1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করলে সংকট কেটে যাবে'

বাংলাদেশের এক সংকটকালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে৷ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং রাজনীতিই চলমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন৷

বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের মতো যাঁরা তাঁর অনুসারী নন তাঁদেরও অনেকেই মনে করেন, তিনি ছিলেন এক বড় মাপের নেতা৷ তাঁর মধ্যে ছিল ‘স্টেটম্যানশিপ', তাই যে কোনো সংকটে যে কোনো পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে চাইতেন তিনি৷ তবে সব আলোচনায় তিনি ঊর্ধে তুলে ধরতেন দেশের মানুষের স্বার্থ৷ তাঁর চেতনাই ছিল অসাম্প্রদায়িতা ও গণতন্ত্র৷

বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ এই সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক বিষয়৷ একে শুধু দুই দলের বিরোধিতার একটি সংকট হিসেবে দেখছেন না অনেকেই৷ শুধু ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন নিয়ে এই সংকট তা মনে করার কারণ নেই৷ এর সঙ্গে আছে যুদ্ধাপরাধের বিচার৷ স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ৷ গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতাসহ আরো কিছু ইস্যু৷ আছে সংবিধান স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া দেশের রাজনীতির চরিত্র এবং আমাদের ভবিষ্যৎ যাত্রার বিষয়টিও৷

এর আগের (৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের) মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে৷ এই বিচার প্রধানত জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার মুখে পড়ে৷ আর তাদের প্রধান মিত্র বিএনপি এক ‘অদ্ভূত' অবস্থান নেয়৷ তারা একদিকে বিচারের কথা বলে, আবার ট্রাইবুন্যাল ভেঙে দেয়ারও কথা বলে৷ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রতিহত করতেই বাংলাদেশে ব্যাপক সন্ত্রাস হয়৷ জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর বাংলাদেশে নজীরবিহীন সহিংসতা হয়েছে৷ সেই সহিংসতা অন্য রূপে এখনো অব্যাহত৷

Sheik Mujibur Rahman

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির ‘একতরফা' নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আরো একদফা ব্যাপক সহিংসতা হয়৷ তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি৷ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি ও তার মিত্ররা এ বছরের ৬ই জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ আর হরতাল পালন করে আসছে৷ মঙ্গলবার সেই কর্মসূচির ৭০ তম দিনে আবার হরতালের কর্মসূচি এসেছে৷ গত দু’মাসের অবরোধ হরতালে এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন৷

গত শুক্রবার বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সংকট নিরসনে সংলাপের আয়োজন করার দাবি জনিয়েছেন৷ তবে তিনি হরতাল- অবরোধ প্রত্যাহার করেননি৷ জবাবে সরকার বলেছে, যারা পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ হত্যা করে, তাদের সঙ্গে সংলাপ হবে না৷

বাংলাদেশের সংবিধান এ পর্যন্ত ১৬ বার সংশোধন করা হয়েছে৷ এ সব সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূল চরিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে৷ সংবিধানের মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও পরে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে ইসলামকে৷ সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের জন্য তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে আদালতের নির্দেশে৷ নব্বই-এ সামরিক শাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক যাত্রার যে নতুন পথ শুরু হয়েছিল, তা একবার হোঁচট খায় বিএনপির শাসনামলে ১৫ই ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে৷ তবে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আনলেও এখন তারা এর বিরুদ্ধে৷

বঙ্গবন্ধু বাকশাল এনেছিলেন৷ একদলীয় ব্যবস্থা বলে এর সমালোচনা আছে৷ তবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রথমে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে৷ বঙ্গবন্ধু একটি উদারগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবাইকে নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন৷ সে কারণেই ফৌজদারি মামলা নেই এমন যুদ্ধাপরাধী সাধারণ বন্দিদের ক্ষমা করেছিলেন৷ কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদেরও ছেড়ে দেন৷ যুদ্ধাপরাধের হোতা গোলাম আজমকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ করে দেন৷ যুদ্ধারাধে ব্যাপকভাবে জড়িত দল জামায়াতকে নিয়ে আসেন রাজনীতিতে৷ এরশাদ পরে ষোলকলা পূর্ন করে দেন৷

Sheikh Mujibur Rahman Flash-Galerie

৭ মার্চ ১৯৭১, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ

এ সব ঘটনা মিলিয়ে দেখলে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট বোঝা সহজ হবে৷ এভাবে সংকট কতটা গভীরে তা-ও উপলব্ধি করা যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা৷ আর বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই সমাধান খুঁজতে বললেন তাঁরা৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সফিউল আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু কখনোই আলোচনাকে ‘না' বলেননি৷ এমনকি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও শেষ মুহুর্তে তিনি ছিলেন আলোচনার টেবিলে৷ কিন্তু তিনি কখনোই চেতনাকে জলাঞ্জলি দেননি৷ কথা বলেছেন আর তার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশ্বাস, চেতনা এবং রাজনীতিকে পোক্ত করেছেন৷''

তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান সংকট নিরসনও হতে পারে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে৷ পথটা হলো, সব দলকে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনাকে সমুন্নত করার প্রশ্নে একমত হতে হবে৷ এই চেতনা ধারণ করতে হবে৷ আর আলোচনা করতে হবে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়৷''

তাঁর মতে, ‘‘বাংলাদেশে এখন যে সংকট চলছে সেটা এককভাবে ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসা কোনো সংকট নয়৷ আসলে এটা আরো অনেক বিষয়ের পুঞ্জিভূত রূপ৷ সংকট অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্প্রদায়িতা৷ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এই চেতনাহীনতার৷ একপক্ষ চাইছে যে কোনো উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিদায় করতে৷ যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করতে৷ আর আরেক দল চাইছে সেটা প্রতিরোধ করতে ক্ষমতা ধরে রাখতে৷ আর তাতে সৃষ্টি হয়েছে অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি৷''

Sheikh Mujibur Rahman Flash-Galerie

ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বঙ্গুবন্ধু...

তিনি বলেন, ‘‘এর সমাধান আলোচনার মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসবে৷ তবে তা শুধু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করে সম্ভব নয়৷ আগে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপারে ঐক্যমত৷ বঙ্গবন্ধুর পথে সমাধান চাইতে হলে আগে তাঁর আদর্শটাকে ধারণ করতে হবে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু সবসময় বিরুদ্ধ মতকে গুরুত্ব দিতেন৷ কিন্তু আমরা যদি বিরুদ্ধমতকে সম্মান দেখানো বলতে চেতনার বিনাশ বুঝি তাহলে বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে ভুল করব৷''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের দিকে এগিয়ে গেছেন, সেটাকে সব দল যদি কেন্দ্রে রেখে সংকটের সমাধান খোঁজে, তাহলে সামাধান পওয়া খুব কঠিন হবে না৷ এটা যে এককভাবে আওয়ামী লীগের কাজ, তা নয়, এটা সবদলেরই কাজ৷''

তাঁর মতে, ‘‘এটা সত্য যে বঙ্গবন্ধু সব সময় আলোচনার টেবিলে সমাধান চাইতেন৷ কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশে দুই দলকে আলোচনায় বসিয়ে দিলেই সংকটের সমাধান হবে৷ এখন প্রেক্ষাপট আলাদা, কারণ, সংলাপ বাংলাদেশে একটি স্পর্শকাতর শব্দে পরিণত হয়েছে৷ বিএনপি মনে করছে, সংলাপ মানে হচ্ছে তাদের জয় আর আওয়ামী লীগ মনে করছে সংলাপে বসা মানে তাদের পরাজয়৷ তাই আগে দরকার গ্রাউন্ড ওয়ার্ক৷ পর্দার আড়ালে কথা বলা৷ সেটা মধ্য পর্যায়ের নেতাদের দিয়েও হতে পারে৷ গ্রাউন্ড ওয়ার্ক সফল হলে তখন বোঝা যাবে সংলাপ প্রয়োজন না সংবাদ সম্মেলন প্রয়োজন৷''

শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘‘তবে সবার আগে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে দু'টি বিষয় মানতে হবে৷ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন যে যথার্থ ছিল না তা স্বীকার করা দরকার আওয়ামী লীগের৷ আর বিএনপিকে বলতে হবে আন্দোলনের নামে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা থেকে তারা সরে আসবে৷''

‘‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে যে সংশয় দেখা দিতে পারে তা উড়িয়ে দেয়া যায় না৷ আর ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক৷ দু’পক্ষকেই তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে৷’’ আর সংকট সমাধানের কেন্দ্রে যদি বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ থাকে তাহলে ফল আসা খুব কঠিন হবে না বলে মনে করেন ড. শান্তনু মজুমদার৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়