1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

নববধূ সেজে উৎসবে নয়, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধা আমিনা

কপালে টিপ, পায়ে আলতা আর লাল শাড়ি পরে নববধূ সেজে উৎসব করার সৌভাগ্য হয়নি৷ হাতের মেহেদির রং মিলিয়ে না যেতেই বিয়ের মাত্র ১১ দিনের মাথায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন আমিনা বেগম৷

Ameena, Begom, Mina, Freedom, Fighter, War, Liberation, Bangladesh, 1971, Sirajgonj, আমিনা, বেগম, যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ, নারী, যোদ্ধা,

আমিনা বেগম

‘‘বলতে গেলে সে সময় দেশের পরিস্থিতিই আমাকে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে নেয়৷ আর আমার স্বামী এ সময়ই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে চলে যান৷ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বহুবার বিভিন্ন স্থানে দেখা হয়েছে আমাদের৷ কিন্তু এসময় আমরা দু'জন অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতো দেশের সম্ভ্রম বাঁচাতে এতটাই আন্তরিক ছিলাম যে আমাদের নিজেদের দিকে নজর দেওয়ার সময় ছিল না৷'' দীর্ঘ নয়মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের সক্রিয়তার কথা এভাবেই তুলে ধরলেন বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আমিনা বেগম৷

সিরাজগঞ্জে ১৯৫১ সালের ৩০ নভেম্বর জন্ম আমিনার৷ বাবা ডা. আনিসুর রহমান এবং মায়ের নাম জাকেরা বেগম৷ কলেজ জীবনের শুরু থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন আমিনা৷ ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন৷ সেসময় সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদিকা৷ পরে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন৷ ফলে হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি, মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি পটভূমি তৈরির কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আমিনা এবং তাঁর সহকর্মী ছাত্র নেতারা৷ সেই বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের জন্য সকলকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমিনা৷

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের ১৪ তারিখ তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বকুলের সাথে বিয়ে হয় আমিনার৷ বিয়ের ১১ দিনের মাথায় পঁচিশে মার্চ জাতির জনকের উচ্চারিত শব্দমালা শুনে তাড়িত হন তাঁরা৷ স্বামী সংসারের হাতছানি দূরে ঠেলে উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন৷

BdT Indien Munition wieder gefunden

যুদ্ধের সময় অস্ত্র বহনসহ আরও অনেক কাজ করেছেন

ডয়চে ভেলের সাথে টেলিফোন আলাপে মুক্তিযুদ্ধে নিজের সাহসী ভূমিকার কথা তুলে ধরেন আমিনা৷ তিনি বলেন, ‘‘সিরাজগঞ্জের প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা এবং পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের প্রায় দেড় হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য নির্দেশ আসে৷ সিদ্ধান্ত হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নৌকাযোগে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের শিলিগুড়ির পাঙ্গা চর থেকে অস্ত্র কিনে আনবে৷ চারটি নৌকা নিয়ে আমরা মাইনকারচরের উদ্দেশ্যে রওনা করি৷ এর মধ্যে একটি নৌকার আরোহী ছিলাম আমি একা৷ মাঝপথে যাত্রীবোঝাই একটি নৌকায় দেখা মেলে আমার শিক্ষয়িত্রী জ্যোৎস্না দিদি ও তাঁর দেড় বছরের শিশুকন্যা সঞ্চিতার সঙ্গে৷ নানা দিক ভেবে আমি এ দুজনকে আমার নৌকায় তুলে নিই৷ এর কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি দুটি গানবোট আমাদের পিছু ধাওয়া করে৷

এক পর্যায়ে আরেক নৌকায় থাকা আমার স্বামী আমাকে অস্ত্র সরবরাহকারীদের নাম-ঠিকানা দিয়ে আমাদের নদীর পাড়ে নামিয়ে দেন৷ চুক্তি হয়, প্রয়োজন হলে তিনি গ্রেনেড হামলা চালাবেন পাকিস্তানি গানবোটের ওপর, আর আমি ও জ্যোৎস্না দিদি যেকোনো মূল্যে অস্ত্র আনতে ভারতের শিলিগুড়ি যাব৷ দীর্ঘ পথ দৌড়ে আমরা একটি গ্রামে এসে পৌঁছাই৷ উত্তেজনার পাশাপাশি ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তখন আমরা কাতর৷ দীর্ঘ সময় পর এক কিশোরী গৃহবধূ আমাদের কিছু মুড়ি ও পানি খেতে দেয়৷ সন্ধ্যায় আমরা নৌকাঘাটে এসে দেখি, আমার স্বামী উৎকণ্ঠিত হয়ে আমাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন৷ তাঁর কাছে শুনেছি, পাকিস্তানি গানবোট দুটি খুব কাছে এলেও পরিত্যক্ত নৌকা ভেবে ফিরে গেছে৷ গভীর রাতে আমরা মাইনকারচরে পৌঁছাই৷

Ameena Begom Freiheitskämpferin Sirajgonj Bangladesch

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনা বেগম

পরদিন সড়কপথে আমরা জলপাইগুড়ির পাঙ্গা চরে যাই৷ পরে আমরা ট্রাকযোগে সেখান থেকে ৪০০ রাইফেল, ৪০ হাজার গোলাবারুদ, ১০ ব্যাগ বিস্ফোরক, চারটি আরসিএল এবং কিছু গ্রেনেড নিয়ে আসি৷ মাইনকারচর থেকে অস্ত্রগুলো আমরা তিনটি নৌকা বোঝাই করে সিরাজগঞ্জে নিয়ে আসি এবং সেসব মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করি৷''

এরপর রৌমারি ইয়ুথ ক্যাম্পে সিরাজগঞ্জের বেশ কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা দলের হয়ে যোগাযোগ এবং অস্ত্র সরবরাহের কাজ করেছেন৷ অক্টোবর মাসে শিলিগুড়ির পাঙ্গা চর থেকে আরো এক চালান অস্ত্র মাইনকারচরে এসে পৌঁছায়৷ এ সময় বেশ কিছু অস্ত্র নৌকাযোগে সিরাজগঞ্জে পাঠানো হয়৷ এর কিছুদিন পরই আমিনার উপর দায়িত্ব পড়ে, আরো কিছু অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে৷ কিন্তু অস্ত্র নিয়ে নৌকাযোগে সিরাজগঞ্জ শহরের কিছুটা উত্তরে ব্রহ্মগাছায় পৌঁছালে আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়৷ এ যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও যুদ্ধের পুরো সময় তিনি ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই৷ এক পর্যায়ে অস্ত্রসহ ফিরে আসেন৷ পরে কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারচরে গিয়ে অস্ত্র ও গ্রেনেডগুলো মাটিতে পুঁতে রাখেন৷ নির্দেশ ছিল, বিশেষ প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে অস্ত্রগুলো সরবরাহ করতে হবে৷

স্বাধীনতার পর উপজেলা নারী ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন আমিনা৷ ২০০৮ সালে অবসরে যান৷ কিন্তু যুদ্ধের পরেও দেশের মানুষের জন্য, তাঁর ভাষায়, আরো দুঃসাহসী কাজ করেন তিনি৷ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে সম্ভ্রমহারা নারীদের অর্থাৎ বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করে একত্রিত করেছেন৷ তাঁদের অধিকারের জন্য এখন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আমিনা৷ বীরাঙ্গনাসহ যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত এবং অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের সচেতন জনগোষ্ঠী এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই

সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন