1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

‘বাংলাদেশের মতোই রবীন্দ্রনাথের কবিত্ব নদীমাতৃক’

কারো কারো মতে রবীন্দ্রনাথ মূলত ‘বর্ষা এবং নদীর কবি’৷ তাঁর অধিকাংশ কবিতা, গান ও ছোট গল্পে নদীর কথা ছাড়াও উপমা ও চিত্রকল্প হিসেবে এসেছে নদীসম্পর্কিত বিষয়াবলি৷ যেমন খেয়া, ঘাট, মাঝি, শেষপারানির কড়ি, তরী, তরঙ্গ, তরনী আর জল৷

default

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’এর হাতে লেখা একটি চিঠি

নদীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন জলের রানী৷ গান লিখেছেন ‘ওগো জলের রানী'৷ ১৮৯১ থেকে ১৯০১, বয়সের ত্রিশ থেকে চল্লিশ - এই দশটি বছর প্রায় একনাগাড়ে রবীন্দ্রনাথ থেকেছেন জলময় মধ্যবঙ্গে পিতার নির্দেশে জমিদারি দেখাশোনার কাজে৷ অর্থাৎ শিলাইদহ, সাজাদপুর (শাহজাদপুর) আর পতিসরে৷ এ সময়টা কেটেছে তাঁর নদীতে, খালেবিলে৷ আজ শিলাইদহ, কাল সাজাদপুর, পরশু পতিসর - এমনি করে৷

এই তিন জায়গায় আবাস হিসেবে ছিল তাঁর বিশাল বিশাল কুঠিবাড়ি৷ তবে যতোদিন তিনি কুঠিবাড়িতে থেকেছেন তার চেয়ে সম্ভবত বেশী থেকেছেন নদীতে ভাসন্ত তাঁর প্রিয় বজরা বা বোট ‘পদ্মা'য়৷ ‘চিত্রা' নামে তাঁর আরেকটি বোটও ছিল৷ সেটি আকারে ছোট৷ রবীন্দ্রনাথ এই বোটটির উল্লেখ করেননি৷ ‘চিত্রা'ও একটি নদীর নাম৷

জমিদারির এই এলাকার মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো নদীপথ৷ এই সূত্রেই নদীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম ঘনিষ্ঠ পরিচয়৷ এই অঞ্চলের নদী ও মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও চিন্তাচেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত ও আচ্ছন্ন করেছিল৷

শিলাইদহে বাস এবং সাজাদপুর ও পতিসরে যাতায়াতের সময়গুলিতে রচিত হয় তাঁর সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কণিকা, ক্ষণিকা, কল্পনা, কথা, নৈবেদ্য, চিত্রাঙ্গদা, মালিনী, গান্ধারীর আবেদন, বিদায় অভিশাপ, কর্ণ-কুন্তী সংবাদ এবং এছাড়াও গল্পগুচ্ছের অনেকগুলি গল্প এবং ছিন্নপত্রের পত্রগুচ্ছ৷ এই সব রচনার মধ্যে কোনো না কোনো ভাবে চলে এসেছে নদী প্রসঙ্গ৷ ছিন্নপত্রতো প্রায় নদীরই আখ্যান৷

রবীন্দ্রনাথের রচনায়, চিঠিপত্রে যে সব নদী রয়েছে সেগুলো হলো পদ্মা, যমুনা, গোরাই (গড়াই), ইছামতী, বড়ল (বড়াল), নাগর, বলেশ্বরী, আত্রাই, হুড়োসাগর ইত্যাদি৷ শিলাইদহ থেকে সাজাদপুর ও পতিসরের যাত্রাপথের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম পদ্মা থেকে কোলের ইছামতীতে, ইছামতী থেকে বড়লে, হুড়ো সাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরে'৷

সাজাদপুর ছিল করতোয়া নদীর এক খালের পাড়ে৷ রবীন্দ্রনাথ এই খালের নাম বলেননি৷ তাঁর জমিদারির আর এক ছোট্ট মহাল ছিল কুষ্টিয়া জেলার পাণ্টিতে৷ যেতে হতো গোরাই বা গড়াই নদী থেকে ডাকুয়া খাল হয়ে৷ শিলাইদহ যেতে হতো কুষ্টিয়া স্টেশনে নেমে গড়াই নদীতে বজরা বা নৌকায়৷ শিলাইদহের উত্তরে পদ্মা, পশ্চিম-দক্ষিণে গড়াই৷ পতিসরের নীচে ছিলো নাগর নদী৷

রবীন্দ্রনাথ অবশ্য তাঁর রচনায় সব নদীর নাম উল্লেখ করেননি৷ তাঁর রচনায় রয়েছে নানান অনামা নদী৷ এইসব নদীকে তিনি নানাভাবে দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন৷ কিছু আছে নদীর নিছক চিত্র৷ যেমন, সহজ পাঠের ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে' অথবা, ক্ষণিকা কাব্যের ‘কূলে' কবিতায় ‘আমাদের এই নদীর কূলে/নাই কো স্নানের ঘাট/ধু ধু করে মাঠ'৷ অনামা এই সব নদী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিশে গেছে জীবনের টুকরো টুকরো অনুষঙ্গের মধ্যে তাদের বিচিত্র গতিধারা নিয়ে৷ নদী সেখানে কেবল নদী মাত্র নয়৷ নদী সেখানে জীবনের উপমা, চিত্তের প্রতীক৷ তাঁর নাতিদীর্ঘ ‘নদী' কাব্যে নদী আর মানুষের ইতিহাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে৷

রবীন্দ্রনাথের চিত্তকে অধিকার করেছিলো পদ্মা নদী৷ পদ্মার নদীর বিচিত্র চরিত্র ও বিচিত্র প্রবাহ তাঁর রচনায় বিভিন্নভাবে এসেছে৷ স্বীকার করেছেন ‘বাস্তবিক, পদ্মা নদীকে আমি ভালবাসি;...আমি যখন শিলাইদহ বোটে থাকি, তখন পদ্মা আমার কাছে স্বতন্ত্র মানুষের মতো'৷ ‘পদ্মা' কবিতায় লিখেছেন, ‘হে পদ্মা আমার/তোমায় আমায় দেখা শত শত বার'৷

ইছামতীর প্রতিও তাঁর খানিকটা পক্ষপাত ছিল৷ তাঁর অনেক কবিতায় ইছামতীর প্রসঙ্গে এসেছে৷ চৈতালি কাব্যের ‘ইছামতী নদী'তে লিখেছেন, ‘অয়ি তন্বী ইছামতী, তব তীরে তীরে/শান্তি চিরকাল থাক কুটিরে কুটিরে/শস্যে পূর্ণ হোক তব তটদেশ'৷

জমিদারি শেষ হয়ে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে বাস শুরু করেন৷ এতোকাল তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশের নদী৷ বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও নদীর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হলো না৷ এবার তাঁর জীবনে এলো পশ্চিমবঙ্গের নদী খোয়াই, কোপাই, ময়ুরাক্ষী, কালিন্দী, রূপনারায়ণ প্রভৃতি৷

কবিতা লিখলেন খোয়াইকে নিয়ে৷ ময়ুরাক্ষী সম্পর্কে লিখলেন, ‘ময়ুরাক্ষী দেখিও নি কোনো দিন'৷ কোপাই নদী নিয়ে কবিতায় স্মরণ করলেন তাঁর ফেলে আসা পদ্মা নদীকে, ‘পদ্মা কোথায় চলেছে দূর আকাশের তলায়/মনে মনে দেখি তাকে'৷ এই কবিতায় জানিয়ে দিলেন ‘এখানে আমার প্রতিবেশিনী কোপাই নদী'৷ ‘প্রান্তিক'-এ লিখলেন, ‘দেখিলাম অবসন্ন চেতনার গোধূলি বেলায়/ দেহ মোর ভেসে যায় কালো কালিন্দীর স্রোত বাহি'৷ মৃত্যুর দেড় মাস আগে লিখলেন, ‘রূপনারানের কূলে/জেগে উঠিলাম/জানিলাম এ জগৎ/স্বপ্ন নয়'৷

সরাসরি যোগাযোগ ছিলো না তাঁর এমন নদীর নামও পাওয়া যায় দু'একটি কবিতায়৷ যেমন, ‘ছল ছল করে গ্রাম, চুর্ণি নদী তীরে'৷ আরেকটি নদী ধলেশ্বরী এসেছে পুনশ্চ কাব্যের ‘বাঁশি'তে, ‘ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসিদের গ্রাম'৷ বাংলাদেশের বাইরের একটি নদীও আসে বলাকা কাব্যের ‘বলাকা' কবিতায়, ‘সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোত খানি বাঁকা '৷

রবীন্দ্রনাথ নদীকে দেখেছিলেন নদীর তীরের মানুষের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে৷ এই দেখার মধ্য দিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন মাটির কাছাকাছি৷

প্রতিবেদন: ফরহাদ খান

সম্পাদনা: দেবারতি গুহ

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়