1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

ধর্মাশ্রয়ী বাংলাদেশের রাজনীতি

বাংলাদেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোটের পার্থক্য সামান্য৷ আ. লীগের চেয়ে বিএনপি ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ভোট কম পায়৷ দল দু’টির এই ভোট মোটামুটিভাবে নির্দিষ্ট৷ আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী, সাংগঠনিক ভিত্তি আছে৷

১.

আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির অনেক দুর্বল৷ আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না, মূলত তারাই বিএনপির ভোটার৷ ফলে সাংগঠনিক ভিত্তি না থাকলেও বিএনপি ভোট ঠিকই পায়৷

সাংগঠনিক ভিত্তি আছে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর৷ সারা দেশে নয়, কিছু এলাকায়৷ তাদের ভোটের সংখ্যা ৩ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ৷ এককভাবে জামায়াত যদি নির্বাচন করে, দু-তিনটির বেশি আসন পায় না, পাবে না৷ বিএনপির সঙ্গে একত্রিত হয়ে নির্বাচন করলে জামায়াত ১৫ থেকে ২০টি আসন পেয়ে থাকে৷ তাদের রাজনৈতিক শক্তি দৃশ্যমান করার জন্যে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য করাটা খুব জরুরি৷ আবার বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলে ১২০ থেকে ১৩০টি আসন পাওয়া সম্ভব৷ সরকার গঠনের জন্যে প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসন পাওয়া সম্ভব নয়৷

বিএনপি-জামায়াত একে অপরের স্বার্থে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেছে৷ তারা যখন সম্মিলিতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন সরকার গঠন করতে পারে (যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়)৷ বিএনপির ভেতরে জামায়াত মনোভাবাপন্ন কিছু নেতা আছে৷ তারা আলোচনায়-দর কষাকষির সময়ে কৌশলে জামায়াতকে বেশি সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে৷ বিএনপি যখনই ক্ষমতায় যায়, খুব গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র বা শিক্ষার মতো মন্ত্রণালয় জামায়াত মনোভাবাপন্ন নেতারা পেয়ে থাকে৷

বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, বড় দল বিএনপিকে সবসময় চাপে রাখে ছোট দল জামায়াত৷ জামায়াত চেষ্টা করে তার নীতি-আদর্শ বিএনপির ভেতরে বিস্তার ঘটাতে৷ কিছু কিছু পেরেছেও৷ ফলে বিএনপি ক্রমেই জামায়াতের উপর নির্ভরশীল একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে৷ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত অনেকটা প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণে৷ বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বুঝতে হলে, এই বিষয়টি বুঝতে হবে৷

২.

বিএনপি-জামায়াত একত্রিত হয়ে নির্বাচন করলে, আওয়ামী লীগের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে (১৫১টি) বিজয়ী হওয়া শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব৷ সে কারণে আওয়ামী লীগের প্রধান টার্গেট বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যে ফাটল ধরানো৷ ফাটল ধরানোর জন্যে যতটা না প্রকাশ্যে তার চেয়ে বেশি গোপনে জামায়াতকে বিএনপির থেকে সরাতে চায়৷ আওয়ামী লীগ প্রথম বড় সুযোগ পেয়ে যায় ১৯৯৬ সালে৷ ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কে অবণতি ঘটে৷ সুযোগটা নেয় আওয়ামী লীগ৷ তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করে না, কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলে৷ আওয়ামী লীগ নেতারা তখন জামায়াত নেতাদের সঙ্গে গোপনে-প্রকাশ্যে মিটিং করে৷ দুই প্লাটফর্মে থেকে আওয়ামী লীগ-জামায়াত একই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে৷ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা মুছে ফেলার জন্যে জামায়াতের প্রয়োজন ছিল, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য৷ বিএনপির সঙ্গে তো ঐক্য ছিলই৷ আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ঐক্য হলো, এখন আর বলা যাবে না জামায়াত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল – এই ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলগত ঐক্যের ক্ষেত্রে জামায়াতের নীতি৷

এই নীতিতে তারা অনেকটা সফল হয়৷ আন্দোলনে পতন হয় বিএনপি সরকারের৷ সরকার পতনের পরও এককভাবে নির্বাচন করে বিএনপি ১১৬টি আসন পায়৷ এককভাবে নির্বাচন করে জামায়াত আসন পায় মাত্র তিনটি৷ তারপর আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে৷ ভুল বুঝতে পারে জামায়াত৷ তারা আবার এগিয়ে আসে বিএনপির দিকে৷ ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচন করে সরকার গঠন করে৷ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ৷

বিএনপি-আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলে জামায়াতের মতো একটি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পতিত ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলকে৷ এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিতে ধর্ম বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে৷

৩.

বাংলাদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখ করার মতো কোনো জনসমর্থন বা ভোট নেই৷ ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে তারা কোনো ‘ফ্যাক্টর' হয়ে উঠতে পারেনি৷ তাদের তুলনায় ভোটের রাজনীতিতে বড় ‘ফ্যাক্টর' ‘স্বৈরাচার' এরশাদের জাতীয় পার্টি৷ এই আঞ্চলিক দলটি ১৫ থেকে ২০টি আসন পেয়ে থাকে৷ ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি ফ্যাক্টর৷ জাতীয় পার্টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না হলেও, ধর্মকে তারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে৷ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছে তারা৷ ধর্মাশ্রয়ী জাতীয় পার্টিকে কাছে টেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ৷

জামায়াতকে বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগ পৃষ্ঠপোষকতা করছে৷ দু'টি রাজনৈতিক দলই এভাবে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করছে৷ প্রচণ্ড গোঁড়া আরও কিছু ধর্মভিত্তিক দল আছে৷ নিজেদের রাজনৈতিক দল না বললেও, তারা আসলে রাজনীতিই করে৷ যেমন হেফাজতে ইসলাম৷ তাদের দেশব্যাপী সংগঠন নেই, ভোট নেই৷ সারা দেশের কওমী মাদ্রাসার কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী আছে তাদের হাতে৷ ফলে তারা চাইলে একদিনে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটাতে পারে৷ বিএনপি মানসিকভাবে অনেকটা হেফাজতে ইসলামের কাছাকাছি বহু আগে থেকে৷ শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের সময় তা আর একবার প্রমাণ হয়৷ বিএনপি-জামায়াতের যে সরকার বিরোধী আন্দোলন, সেই আন্দোলনে যদি হেফাজতে ইসলাম যোগ দেয়, আওয়ামী লীগ মনে করে বড় বিপদে পড়তে হতে পারে৷

বিএনপি-জামায়াতকে নিপীড়ন-নির্যাতন করে দমন করলে, ধর্মের উপরে আঘাতের অভিযোগ অতটা আসে না, জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও৷ হেফাজতে ইসলামের উপরে পুলিশি আক্রমণ হলে ‘ধর্মের উপর আঘাত' – এমন প্রচারণা জোরালোভাবে সামনে চলে আসে৷ সরকার চায় না তার বিরুদ্ধে এমন প্রচারণা চলুক৷ ফলে সরকার কৌশলে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হেফাজতে ইসলামকে হাত করার নীতি নেয়৷ হেফাজতের অপছন্দ ‘নারী নীতি' বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে সরকার৷

গোলাম মোর্তোজা

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দেয়৷ বক্তৃতায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধর্মীয় প্রসঙ্গ আনা হয়৷ যেমন ‘দেশ চলবে মদিনা সনদ অনুযায়ী' – প্রধানমন্ত্রী কথাটা মাঝেমধ্যে বলেন৷ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রাখা আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক৷ নিজেরা ধর্ম বিরোধী নয়, এটা প্রমাণ করার জন্যেই আওয়ামী লীগ এ সব করেছে, করছে৷ বিএনপি বা জামায়াতের চেয়েও তারা বেশি ধর্মভীরু এটা প্রমাণ করছে আওয়ামী লীগ৷ হেফাজত ব্লগারদের তালিকা করেছে, সেই তালিকা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সরকার প্রায় নির্বিকার৷ ‘জঙ্গিরা করেছে, বিএনপি-জামায়াত করেছে' – ইত্যাদি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে থেকে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে৷

৪.

ভোটের রাজনীতির খেলায় বিএনপি-আওয়ামী লীগ ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনেছে৷ আর এখন ভোটারবিহীন নির্বাচন করে, জনসমর্থন ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার জন্যে আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করছে৷ ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করছে৷

বিএনপির সঙ্গে থেকে জামায়াত প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে৷ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জামায়াতে ইসলামীকে দুর্বল করা গেলেও, অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো ক্রমশ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়