1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

প্রবাদপ্রতিম শম্ভু মিত্রের জন্মশতবর্ষ

বাংলা থিয়েটারের অন্যতম পুরোধা পুরুষ তিনি৷ এই বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ৷ যদিও সে অর্থে এই জন্মদিন নিয়ে কোনো উদযাপনের আয়োজন হচ্ছে না, কারণ তিনি নিজেই সেই ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিকতার পক্ষপাতী ছিলেন না৷

Symbolbild Drama Theater Schauspielerei

প্রতীকী ছবি

১৯৯৭ সালের ১৯শে মে শম্ভু মিত্রের মারা যাওয়ার খবর তাঁর শহর পেয়েছিল পরের দিন সকালে, মরদেহ সৎকার হয়ে যাওয়ার পর৷ কারণ তিনি ঠিক সেরকমটাই চেয়েছিলেন৷ নিজের শেষ ইচ্ছাপত্রে ঘনিষ্ঠজনেদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, অত্যন্ত সাধারণভাবে এবং অবশ্যই লোকচক্ষুর আড়ালে যেন তাঁর অন্ত্যেষ্টি হয়৷ বাঙালিদের মধ্যে মৃত্যু নিয়ে যে মাত্রাতিরিক্ত আবেগ কাজ করে, বিখ্যাত মানুষরা মারা যাওয়ার পর তাঁদের দেহ সর্বজনের শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য যেমন প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয়, তেমন কিছু হোক শম্ভু মিত্র চাননি৷ যার দরুণ শোককে একান্তই ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রেখে নীরবে, নিভৃতে শেষকৃত্য করা হয়েছিল বাংলা থিয়েটারের সম্ভবত বিখ্যাততম, প্রবাদপ্রতিম মানুষটির

শম্ভু মিত্রের জন্মশতবর্ষে এই ঘটনার উল্লেখ এই কারণেই জরুরি যে, এর থেকে মানুষটি সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়৷ মাত্র দু-দশকের নাট্য-জীবন অসময়েই শেষ করে কেন তিনি অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন, সেটা বুঝতেও সম্ভবত কিছুটা সুবিধে হয়৷ যদিও শম্ভু মিত্রের সম্পর্কে অনুজ নাট্যকর্মীদের একটা বড় অনুযোগ হলো, তাঁর নাটক দেখা, সেই দেখা থেকে জীবনদর্শনের পাঠ নেওয়া, নতুন কিছু শেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম৷ ধরা যাক উৎপল দত্ত বা বাদল সরকার যেভাবে নাট্যমঞ্চে সক্রিয় থেকেছেন, দল পরিচালনা করেছেন, নাট্য-নির্দেশনা এবং অভিনয়ে বাংলা থিয়েটারকে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ করে গিয়েছেন, শম্ভু মিত্রের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি৷ এতে শুধু পরবর্তী নাট্যকর্মীরাই নন, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শম্ভু মিত্রের সমসাময়িক নাট্যব্যক্তিত্ত্বদেরও যথেষ্ট খেদ থেকে গিয়েছে৷

তবে ঘটনা পরম্পরা এত সহজ এবং সরলরৈখিক সম্ভবত ছিল না৷ জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে নানাজনের স্মৃতিচারণে বরং এক অচেনা শম্ভু মিত্রেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে, যিনি নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, বাংলা থিয়েটারের উন্নতিকল্পে তহবিল গড়ার জন্য তাঁকে ব্যবহার করতে৷ তাঁর অভিনয়ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ধারাবাহিক নাট্য প্রযোজনার মধ্য দিয়ে অর্থসংগ্রহ করতে৷ এ খবর দিচ্ছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত৷

নাট্যজীবনের শুরুতে বামপন্থিদের আইপিটিএ নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শম্ভু মিত্র৷ পঞ্চাশের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে আইপিটিএ-র সঙ্গে শম্ভু মিত্র গিয়েছেন মুম্বই৷ সেখানে বিজন ভট্টাচার্যের ‘জবানবন্দি' নাটকটি হিন্দিতে ‘অন্তিম অভিলাষ' নামে অভিনীত হচ্ছে৷ মানুষ নাটক দেখে দুহাত ভরে দান করছেন৷ এই সময়েই অভিনেতা-নির্দেশক রাজ কাপুরের সঙ্গে শম্ভু মিত্রের পরিচয় হয়৷ কথিত আছে, ‘জাগতে রহো' ছবিটির চিত্রনাট্য রাজ-নার্গিসকে শুনিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র৷ শুনে রাজ কাপুরের এত ভালো লেগেছিল যে সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব দেন, তিনি নিজে নির্দেশক থাকবেন, শম্ভু মিত্র ছবিটিতে অভিনয় করুন৷ শম্ভু মিত্র জবাবে বলেছিলেন, বরং উল্টোটা হোক৷ তাঁর নির্দেশনায় ‘জাগতে রহো' ছবিতে অভিনয় রাজ কাপুরের জীবনের অন্যতম মাইলফলক হয়ে উঠেছিল৷

চলচ্চিত্র পরিচালনায় সাফল্য এবং সেই সময়ে মুম্বইয়ের হিন্দি ছবিতে সবথেকে বেশি প্রবাবশালী কাপুর পরিবারের গুণমুগ্ধতা ও পৃষ্ঠপোষকতা – অন্য যে কোনো অভিনেতা হলে হয়তো বাকি অভিনয়-জীবন মুম্বইতেই কাটিয়ে দিতেন৷ কিন্তু শম্ভু মিত্র থাকেননি৷ বলেছিলেন, বিজন ভট্টাচার্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাটক লিখেছেন, যার প্রযোজনার জন্য তাঁকে বাংলায় ফিরতে হবে৷ সেই নাটকটির নাম ‘নবান্ন'৷ আর ১৯৬৪ সালে সদ্যোজাত যে নাটকের দলটি সেটি অভিনয় করল, সেই দলের নাম ‘বহুরূপী'৷

শম্ভু মিত্রের নাটক বা তাঁর নাট্যদর্শন সম্পর্কে এই জন্মশতবর্ষে নিঃসন্দেহে আরও বিস্তৃত মূল্যায়ণ হবে৷ প্রশংসা এবং সমালোচনা, দুই-ই তাঁর নাট্যভাবনাকে বুঝতে সাহায্য করবে৷ এবং তখন একটা কথা নিশ্চয় বার বার বলা হবে৷ আইপিটিএ নাট্য আন্দোলন বা নির্দিষ্ট কোনো ধারার নাটকে আটকে না থেকে শম্ভু মিত্রই বার বার দুর্জয় সাহস দেখিয়েছেন নিত্য নতুন নাট্য বিষয় ও আঙ্গিকের সঙ্গে বাংলা নাগরিক থিয়েটারে আগ্রহী দর্শকদের পরিচয় করানোর৷ কিন্তু কখনই তিনি এই ভেবে বিরত থাকেননি বা পিছিয়ে যাননি যে দর্শকের কেমন লাগবে৷ বরং তিনি নতুন বাংলা নাটকের দর্শক তৈরি করে নিতে প্রয়াসী হয়েছেন৷ যে তাগিদ থেকে একদিকে তিনি যখন গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের নাটক মঞ্চস্থ করছেন, অন্যদিকে তেমন রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে কাজ করছেন৷ আবার তিনিই ইবসেনের নাটক করছেন৷ মঞ্চসজ্জা থেকে অভিনয়রীতি, নাটকের আঙ্গিক থেকে প্রকরণ, সবকিছু তিনি বারে বারে বদলে দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছেন৷ বাংলা নাটকের নয়া ইতিহাস লিখে গিয়েছেন শম্ভু মিত্র৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন