1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

নিদর্শন অনেক, কিন্তু সংরক্ষণ নেই

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, সারা দেশে সাত হাজারেরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে৷ কিন্তু এর মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১৭৬টি আর সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে মাত্র ৪৬২টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন৷

এ সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে দু'টি আবার বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ৷ আরো পাঁচটি নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইউনেস্কোর তালিকাভূক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আতাউর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের মূল সংকট লোকবল৷ মাত্র ৪৩০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারি নিয়ে কাজ করছি আমরা৷ তাই কোনো কোনো নিদর্শন রক্ষায় আমরা মাত্র একজন লোক নিয়োগ করেছি এমন উদাহরণও আছে অনেক৷ বাংলাদেশে এখন তালিভুক্ত যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে তা সংরক্ষণেই কমপক্ষে পাঁচ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী প্রয়োজন৷''

আর মাটির নীচে যেসব নিদর্শন আছে সেগুলোর সম্পর্কে ধারণা করা যায়, কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ছাড়া সম্ভব নয়৷ লোকবল সংকটের কারণে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনো চিহ্নিত করা যায়নি৷

প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে৷ তার ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘‘বাংলাদেশ অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অধিকারী৷ আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময়ে এ দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, শাসক শ্রেণি গড়ে তোলে অসংখ্য ইমারত, নগর , প্রাসাদ, দুর্গ, মন্দির, মসজিদ, বিহার স্তূপ ও সমাধি সৌধ৷ এ সব ঐতিহ্যের অধিকাংশই কালের গর্ভে বিলীন হলেও উল্লেখেযোগ্য সংখ্যক সংস্কৃতি চিহ্ন এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজো টিকে আছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সমধিক পরিচিত৷'' 

এই ওয়েবসাইটে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় কয়েকটি পুরাকীর্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে – মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, সীতাকোট বিহার, কান্তজীর মন্দির, ছোট সোনা মসজিদ, ষাটগম্বুজ মসজিদ, ভাসুবিহার, বিহার ও বারবাজার, লালবাগ দুর্গ৷

অডিও শুনুন 10:42

‘এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রত্যেকটিই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার যোগ্য’

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে বৌদ্ধ, মুসলিম এবং হিন্দু শাসনামলের পুরার্কীর্তিই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে৷ তবে খননের অভাবে আরো অনেক নিদর্শন সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা যাচ্ছে না৷ তবুও অধিদপ্তর সীমিত অর্থ কাজে লাগিয়ে প্রতি বছরই খনন কাজ করছে৷ চলতি বছরেও  খনন কাজ চলছে৷ প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে সুলতানী আমলের ৪২ গম্বুজ মসজিদ আবিষ্কার করা হয়েছে৷ নরসিংদির উয়ারী বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে দু'টি অতি প্রাচীন গ্রাম আবিষ্কারের ঘটনা বাংলদেশে বেশ আলোচিত৷ দু'টি গ্রামেই খননের পরে প্রায় দুই হাজার বছর আগের স্থাপনা ও প্রত্নসম্পদ পাওয়া গেছে৷ যার মধ্যে রয়েছে ছাপযুক্ত মুদ্রা, মূল্যবান পাথরের গুটিকা, পুঁতি, লোহার তৈরি হাতকুড়াল ইত্যাদি৷

বিশ্ব ঐতিহ্য

বাংলাদেশের যে দু'টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সে দু'টি পুরার্কীর্তি হলো পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার এবং বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ৷

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য মতে, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করছিলেন৷ ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই কীর্তি আবিষ্কার করেন৷ ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়৷ পাহাড়পুর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার৷ আয়তনে এর সাথে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা হতে পারে৷ এটি ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল৷ শুধু উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই নয়, চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো অনেক দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন৷ খ্রিষ্ট্রীয় দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান৷

উলঘ খান-ই-জাহান ১৫ শতকের দিকে বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন৷ এই প্রত্নস্থানটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয়৷ ওই এলাকায় বেশ কিছু মসজিদ, স্থাপনা, সমাধি, পুকুর ও ঢিবি পাওয়া গেছে৷ ষাটগম্বুজ মসজিদ এদের মধ্যে অন্যতম৷ মসজিদটিতে ৮১টি গম্বুজ রয়েছে৷ মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া৷ দেয়ালগুলো ৮.৫ ফুট পুরু৷ জনশ্রুতি আছে, হযরত খানজাহান (র.) ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের সব পাথর সুদূর চট্টগ্রাম, মতান্তরে ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা বলে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন৷

ইমারতটির গঠন বৈচিত্রে তুঘলক স্থাপত্যের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়৷ এ বিশাল মসজিদের চারদিকে প্রাচীর ৮ ফুট চওড়া, এর চার কোণে চারটি মিনার আছে৷ দক্ষিণ দিকের মিনারের শীর্ষে কুঠিরের নাম ‘রোশনাই কুঠির' এবং এ মিনারে উপরে ওঠার সিঁড়ি আছে৷ মসজিদটি ছোট ইট দিয়ে তৈরি৷ এর দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট, প্রস্থ ১০৮ ফুট, উচ্চতা ২২ফুট৷ মসজিদের সামনের দিকের মাঝখানে একটি বড় খিলান এবং তার দুই পাশে পাঁচটি করে ছোট খিলান আছে৷ মসজিদের পশ্চিম দিকে প্রধান মেহরাবের পাশে একটি দরজাসহ মোট ২৬টি দরজা আছে৷

এছাড়া মাহাস্থানগড়, লালমাই ময়নামতি গ্রুপ অফ মনুমেন্টস, লালবাগ দুর্গ, হলুদ বিহার ও জগদ্দল বিহারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে৷

ড. আতাউর রহমান বলেন, ‘‘এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রত্যেকটিই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার যোগ্য৷ মধ্যযুগের মহাস্থানগড়ে আমরা আড়াই হাজার বছর আগের লিখিত দলিল পাচ্ছি৷ ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন এখানে রয়েছে৷''

‘মহাস্থান' শব্দের আভিধানিক অর্থ বিখ্যাত স্থান৷ কেউ কেউ মনে করেন যে, স্থানটির আসল নাম ‘মহাস্নান' বিখ্যাত স্থানের জায়গা৷ প্রাচীন পুন্ড্রনগর আজ মহাস্থানগড়ের ভূ-গর্ভে প্রোথিত৷ এ স্থান বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ৷ প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকে খ্রীষ্টিয় ১৫শ' শতকের মধ্যে এই নগর এক সমৃদ্ধশালী জনপদ হিসেবে গড়ে উঠেছিল৷ করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরের এই প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ বর্তমান বগুড়া জেলার এক গৌরবোজ্জ্বল কীর্তি৷

অডিও শুনুন 03:33

‘প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য খনন কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’

বিশ্ব ঐতিহ্যের আরেক নিদর্শন ঢাকার লালবাগ কেল্লার নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ৷ এই কেল্লার নকশা করেন শাহ আজম৷ মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার সুবেদারের বাসস্থান হিসেবে এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন৷ ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খাঁ অবসর নিয়ে আগ্রা চলে যাবার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান৷ ১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গকে প্রাচীন সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়৷ নির্মাণের ৩০০ বছর পর গত শতকের আশির দশকে লালবাগ দুর্গের যথাসম্ভব সংস্কার করে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনা হয়৷

বাংলাদেশের জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়৷ এই বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বেই ২০০০ সালে উয়ারি বটেশ্বরের খনন কাজ শুরু হয়৷ এখনো চলছে৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য খনন কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ বাংলাদেশে যে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ হয় তা অনেকাংশেই বৈজ্ঞানিকভাবে হয় না৷ আর এ কাজের জন্য দক্ষ এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের লোকবলও আমাদের নেই৷''

তিনি জানান, ‘‘বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো জরিপ এখনো হয়নি৷ তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ  হওয়ার যোগ্য অনেক নিদর্শন আমাদের আছে৷ ময়নামতি, পাহাড়পুর, উয়ারি বটেশ্বর এর মধ্যে অন্যতম৷ আর পাহাড়পুর এবং ষাটগম্বুজ মসজিদ এরইমধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ৷ আরো অনেক নিদর্শন আছে যা আমরা বিশ্বকে দেখাতে পারি, জানাতে পারি, কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে একটি মনুমেন্টও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়নি৷ শুধু আমরা উয়ারি বটেশ্বরে লোটাস ট্যাম্পেলকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করছি৷''

অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আতাউর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এর জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন৷ পুরাকীর্তি সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ ব্যয়বহুল৷ তবুও আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করছি৷ তবে সেটা কোনোভাবেই সন্তোষজনক তা আমি বলবো না৷''

বাংলাদেশে পুরাকীর্তি জাদুঘরও আছে৷ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে এ রকম জাদুঘর মোট ১৭টি৷ এ সব জাদুঘরের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রদর্শিত হয়৷ আর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরে অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি খনন কাজ শুরু করেছে৷ এখানে মৌর্য সভ্যতার অনেক নিদর্শন আছে বলে জানান সুফি মোস্তাফিজুর রহমান৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়