1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

পলাতক খোকন রাজাকারের ফাঁসির রায়

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিএনপির নেতা, পলাতক এম এ জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১৷ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করা হয়৷

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশের ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা, রাজাকার খোকনের বিরুদ্ধে আনা ১১টির মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হয়৷ এর মধ্যে হত্যা ও গণহত্যার ৬টি অভিযোগের প্রতিটিতে তাঁকে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছে৷ লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং ধর্মান্তরিত করার অভিযোগসহ ৪টি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷ আসামি খোকন বিচার শুরুর আগে থেকেই পলাতক

১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে খোকন জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকায় প্রচার চালান৷ পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নগরকান্দা পৌর কমিটির সহ-সভাপতি হন৷ ২০১১ সালে তিনি নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন৷

খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:

অভিযোগ ১:

একাত্তরের ২৭শে এপ্রিল ভোর ৬টার দিকে খোকনের নেতৃত্বে তার বড় ভাই জাফর ও সশস্ত্র রাজাকার সদস্যরা নগরকান্দা বনগ্রামে যায়৷ তারা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই মোল্লা ও নাজিম উদ্দিন মোল্লার বাড়িসহ ছয় বাড়িতে লুটপাট চালায়৷ এছাড়া উমেদ মোল্লা, রতন মোল্লা, হাসেম মোল্লা, মো. ইউনুস মোল্লাসহ ১৯ জনকে আটক করে তারা৷ তাদের মধ্যে সাত্তার মোল্লা ও আজিজ শেখকে নির্যাতনের পরে ছেড়ে দেয়া হলেও বাকি ১৭ জনকে থানায় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়৷



অভিযোগ ২:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৮শে এপ্রিল থেকে ৬ই মের মধ্যে কোনো একদিন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আসামি খোকন ও তার নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনী জঙ্গুরদি-বাগুটিয়া গ্রামের কানাই লাল মণ্ডল ও আরেকজনের বাড়িতে হামলা চালায়৷ তারা ওই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং গ্রামের অন্য হিন্দুরা মুসলমান না হলে বাড়িঘর ধ্বংস করে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়৷ এরপর কানাই লালের পরিবারের কাছ থেকে জোর করে ৫ হাজার টাকা এবং জীবন দাসের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয় তারা৷

অভিযোগ ৩:

একাত্তরের ১৬ থেকে ২৮শে মের মধ্যে কোনো একদিন আসামি খোকন ও তার ভাইয়ের নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকাররা একজন মৌলবীসহ জঙ্গুরদি-বাগুটিয়া গ্রামের জীবন দাসের বাড়ি যায়৷ তারা জীবন দাসসহ তার চার ভাইকে জোর করে মুসলিম করে তাদের মুসলিম নাম দেয়৷ পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে নারী সদস্যদেরও তারা ধর্মান্তরিত করে৷

অভিযোগ ৪:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৭ই মে সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে খোকন, তার ভাই জাফর ও রাজাকার বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা চাঁদের হাট গ্রামের বণিকপাড়ায় গিয়ে ১৬/১৭ জন হিন্দুকে হত্যার হুমকি দেয় এবং তাদের কাছ থেকে সোনার গয়না ও নগদ অর্থ কেড়ে নেয়৷ এরপর তাদের বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেয়৷ ওই গ্রামে আশ্রয় নেয়া এক নারীকে ধর্ষণ করেন খোকন৷ অন্য রাজাকার সদস্যরা এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে৷



অভিযোগ ৫:

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০শে মে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে আসামি খোকন রাজাকারের নেতৃত্বে আতাহার রাজাকার, আইনাল রাজাকার ও আরো কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে কোদালিয়া গ্রামের শহীদনগরে ঢোকে৷ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে তারা বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাটের পর আগুন দেয়৷ আশেপাশে লুকিয়ে থাকা নারী ও শিশুসহ ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে খোকন ও তার সহযোগীরা৷ দেড় বছর বয়সি এক শিশুসহ অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হন৷ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় আলাউদ্দিন নামে এক কিশোরের হাত ভেঙ্গে দেন খোকন৷ এছাড়া কোদালিয়া কওমি মাদ্রাসার কাছে পাকিস্তানি সেনারা আফজাল হোসেন এবং কাছেই পাটক্ষেতে শুকুর শেখ নামে একজনকে খোকন নিজে গুলি করে হত্যা করেন৷

অভিযোগ ৬:

একাত্তরের ৩০শে মে দুপুর দেড়টার দিকে খোকনের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাসহ রাজাকাররা ঈশ্বরদী গ্রামে যায় এবং বাড়ি-ঘর ও দোকানপাটে আগুন দেয়৷ গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকা ভীত ও নিরস্ত্র প্রামবাসীকে গুলি করে রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা৷ এতে সালাম মাতবর, শ্রীমতী খাতুন, লাল মিয়া মাতুব্বর এবং মাজেদ মাতুব্বর নিহত হন৷

অভিযোগ ৭:

একাত্তরের ৩১শে মে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে খোকনের নেতৃত্বে রাজাকার সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা কোদালিয়ার শহীদনগর গ্রামের দীঘলিয়া-ঘোড়ানাড়া বিলে যায় দু'দিন আগে ঐ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত পাকিস্তানি সেনাদের লাশ খুঁজতে৷ এ সময় পিজিরউদ্দিন, তার ভাই আফাজ ও তাদের প্রতিবেশী শেখ সাদেকের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়৷

তারা তিনজনই বাড়ির ভেতরে পুড়ে মারা যান৷ একইদিন সকাল ১০টার দিকে বনগ্রামে আবদুল হাই মোল্লা, ইকরাম মোল্লাসহ পাঁচজনের বাড়ি লুট করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়৷ মেহেরদিয়া গ্রামের আসিরুদ্দিন মাতুব্বরকে মেহেরদিয়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ থেকে বের করে গুলি করে হত্যা করেন খোকন৷ পরে সফিজুদ্দিন মাতুব্বরকেও গুলি করে হত্যা করা হয়৷

অভিযোগ ৮:

একাত্তরের ৩১শে মে খোকনের নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনারা স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন, আওয়ামী লীগের কর্মী ও হিন্দুদের নিশ্চিহ্ন করতে গোয়ালদি গ্রামে যায়৷ প্রাণভয়ে পালাতে থাকা মানুষের দিকে তারা গুলি চালালে রাজেন্দ্রনাথ রায় নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন৷ পরিবারের সঙ্গে পালাতে থাকা কিশোর হান্নান মুন্সীর দুই বছরের বোন বুলু খাতুনকে তার মায়ের কোলে গুলি করে হত্যা করেন খোকন ও তার সহযোগীরা৷

অভিযোগ ৯:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৩১শে মে খোকনের নেতৃত্বে রাজাকার সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা কুড়াপাড়া গ্রামে ঢুকে ছটু খাতুন, সফিজুদ্দিন শেখ, মানিক সরদার, রতন শেখ, জয়নুদ্দিন শেখ ও আবদুল বারেক মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করে৷ এ সময় বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়৷

অভিযোগ ১০:

একাত্তরের ১লা জুন ভোরে আসামি খোকন রাজাকারের নেতৃত্বে আতাহার রাজাকার, আয়নাল রাজাকারসহ অন্যরা এবং পাকিস্তানি সেনারা বাগত ও চুরিয়াচর গ্রামে গিয়ে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়৷ এ সময় আওয়ামী লীগের সমর্থক মিনি বেগমের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা মালেক মাতব্বর, ভাই মোশাররফ মাতব্বর, দাদী, নানী ও আমজাদ মুন্সীকে গুলি করে হত্যা করে৷ এছাড়া রতন মাতব্বর, আইউব আলী ও মঞ্জু রাণীসহ ১০/১৫ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়৷

অভিযোগ ১১:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১ জুলাই থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে কোনো একদিন খোকন রাজাকারের নেতৃত্বে আতাহার রাজাকার ও আয়নাল রাজাকারসহ অন্যরা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে জঙ্গুরদিয়া-বাগুটিয়া গ্রামে কানাইলাল মণ্ডলের বাড়িতে যায়৷ কানাইলাল তাদের আসতে দেখে পাশের পাটক্ষেতে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন৷ কিন্তু খোকন রাজাকার সেখান থেকে তাকে ধরে এনে গুলি করে৷

আরো যারা পলাতক

রাষ্ট্রপক্ষ ও তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই দেশ দেশ ছেড়ে যান খোকন৷ সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, তিনি সুইডেনে আছেন৷

এ নিয়ে আসামির অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের তৃতীয় কোনো মামলার রায় হলো৷ ট্রাইব্যুনালে আসামির অনুপস্থিতিতে প্রথম বিচার ও রায় হয় জামায়াতের সাবেক নেতা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে৷ গত বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল পলাতক আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসির আদেশ দেন৷ এরপর গত বছরের ৩রা নভেম্বর একাত্তরের দুই আলবদর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল৷ বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার দায়ে দণ্ডিত এই দুজন মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই বিদেশে পালিয়ে যান৷

রায়ের অপেক্ষায় আরো তিন মামলা

ট্রাইব্যুনাল-১-এ আরও দুটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় আছে৷ এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মো. মোবারক হোসেনের মামলার কার্যক্রম শেষ হয় ২রা জুন ৷ আর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলার কার্যক্রম শেষ হয় ১৮ই সেপ্টেম্বর৷

ট্রাইব্যুনাল-২-এ রায়ের অপেক্ষায় আছে একটি মামলা৷ ২০শে আগস্ট এই ট্রাইব্যুনালে সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মামলার কার্যক্রম শেষ হয়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন