1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

পিটিয়ে শিশু হত্যা: ‘অসুস্থ সমাজের চেহারা বেরিয়ে এসেছে'

সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষ স্তম্ভিত৷ সাধারণ মানুষ বিচারের দাবিতে মাঠে নেমেছেন৷ আর অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন বিচারহীনতা এবং অসুস্থ সমাজের পরিণতি হল এই নির্মমতা৷

গত বুধবার সকালে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ১৩ বছরের রাজনকে৷ নির্যাতনকারীরা শিশুটিকে পেটানোর ২৮ মিনিটের ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়৷ সেই ভিডিও দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে৷ মূলধারার সংবাদমাধ্যমও তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে৷ আর দাবি উঠেছে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের৷

সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে রাজন স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে৷ পরিবারকে সাহায্য করতে সে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করত৷

ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই রাজনের মৃত্যুর কারণ৷ তার শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে৷''

সিলেটের জালালাবাদ থানা পুলিশ এরইমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে৷ আরেকজনকে সন্দেহজনক হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ভিডিও ফুটেজ দেখে মোট চারজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাকিরা পলাতক৷

মন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্য

জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আক্তার হোসেন ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘পুলিশ নিজেই বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে৷ মামলায় নির্যাতনকারী মুহিত, তার ভাই কামরুল ইসলাম, তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে আসামি করা হয়েছে৷ এদের মধ্যে মুহিতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷'' তিনি জানান, ‘‘এই ঘটনায় কোনো আসামিই রেহাই পাবেনা৷ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে৷''

এদিকে সোমবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালও বলেছেন, ‘‘ঘটনাটি হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী৷ একজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে৷ আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ বাকিদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে৷ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না৷’’

বিক্ষোভ

এদিকে সোমবার মুহিতকে রিমান্ডের জন্য আদালতে আনা নেয়ার পথে সাধারণ মানুষ ব্যাপক বিক্ষোভ এবং ঘৃণা প্রকাশ করেন৷ তারাঁ অপরাধীদের ফাঁসি চেয়ে স্লোগান দেন৷ সিলেটের সাংবাদিক ওয়ায়েস খসরু ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এই ঘটনায় সিলেটবাসী স্তম্ভিত এবং ব্যথিত৷ তারা বিচার চেয়ে স্বত:স্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছেন৷''

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নির্মম নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর তা ইউটিউবেও আপলোড করা হয়৷ তবে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিমালার কারণে রোববার বিকেলে ভিডিওটি তাদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেয়৷ তবে ফেসবুকসহ আরো অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি এখনো আছে৷

অপরাধ বিজ্ঞানীর প্রতিক্রিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সমাজে বিচারহীনতা এবং অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ এই নির্মম শিশু নির্যাতন৷ বিচারহীনতার সংস্কৃতি শেকড় গেঁড়ে বসায় একটি শিশুকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করতে তারা সাহস পেয়েছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘যারা এই কাজ করেছে তারা ভয়ংকর বিকৃত মানসিকতার৷ তবে তাদের এই কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের অসুস্থ সমাজের চেহারা বেরিয়ে এসেছে৷ শিশুদের প্রতি সমাজ যে দরদি নয় তারই প্রকাশ ঘটেছে৷''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘‘আমাদের দেশের আইনে ৯ বছর পর্যন্ত শিশুরা কোনো অপরাধ করে বলে গণ্য করা হয় না৷ আর ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে৷ কিন্তু আইনের এই কথা হৃদয়ে নেই৷ ফলে এই নির্মমতা ঘটেছে৷''

মানবাধিকার কর্মীর দৃষ্টিতে

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই বর্বরতা সীমাহীন৷ শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই দায়ী৷'' তিনি বলেন, ‘‘শিশুটিকে বুধবার প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় অনেক লোকের সামনে৷ আর তা ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে৷ কিন্তু সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদের ঝড় উঠলে চারদিন পর রোববার পুলিশ তৎপর হয়৷ আমার প্রশ্ন, প্রকাশ্যে ঘটা এই নির্মমতার খবর কী তখন পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি? নিশ্চয়ই পৌঁছেছে৷ তাহলে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?''

এলিনা খান বলেন, ‘‘আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বীজ লুকানো রয়েছে৷'' তিনি বলেন, ‘‘নির্যাতনকারীরাই নির্যাতনের ভিডিও করেছে৷ এটা প্রমাণ করে এই দেশে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া৷''

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মত

এদিকে শুধুমাত্র নির্মমভাবে শিশু নির্যাতনের এই ঘটনাই নয়, এর আগে দুই নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতনের ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে৷ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য ও ছবি ধরেই মূলধারার সংবাদমাধ্যম ছবি ও খবর প্রকাশ করে৷

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এর দুটো দিক আছে৷ একটা হলো অপরাধীরাই এসব ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে তাদের ক্ষমতা দেখাতে চায়৷ আবার সাধারণ মানুষই এসব অপরাধের ছবি তুলে বিচারের আশায় তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়৷ মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের প্রসার এটাকে সহজ করেছে৷ তবে এই ফুটেজ ও ছবি প্রকাশে কোনো নীতিমালা মানতে চান না সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা৷''

তিনি বলেন, ‘‘তবে ইতিবাচক দিক হলো মানুষ আর মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের অপেক্ষা করছেনা৷ তারা তাৎক্ষণিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেই সম্প্রচার কর্মী হয়ে উঠছে৷ ফলে এখন আর অনেক অপরাধের ঘটনাই চাপা রাখা যায়না৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন