1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

মুক্তিযুদ্ধ

পৌরসভার ঝাড়ুদার নারী মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন

দেশমাতার মুক্তির জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাজ করেছেন টাঙ্গাইলের ফাতেমা খাতুন৷ অথচ দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি৷ আর আজ রোগে-শোকে ভুগছেন স্থানীয় পৌরসভায় ঝাড়ুদার হিসেবে কর্মরত এই বীর নারী৷

‘‘এই পাহাড়ের কোল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়া শুরু করলো৷ তখন আমার খুব সাহসী ছিলাম৷ আমি কোনো কিছুকেই ভয় পেতাম না৷ তখন মুক্তিযোদ্ধারা বললেন, তোমার মতো একজন সাহসী মেয়ে আমাদের দরকার৷ যাকে মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিতে থাকতে হবে, রান্না করা এবং তথ্য ও চিঠিপত্র আনা-নেওয়ার কাজ করতে হবে৷ আমি তখন ছেলেদের মতো চুল কেটে রাখতাম৷ নাক-কান না ফোঁড়ার কারণে আমাকে পুরোপুরি ছেলেদের মতো মনে হতো৷ ফলে আমি সহজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম৷ আমাকে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য বহেড়াতৈল ক্যাম্প থেকে সখীপুরের কোকিলা পাবর, গোহাইল বাড়ি, রতনগঞ্জ ও মরিচাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠাতো৷ এছাড়া বহেরাতৈল মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে অস্ত্র পাহারা দেওয়া এবং যত্ন নেওয়ার কাজ করতাম৷ তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গ্রাম থেকে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে আনতাম৷ বাড়িতে গিয়ে মা-চাচিদের দিয়ে মরিচ, হলুদ এবং অন্যান্য মসলা বেটে নিয়ে যেতাম৷'' ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কীভাবে দেশের জন্য যুদ্ধের কাজে যোগ দেন তাই বলছিলেন সখীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন৷

অডিও শুনুন 04:00

অনুষ্ঠানটি শুনতে ক্লিক করুন এখানে

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহেরাতৈল গ্রামের সিরাজ উদ্দিন ও লাল জানের মেয়ে ফাতেমা ১৯৭১ সালে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি বহেরাতৈলে কর্মরত ছিলেন৷ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে চাইলে অল্প বয়সি বলে তাঁকে যুদ্ধে নিয়ে যাননি মুক্তিযোদ্ধারা৷ বরং ঘাঁটি পাহারা দেওয়া এবং অন্যান্য কাজের জন্যই তাঁকে নিযুক্ত করা হয়েছিল বলে জানান ফাতেমা৷

একদিন নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে কীভাবে কয়েকজন রাজাকারকে ফাঁদে ফেলেন, সেই ঘটনা সম্পর্কে জানালেন ফাতেমা খাতুন৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘একদিন মরিচার দিক থেকে কয়েকজন রাজাকার রাইফেলকে চার ভাঁজ করে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে আসছে৷ আর আমি মরিচার দিকে যাচ্ছিলাম৷ এসময় তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই তুমি ছেলে না মেয়ে? আমি বলি, ছেলে৷ তখন তারা বলে, তোমাকে তো মেয়ের মতো মনে হয়৷ তো তুমি কোথায় যাও? আমি তখন বলি, বোনের বাড়িতে যাবো৷ তখন তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, বহেরাতৈলে কি মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি আছে৷ আমি বলি, না, না এদিকে তাদের কোনো ঘাঁটি নাই৷ সোজা চলে যান৷ তারা আমার দেখানো পথ ধরে চলে যায়৷ সামনে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পড়ে৷ সেখানে তাদের ধরে বেদম মেরে ফেলে রেখেছিল মুক্তিযোদ্ধারা৷''

সখীপুরের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন ১৩ বছর ধরে সখীপুর পৌরসভার ঝাড়ূদার৷ দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি ফাতেমা খাতুন৷ এছাড়া ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে ফাতেমার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা কেউ জানতো না৷ তবে ২০০৭ সালে দৈনিক প্রথম আলো ফাতেমা খাতুনের বীরত্বের কাহিনী তুলে ধরার পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়৷ এখনও তাঁকে কিছু সহযোগিতা করেছে সরকার৷ কিন্তু তাঁর মতো একজন অসহায় নারীর জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয় বলে ডয়চে ভেলেকে জানান ফাতেমা৷ এছাড়া স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁর বীরত্বের এবং অসহায়ত্বের কাহিনী তুলে ধরার ফলে তিনি কিছুটা হলেও সরকারের সহায়তা পেয়েছেন৷ আর সেজন্য সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ফাতেমা খাতুন৷

প্রায় দুই বছর ধরে মাসে দুই হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও সখীপুর পৌরসভায় মাস্টাররোলে ঝাড়ুদারের কাজ করে দুই হাজার টাকা বেতন পান এই বীর নারী৷ অভাব-অনটনে থাকা ফাতেমা বর্তমানে নানা রোগে ভুগছেন৷ টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না৷ আর অসুখের কারণে পৌরসভাতে গিয়ে কাজ করতেও পারছেন না বলে পৌরসভার বেতনও পান না৷ ফলে রোগে-শোকে ভগ্ন শরীর এবং ভগ্ন মন নিয়ে কোনোরকমে দিন পার করছেন তিনি৷

পাঁচ সন্তানের জননী মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমার স্বামী মোবারক হোসেন একজন মানসিক রোগী৷ তাই ফাতেমার উপার্জনেই চলছে পরিবার৷ এই অসহায় মুক্তিযোদ্ধা এখন তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন৷

ফাতেমা খাতুন জানান, স্বামী মোবারক হোসেন মানসিক প্রতিবন্ধী৷ টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেননি তিনি৷ ফাতেমা আরও বলেন, ‘‘শরীরে শক্তি পাই না৷ সারা শরীর ও মাথায় ব্যথা৷ মাথা ও সারা শরীরে ঘা হয়েছে৷ টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসাও করাতে পারছি না৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও