1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

বাংলাদেশের স্টল নেই, তবে ‘বাংলিশ' বই আছে

ফ্রাংকফুর্ট রেল স্টেশনে পা রেখেই বুঝলাম, আজ সব পথ গেছে বইমেলার দিকে৷ এদিকে-ওদিকে রংবেরঙের পোশাক পরা কিশোর-কিশোরীদের কিচির-মিচির৷ ডানে-বায়ে, এমনকি পায়ের নীচেও বইমেলার বিজ্ঞাপন৷ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা বলে কথা!

শুধু আকারে-আঙ্গিকে বড় মেলা বলেই যে বইমেলা শুরু হলে ফ্রাংকফুর্টে উৎসবের রং লাগে তা ভাবা ঠিক নয়৷ লোকে যতই ‘যান্ত্রিক' বলুক না কেন, আসলে কিন্তু জার্মানরা খুব আমুদে৷ তাই তাঁদের কাছে সপ্তাহান্ত মানেই ছোটখাটো উৎসব৷ এমনিতে প্রতি শনিবার জার্মানদের চোখে-মুখে, পোশাক-আষাকে আনন্দের ঝিলিক বিকেল গড়ালে বেশি লাগলেও এই শনিবার ফ্রাংকফুর্ট সে নিয়ম ভুলেছিল৷ সকালে ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছাড়াতে-না-ছাড়াতেই স্টেশনে-ট্রামে-রাস্তায় গিজগিজে ভিড়৷ বাচ্চাগুলোর দিক থেকে তো চোখ ফেরানোই দায়৷ কেউ সেজেছে পশু-পাখি, কেউ বা জণপ্রিয় কোনো কার্টুন চরিত্র৷ কল্পনার মিঠেপানিতে এভাবে একটু ডুব না দিলে খুদে জার্মানদের কোনো আনন্দই যেন জমে না৷

সপ্তাহের শেষ দুটো দিন ফ্রাংকফুর্টের স্থানীয় বা দেশি-বিদেশি অতিথি – সবার জন্যই ছিল ‘স্পেশ্যাল'৷ জার্মানদের পাঠপ্রীতি বরাবরই নজর কাড়ে৷ জার্মানির সব শহরের ট্রামে-বাসে, স্টেশনে, পার্কেই বই বা ই-বুক হাতে কিছু মুখ সবসময় চোখে পড়ে৷ এমন মানুষদের এক শহরে ‘বুখমেসে', অর্থাৎ বইমেলা শুরু হয়ে শেষও হতে চলেছে৷ মনে ধিতাং-ধিতাং বোল তো উঠবেই!

Besucher auf der Frankfurter Buchmesse

শুরুর দিনের ভিড়

৮ থেকে ১২ অক্টোবর – এই পাঁচদিনের বইমেলার শেষ দুটো দিন ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত৷ তার আগে শুক্রবারটা ছিল আবার ‘কিডস ফ্রাইডে', অর্থাৎ শিশুদের জন্য বিশেষ দিন৷ শনিবারও অবশ্য তাদের কদর কমেনি৷ সকাল থেকেই শুরু ট্রেনে-ট্রামে-বাসে, নিজের গাড়ি কিংবা ভাড়া করা ট্যাক্সি, নয়ত সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে মেলার দিকে ছোটা৷ চার-পাঁচজনের এমন একটা দলও দেখিনি যেখানে একজন শিশু বা কিশোর নেই৷

হাউপ্টবানহোফ, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে মেলায় কীভাবে যাব? এই তথ্যটুকু পেতে কোনো কষ্টই হলো না৷ পাঁচটা দিন রেল স্টেশনের তথ্য কেন্দ্রের কাজই তো সবাইকে পঁই পঁই করে বলে তা বুঝিয়ে দেয়া৷ একটা নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম থেকে সারাদিন যতগুলো ট্রাম ছাড়বে সবই যাবে বইমেলায়৷ বিশেষ দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এমন সুপরিকল্পিতভাবে জনসেবায় নিয়োজিত করা! একুশে বইমেলার অভিজ্ঞতা মনে পড়ল৷ হায় রে, বাংলাদেশে কবে যে এমন হবে!

কোনো কোনো বার ‘নামকা ওয়াস্তে' হলেও বাংলাদেশের স্টল থাকে৷ এবার তা-ও নেই৷ তাই মেলায় পৌঁছেই শুরু হলো ‘প্রেসবক্স' খোঁজা৷ দিকনির্দেশনা দেখে দেখে হাজির হলাম৷ ‘প্রেস কিট'-এর সঙ্গে পাওয়া কাগজপত্রে চোখ বুলিয়ে বোঝা গেল, আয়োজকরা সাংবাদিকদের পেশাদারি প্রয়োজন এবং কৌতূহল মেটানোর সব ব্যবস্থাই মোটামুটি করে রেখেছেন৷ বইমেলা মানেই বই, লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের উৎসব৷ এমন উৎসবকে পরিপূর্ণতায় রূপ দেয়ার আন্তরিক প্রয়াসের দৃষ্টান্ত হতে পারে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা৷

Nobelpreis 2014 Literatur Patrick Modiano

মূল প্রকাশকের স্টলে সাহিত্যে নোবেল জয়ী ফরাসি লেখক প্যাট্রিক মোদিয়ানোর বইয়ের ছবি

কী নেই এ মেলায়? নেই যে কোনো বই নগদে কেনার সুযোগ৷ বিক্রির বই হাতে গোনা এবং বাছাই করা৷ তা-ও সব স্টলে নয়৷ তুর্কি ভাষার বইয়ের স্টলে নাসিরউদ্দীন হোজ্জাকে দেখে চমকে গেলাম৷ মুশকিল হলো, তুর্কি আর জার্মান ছাড়া আর কোনো ভাষার সংস্করণ নেই৷ বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে স্টলের এক তরুণ খুশি হয়ে বলে উঠেছিল, ‘‘আমাদের কাছে একটা বাংলিশ বই আছে৷'' বাংলাকে ‘বাংলিশ' বলতে শুনে হাসি পেলেও হাসি চেপে বইটা দেখতে চাইলাম৷ দুর্ভাগ্য আমাদের, অনেক চেষ্টা করেও সুদর্শন তুর্কি তরুণ বইটি আর খুঁজে পেল না৷

বাংলাদেশের স্টল বা তুর্কিদের স্টলে বাংলা বই না দেখার মতো বিষয় ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় একটু ঘুরলেই ভুলে যাওয়া যায়৷ এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যেতেই অনেক ঝক্কি ৷ লিফ্ট, এস্ক্যালেটর বা চলন্ত সিঁড়ি সবই আছে, তবুও হাঁটতে হাঁটতে একসময় পা আর চলতে চায় না৷ বসে জিরিয়ে নেয়ার মতো জায়গা বা আয়োজনের অভাব নেই৷ তা ছাড়া আরাম করে বসে বই পড়া যায় এমন স্টলও তো আছে অনেক৷ পড়তে পড়তে পিঠে ব্যথা শুরু হয়েছে? নো চিন্তা৷ আছে ফিজিওথেরাপিস্ট৷ একজন-দু'জন নয়, এক ঝাঁক ফিজিও থেরাপিস্ট ছিল এবারের মেলায়৷ তাঁদের একজনকে ১০ ইউরো দিলে ১০ মিনিটেই ব্যথা উধাও৷ ফিজিওথেরাপিস্টের ‘মাসাজ' বলে কথা!

এক প্রকৌশলীর সঙ্গেও দেখা হয়েছে৷ জার্মান এক প্রকৌশলী৷ এসেছিলেন নিজের তৈরি দুটো প্রডাক্ট নিয়ে৷ টেলিফোন বুথের মতো একটা ঘর আর এক ধরনের দুটো চেয়ার৷ ঘরটায় ঢুকে বই পড়লে বা টেলিফোনে কথা বললে বাইরের কোনো আওয়াজ ভেতরে আসবে না, ভেতরের আওয়াজও বাইরে যাবে না৷ চেয়ার দুটো আরো অদ্ভুত৷ যে বসবে তাঁর মাথার ওপরে শুধু একটু ছা্উনি থাকবে৷ তাতেই চেয়ারটা ‘সাউন্ড প্রুফ'৷ গান গাইতে গাইতে, না হয় শুনতে শুনতে বই পড়ুন, আপনার গান বাইরের কেউ শুনবে না, আপনার কানেও বাইরের কোনো কোলাহল যাবে না৷ সিমেন্সসহ জার্মানির বেশ কিছু কম্পানি নাকি এই প্রডাক্ট দুটো কিনছে৷

DW Bengali Redaktion

আশীষ চক্রবর্ত্তী, এই ব্লগটির লেখক

ভেবে রেখেছিলাম, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলায় গিয়ে বাংলাদেশের বইমেলার কথা যতটা সম্ভব ভুলে থাকবো৷ দেশে এত নামি-দামি প্রকাশক, অথচ কারো একটা স্টলও নেই, বাংলাদেশের একটা বইও আসেনি এ মেলায় – এ সব জানার পর একুশে মেলার কথা না ভাবাই ভালো মনে হলো৷ কিন্তু ফেরার সময় বাংলাদেশের বইমেলার কথা ভাবতেই হলো৷ যত বড়ই হোক, দেখলাম, ফ্রাংকফুর্টের মেলাও এক জায়গায় অন্তত একুশে বইমেলার মতো৷ বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে বহুবার দেখেছি, ‘জাঁদরেল' প্রকাশনীগুলোর স্টলের সামনে শত লোকের ভিড় জমেছে, অথচ পাশের কিছু স্টলে কাকপক্ষীটিও নেই৷ ফ্রাংকফুর্টে শিশুদের বইগুলো ঘিরে ছিল অবাক করা গাদাগাদি৷ আবার ঠিক পাশের ভবনে এমন স্টলও দেখেছি, যেগুলোর দিকে ভুল করেই বোধহয় কেউ কেউ ফিরে তাকায়৷

এক স্টলে এক বৃদ্ধাকে দেখে মনে হলো, তাঁর কাছে কেউ আসবে এ আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছেন৷ এমনি এমনি কাহাঁতক বসে থাকা যায়! এক সময় ব্যাগ থেকে টুক করে কুশিকাঁটা বের করে কী যেন বুনতে শুরু করলেন৷ একুশে বইমেলায় এমন স্টলগুলোতে অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাঠকপ্রিয় কিছু বইয়ের নীলক্ষেত সংস্করণ থাকে৷ সেই সুবাদে কয়েকজন ক্রেতাও জোটে৷ ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার কোনো স্টলে এমন কিছু ভাবাও ‘পাপ'৷ তাই এখানে ‘নেই কাজ তো খই ভাজ', থুড়ি, ‘নেই কাজ তো কুশিকাঁটায় মন দেয়াই শ্রেয়'!

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়