1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

পশ্চিমবঙ্গ

‌পশ্চিমবঙ্গে চাঁদাবাজিও এখন শিল্প

রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নানাবিধ পুজো বা উৎসবের চাঁদা চাওয়া থেকে শুরু করে নতুন বাড়ি তৈরির সময় হুমকি দিয়ে বেশি দামে খারাপ উপকরণ কেনানো, পশ্চিমবঙ্গে তোলাবাজির এখন নানা রূপ৷ এ অত্যাচার যেন শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে৷

চলতি বছরের জুন মাসে কলকাতার বিধান নগর উপনগরী থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের এক কাউন্সিলর তোলাবাজির দায়ে গ্রেপ্তার হয়৷ তারপর যা তথ্য বেরিয়ে আসে, তাতে বোঝা যায়, রাজনৈতিক শাসনের কত গভীরে ঢুকে বসে আছে ভয় দেখিয়ে টাকা তোলার এই অবৈধ কারবার৷ যেকোনো ব্যবসার মতোই তোলাবাজি বা চাঁদাবাজিও ফুলে ফেঁপে উঠেছে, উঠছে এই বঙ্গে৷ গ্রেপ্তার হওয়া ওই কাউন্সিলার, যিনি চলতি মাসে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন, তার রীতিমতো ‘‌রেট'‌ বেঁধে দেওয়া ছিল৷ কোনো কাজের জন্য কত দিতে হবে৷ নিজের বাড়িতে যদি কেউ কোনো মেরামতি করতে চান, তা হলে এক রকম রেট৷ বাড়ির কোনো অংশের সম্প্রসারণ করতে চাইলে, তার রেট আলাদা৷ রাস্তায় যে লোকটি হয়ত চায়ের দোকান দিয়েছেন, বা ফলের ঝুড়ি নিয়ে বসেন, তাঁদেরও দৈনিক তোলা দিতে হতো ওই কাউন্সিলরকে৷ এবার বলাই বাহুল্য যে ওই তোলাবাজির টাকা রাজনৈতিক দাদা–দিদিদের বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যেত৷ কোনো ব্যক্তিমানুষ একার জোরে এই কাজ বছরের পর বছর চালিয়ে গেছেন, এমনটা ধরে নেওয়া অবাস্তব৷ এবং এটাও বলা বাহুল্য যে প্রশাসনের একাংশের সমর্থন ছাড়া এই তোলাবাজি সম্ভব ছিল না৷ তাও হঠাৎ একদিন পুলিস তৎপর হয়ে পদক্ষেপ করল এবং ওই অভিযুক্ত কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করল৷ তার একটাই কারণ- বিধান নগরের বাসিন্দা ওই কাউন্সিলর এমন একজনের থেকে টাকা দাবি করেছিল, যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্ব পরিচিত৷

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সচিবালয় থেকে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে ফোন করে অভিযোগ জানানো হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি৷

কিন্তু প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই যোগাযোগ সবার নেই৷ ফলে লোকে মুখ বুজে তোলাবাজদের এই অত্যাচার সহ্য করে নেন৷ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা, যাঁরা কোনো দোকান, রেস্তোরাঁ, বা ওইরকম কোনো ব্যবসা চালান৷ বিধান নগরের ওই কাউন্সিলরের গ্রেপ্তারির সূত্রেই জানা গিয়েছিল, সরকারি বাজারের মধ্যে একজনকে তাঁর চুল কাটার সেলুনটি খুলতে দেওয়া হয়নি, কারণ, তিনি তোলা দিতে অস্বীকার করেছিলেন৷ একই কারণে চালু ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, পরে মোটা টাকা জরিমানা দিয়ে তোলাবাজদের সঙ্গে রফা করতে হয়েছে, এমন নজিরও আছে খাস কলকাতা শহরের বুকে৷

এ ধরনের ঘটনা যত শহর ছেড়ে মফস্বল, গ্রামের দিকে যাওয়া যায়, ততই বাড়ে৷ অবাধে যথেচ্ছ তোলাবাজি হয় হাইওয়েতেও৷ বিশেষ করে লরি ও ট্রাকচালকদের বহুদিনের অভিযোগ এই রাজ্যের তোলাবাজির বিরুদ্ধে৷ এবং সেটা যে শুধু গুন্ডা–মস্তানেরাই করে, তা নয়৷খোদ পুলিস প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাস্তায় সার দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি দাঁড় করিয়ে, যানজট তৈরি করে, নজরানা আদায় করার৷ এর সঙ্গে আছে উৎসবের মরশুমে হাইওয়েতে চাঁদার উৎপাত৷ দুর্গা, বা কালীপুজো থেকে শুরু করে শনি, মনসা, যে কোনও ছুতোয় চাঁদা তোলে স্থানীয় লোকজন, যাদের সঙ্গে পুজোর কোনো সম্পর্কই নেই৷ একাধিক ক্ষেত্রে পুলিশ এই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দেখেছে, পুজোর ব্যাপারটাই ভুয়ো, আসল ধান্দা লোকের থেকে জোর করে টাকা তোলা৷ বহু ছোটখাট গুন্ডা–মস্তানের, পাড়ার বখাটে ছেলেদের হাতখরচ চলে এভাবেই৷

এমন ভেবে নেওয়াটা ভুল হবে যে তোলাবাজির এই জুলুম বর্তমান সময়েরই সমস্যা৷ পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও এই তোলাবাজি ছিল, এমনকি তারও আগে যে কংগ্রেস সরকার, সেই আমলেও সত্তরের দশকে এ রাজ্যে কুখ্যাত সব তোলাবাজদের রমরমা ছিল৷ বাম আমলেও তার কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়নি,

এই পরিবর্তনের জমানাতেও কোনো একটি জিনিস যদি অপরিবর্তিত থাকে, তা হলো তোলাবাজি৷ প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সমর্থনও এই তোলাবাজিকে চাঙ্গা রেখেছে বছরের পর বছর৷ বিধাননগরের ওই কাউন্সিলর গ্রেপ্তার হওয়ার পর দৃশ্যতই অপ্রস্তুত, বিব্রত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তোলাবাজ এবং সিন্ডিকেটরাজের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন, অভিযুক্তকে আটক করেছিল পুলিশ৷ কিন্তু তাতে সমস্যার মূলে যে পৌঁছনো যায়নি, তার উদাহরণ সাম্প্রতিক সময় রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় বেপরোয়া তোলাবাজির অজস্র অভিযোগ৷ রাজনীতির দূর্বৃত্তায়ন যতদিন না বন্ধ হচ্ছে, ততদিন যে এমনটাই চলবে, এ নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই!‌

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? জানান নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন