ্চম প্রজন্ম হচ্ছে যারা ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উদ্ভবের পরে ইসলামিক স্টেটের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়, কেউ কেউ সিরিয়াতে যুদ্ধ করতে যায়৷

এই ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আদর্শিকভাবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের যোগাযোগ থেকেছে সব সময়ই৷ ফলে অন্যত্র জঙ্গিদের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ‘ড্রাইভার' যেমন একটি উপাদান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব আছে৷ কিন্তু আমরা জানি যে, বৈশ্বিক ড্রাইভারই শক্তি সঞ্চয়ের জন্যে যথেষ্ট নয়৷ তবে এও মনে রাখতে হবে যে, গত কয়েক মাসে আইএস যতই তাঁদের ঘাঁটি বা তাঁদের নিয়ন্ত্রনে থাকা জায়গা হারাচ্ছে, ততই চেষ্টা করছে অন্যান্য দেশে, যেখানেই তাঁদের সাংগঠনিক বা আদর্শিক যোগাযোগ আছে, সেখানে শক্তি প্রদর্শনের জন্যে৷ প্যারিস, ব্রাসেলস, ইস্তানবুল, নিস তার প্রমাণ৷ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোকেও সেই আলোকেই বিবেচনা করতে হবে৷

আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, কেবল বৈশ্বিক ড্রাইভার বা এজেন্ডাই কোনো দেশে জঙ্গিবাদ বিকাশের যথেষ্ট কারণ নয়, যদিও তা একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করে৷ তার জন্যে দরকার হয় অভ্যন্তরীন অনুকূল পরিবেশ৷ অভ্যন্তরীণ অনুকূল পরিবেশের অর্থ এই নয় যে, সব দেশে একই রকম পরিস্থিতি থাকতে হবে৷ ইউরোপে আমরা যে জঙ্গি তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি ‘তার কারণ সেই সমাজের ভেতরেই আছে' বলার অর্থ এই নয় যে, তা ফিলিপাইন বা বাংলাদেশের মতো একই রকম হতে হবে৷

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃশ্যপটে ফিলিপাইনের সঙ্গে মিল নেই, কিন্তু একই সময় আমরা দুই দেশেই জঙ্গিবাদের প্রসার দেখতে পাই৷ তা হলে ইউরোপে আমরা কেন জঙ্গিবাদের বিস্তার দেখতে পাই? ইউরোপীয় সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো যদিও সকলের অংশগ্রহণের পথ খোলা রেখেছে, কিন্ত সেখানে অভিবাসী, মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমনকি দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রেও, ক্ষোভ তৈরির কারণ রয়েছে৷ যেমন সমাজে বিরাজমান বৈষম্য একটি উপাদান, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন আইনে সমতার অভাব একটি উপাদান, এমনকি রাজনীতিতে তাঁদের সীমিত অংশগ্রহণ একটি উপাদান৷ সেটা ফ্রান্সের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে৷ পশ্চিমা বিশ্বে জঙ্গিবাদের বিস্তারের উপাদান হিসেবে ঐ সব দেশের পররাষ্ট্রনীতি একটা বড় ভূমিকা পালন করছে৷ গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের ভূমিকা যে এর একটা অন্যতম উপাদান একথা অস্বীকার করার উপায় নেই৷

একই সঙ্গে গত এক দশকে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থি ইসলাম-বিরোধী দলগুলোর উত্থান এবং তাঁদের কথাবার্তা সমাজে বিরাজমান বিভক্তিকে এমন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সমাজের একাংশের মানুষ মনেই করেছে যে তাঁরা এই সমাজে অধিকার বঞ্চিত৷ তাঁদের কাছেই আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আবেদন রাখতে পারছে৷ ফলে আমাদের বুঝতে হবে যে, উপাদানগুলো কী৷ আমরা যখন একটি দেশে জঙ্গিবাদের বিকাশের কারণ দেখবো, তখন দেখতে হবে উপাদানগতভাবে সেগুলো কী৷ আপাতদৃষ্টে রাজনীতি ও সমাজের মিল থাকল কি না, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানের দিক৷ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা বা প্রান্তিকতা অনুভব করা, সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হওয়া বা তার বোধ, হতাশার বোধ, অন্যদের তুলনায় বঞ্চিত অনুভব করা, রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, সরকারের কঠোর নিপীড়ন ও সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন এগুলো যখন উপস্থিত থাকবে তখনই জঙ্গিবাদ বিকাশের ক্ষেত্রে তা অনুকূল বিষয় হিসেবে কাজ করবে৷ সেটা ইউরোপেও করবে, বাংলাদেশেও করবে, ফিলিপাইনেও করবে৷

Ali Riaz

আলী রীয়াজ, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

বাংলাদেশে এইগুলোর প্রকাশ হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সীমিত হওয়া, ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা, সরকারের অতিরিক্ত মাত্রায় শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা৷ এগুলোই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে৷ মনে রাখতে হবে যে ‘কারণ' এবং ‘অনুকূল পরিবেশের' মধ্যে পার্থক্য রয়েছে৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও যখন উগ্রপন্থি বক্তব্য দেয়া হয়, তখন সেটা একটা বড় ধরণের উপাদান হিসেবে কাজ করে৷ এর সঙ্গে যখন রাজনীতিতে সহিংসতা যুক্ত হয় – যা আমরা দেখতে পেয়েছি ২০১৩ সালে ও তারপরে, যখন সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়ার প্রবণতাকে উস্কে দেয়া হয়, তখন সহিংস উগ্রপন্থিরা তার ব্যবহারে পিছপা হয়না৷ যখন অভ্যন্তরীণ অনুকূল পরিবেশ এবং বৈশ্বিক পরিবেশ দুইয়ের সংযোগ ঘটে তখন তা হয়ে ওঠে ভয়াবহ৷

এই আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই বিষয়ে জোর দেয়া যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারণ অনুসন্ধানে আমাদের কেবল ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে হবে না৷ এর জন্যে বিভিন্ন ধরণের প্রবণতা, বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট এবং সমাজ ও রাজনীতিতে বিরাজমান বিভিন্ন ধরণের কারণ এবং অনুকূল পরিবেশের প্রতিও মনোযোগ দেয়া দরকার৷ জঙ্গিবাদ কেন সেটা বুঝতে চাইলে এসব বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়