1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার – অধৈর্য, স্বেচ্ছাচারীও বটে

বিরোধী রাজনৈতিক দলের মিছিল হোক বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের ধৈর্যহীনতা স্পষ্ট৷ তার পাশাপাশি ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠছে গণতন্ত্রের বিকল্প এক নির্লজ্জ দলতন্ত্র!

২০১১ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস৷ তার পরেও পঞ্চায়েত এবং লোকসভা নির্বাচনে বার বার তৃণমূলকেই সমর্থন জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা৷ স্পষ্টই বুঝিয়েছেন, ৩৪ বছরের পুরনো এক সরকারকে হটিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক দলকে তাঁরা সুযোগ দিয়েছেন, নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও ধৈর্য ধরে সেই সরকারের পাশে তাঁরা থাকতে চান৷ এমনকি সদ্য হওয়া বসিরহাট এবং চৌরঙ্গি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে৷ যদিও বসিরহাট কেন্দ্র সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিজেপির দখলে গিয়েছে, কিন্তু মানুষের সমর্থন এখনও কোন দিকে, সেটা বুঝতে রাজনৈতিক পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই৷

সেখানে বিরোধিতার মুখোমুখি হলেই রাজ্য সরকার কেন বার বার ধৈর্য হারাচ্ছে, কেনই বা স্বেচ্ছাচারীর মতো ব্যবহার করছে, সেটা কিন্তু একটা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হতে পারে৷ অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ধৈর্যের সুখ্যাতি কোনোদিনই নেই৷ সে টিভি চ্যানেল আয়োজিত ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন-উত্তরের আসর থেকে মেজাজ হারিয়ে মাঝপথে উঠে আসা থেকে শুরু করে জনসভায় অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা কৃষককে ‘মাওবাদী' তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে হাজতবাস করানো, অথবা ‘আপত্তিকর' কার্টুন এক সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে পোস্ট করার ‘অপরাধে' এক অধ্যাপককে হেনস্থা করা এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো – সমস্ত ঘটনাই বর্তমান প্রশাসনের পরমতসহিষ্ণুতার অভাবকেই প্রকট করেছে৷

কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে শাসনের নামে যা ঘটছে, তা আদ্যন্ত স্বেচ্ছাচার এবং চূড়ান্ত ধৈর্যহীনতার প্রকাশ৷ আর তার পাশাপাশি লজ্জাজনকভাবে প্রমাণ হচ্ছে, গণতান্ত্রিক রীতি নীতি অস্বীকার করে এক দলতন্ত্র মানুষের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা৷ যে রাজনৈতিক অধিকার ক্ষমতাসীন দলকে, তাদের শ্রমিক বা ছাত্র সংগঠনগুলোকে অবাধে দেওয়া হচ্ছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সেই মৌলিক অধিকারই হরণ করা হচ্ছে নানা ছল-ছুতোয়৷ এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি, কোনো সমালোচনায় কান দেওয়ার দরকার মনে করছে না প্রশাসন বরং এক ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট অরাজকতা কায়েম হচ্ছে সারা রাজ্য জুড়ে৷ মাত্র কিছুদিন আগের ঘটনা, বিরোধী বামপন্থিদের একটি বিক্ষোভ জমায়েত বানচাল করতে যে পার্কে সভা হওয়ার কথা ছিল, তার ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল! এই মানসিকতারই কুৎসিততম চেহারা দেখা গেল সদ্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর মধ্যরাতে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায়৷

অথচ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন, কর্তৃপক্ষকে ঘেরাও, ইত্যাদি চিরাচরিত ধারাগুলো যে রাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, এমন নয়! বরং শাসকদলের নিজেদের যে ছাত্র সংগঠন, সেই তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সাম্প্রতিক অতীতেই এরকম একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরনা-ঘেরাও-বিক্ষোভ চালিয়ে গেছে বিনা বাধায়৷ কিন্তু সেই একই কাজ করতে গিয়ে কার্যত চোরের মার খেতে হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের৷ মাঝরাতে, আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে নিরস্ত্র ছাত্র এবং ছাত্রীদেরও তুমুল পেটালেন দাঙ্গা দমনের তালিম পাওয়া পুলিশ-কম্যান্ডোরা!

এবং তার পরও আক্রমণ বন্ধ হলো না! নিরুত্তাপ, অনুতাপহীন প্রশাসনের হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার, দাবি করলেন ছাত্ররা সশস্ত্র ছিল, ছাত্ররাই পুলিশকর্মীদের ওপর হামলা করেছিল, পুলিশ বরং অনেক সংবেদনশীল ছিল, কিন্তু এ ছাড়া কিছু করার ছিল না৷ যিনি ঘেরাওমুক্ত হতে পুলিশ ডেকেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই উপাচার্যও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন প্রমাণ করতে যে পুলিশ না ডাকলে তাঁর জীবনসংশয় হতে পারত সেই রাতে৷ এবং এই ত্রিফলা আক্রমণের তৃতীয় ফলাটি হলো, যাদবপুরের আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের নামে কুৎসা করা যে তারা সবাই আসলে মাদকাসক্ত, অবৈধ যৌনাচারে অভ্যস্ত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন!

হয়ত বাহুল্য, তবু বলে রাখা প্রয়োজন, যাদবপুর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারদা কেলেঙ্কারির সিবিআই তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তাতে একের পর এক তৃণমূল কংগ্রেস নেতার জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে৷ ক্ষুব্ধ তৃণমূলের মহিলা শাখা এর বিরুদ্ধে কলকাতার সিবিআই দপ্তরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেছে৷ প্রশাসনের চোখে সেটা বৈধ৷ কিন্তু সারদায় প্রতারিত আমানতকারীরা দোষীদের শাস্তির দাবিতে যে মিছিল করবেন, সেটা আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে বলে তড়িঘড়ি ১৪৪ ধারা জারি করে জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো ওই দপ্তরেরই লাগোয়া দুটি রাস্তায়!

প্রশ্নটা উঠছে এখানেই৷ যে অধিকার নিজেকে দিতে কার্পণ্য নেই, অন্যের থেকে সেই অধিকার হরণ করার যুক্তি কী! শুধু তারা বিরুদ্ধমত বলেই! এই বিকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখলে অবশ্য যে কোনো শাসকগোষ্ঠীর সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকাই স্বাভাবিক৷ সমস্ত স্বৈরাচারী সর্বক্ষণ এই রোগেই ভোগেন, বলছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিসচেতন মানুষ৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন