1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগওয়াচ

‘দৈত্যকে পুনরায় বোতলে ভরার মন্ত্রটি কি সরকার জানে?’

কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দিয়ে আদেশ জারি করেছে সরকার৷ এই শিক্ষার নীতি, মান এমন নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷

কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়৷ গত মঙ্গলবার রাতে গণভবনে কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিস্টদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বৈঠকে এই স্বীকৃতির ঘোষণা দেওয়ার একদিন পরই এই প্রজ্ঞাপন জারি হলো৷

ফিরোজ আহমেদ ফেসবুক পাতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন এই প্রসঙ্গে৷ সেখানে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘‘শফি সাহেবের ৯০ দশকে দেয়া একটা সাক্ষাতকার আছে, যেখানে তিনি কওমি মাদ্রাসার সরকারি স্বীকৃতির পক্ষের লোকদের কঠোর বিরোধিতা করেছিলেন৷ কেননা, তাতে ধর্মীয় শিক্ষাকে আর্থিক সুবিধার জন্য জলাঞ্জলি দেয়া হবে৷ তার চাপেই দশকের পর দশক এই স্বীকৃতি পিছিয়েছে৷ গত তিন বছর ধরে তিনি বলতে গেলে এই অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজপথে৷ চাহিদার এই বিবর্তনে মাদ্রাসা শিক্ষার যে বিশাল জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে, তার চাপ-আগ্রহ-প্রয়োজনীয়তারই স্বীকৃতি আছে৷''

ফিরোজ আহমেদ আরো লিখেছেন,, ‘‘আমরা নিজেদের পাপে অভিন্ন শিক্ষার কাঠামোর সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছি৷ ফলে এই দ্বন্দ্ব আর আমরা এড়িয়ে যেতে পারবো না৷ কীভাবে একে আমরা যথাসম্ভব কম রক্তপাতে অতিক্রম করবো, সেইটাই বিবেচ্য বিষয়৷'' 

সাংবাদিক প্রভাষ আমিন কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষা সনদের স্বীকৃতিকে হেফাজতের সরকার উৎখাতের চেষ্টার পুরস্কার হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির ঘোষণায় ক্ষুব্ধ সুন্নী মতাদর্শী ইসলামী নেতারা৷ বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম আবদুল করিম তারেক সাংবাদিকদের বলেছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে কওমি ও জঙ্গি মতাদর্শীরা সরকারিভাবে স্বীকৃতি পাবে৷ সরকার খাল কেটে কুমির আনার মতো কাজ করছে৷ জঙ্গি, হেফাজতীরা সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছে বিগত সময়ে৷ সরকার উৎখাতের চেষ্টা করার জন্য ওদের পুরস্কৃত করা হয়েছে৷''

নুরুল আফছারের অবশ্য ধারণা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সনদ পেলেও সেটা আসলে কোনো কাজে আসবে না

অন্যদিকে, পল্লব হোসেন লিখেছেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার মান বেশ ‘দুর্বল'৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘সাধারণ ও মাদ্রাসা বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকের শুরুতে জাতীয় পতাকার ছবি ও জাতীয় সঙ্গীত থাকলেও কওমিতে নেই তা অনুসরণের বালাই, যাকে তারা বলছে ‘মুসলমানদের পাঠ্যধারা'৷ কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন স্তরের বই ঘেঁটে এবং তুলনা করে দেখা গেছে, তাতে উঠে আসা বিষয়বস্তু মূল ধারার পাঠ্য পুস্তকের তুলনায় বেশ দুর্বল৷ বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বা বেফাক বলছে, সাধারণ শিক্ষার ধারায় এখনও ব্রিটিশদের ছাপ রয়ে গেছে, অন্তত তা থেকে তারা ব্যতিক্রম৷''

তাঁর এ স্ট্যাটাসে ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোরের একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছেন পল্লব হোসেন৷ প্রতিবেদনটির শিরোনাম, ‘জাতীয় পতাকায় আপত্তি কওমির'৷

প্রতিবেদনে বরং কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের মহাসচিব মুহাম্মাদ আব্দুল জব্বার জাহানবাদী দাবি করেন, ‘‘আমাদের শিক্ষা ধারা মুসলমানদের, যা শুরু হয়েছে মদিনা থেকে৷ আর বর্তমানে চলমান ব্রিটিশদের শিক্ষার ধারা সাংঘর্ষিক৷ জেনারেল শিক্ষা হলো ধর্মহীন৷''

আলী আহমেদ লিখেছেন, ‘‘জেনে রাখা ভালো, এতদিন এ দেশের কওমি মাদ্রাসা ছিল জঙ্গির আস্তানা৷ এখন হয়ে গেল ইসলামের কেন্দ্র বিন্দু৷ এতদিন তেঁতুল ছিল টক, এখন হয়ে গেল মিষ্টি৷ এত দিন দাড়ি-টুপিওয়ালা দেখলেই মনে হতো জঙ্গি, এখন মনে হয় এ দেশে এদেরকে দিয়েই আসবে ইসলাম৷ গত দিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন উনার বাবা মরহুম শেখ মুজিব সাহেব নাকি কওমি মাদ্রাসার জন্য জায়গা দিয়েছিলেন!! কিন্তু কোথায় বলেন নাই৷ উনি কি সামনে নির্বাচনের ইস্যু রেখে ধর্মব্যবসা শুরু করে দিলেন? এতদিন শাহরিয়ার কবির অনেক কথাই বলতেন, বলতেন তথ্যমন্ত্রীও৷ আজ তারাও বলছেন না তাহলে বুঝতেই পেরেছেন? ইহা কওমি সনদ নয়, আমাদের ধর্ম নিয়ে খেলার একটা প্রাথমিক এপিসোড৷''

শাহরিয়ার কবির অবশ্য দৈনিক প্রথম আলো'কে দেয়া খুব সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেই বলেছেন, আওয়ামী লীগও যে ‘ইসলামী কার্ড' খেলতে শুরু করেছে তা আত্মঘাতী হবে৷

সুজিত বিশ্বাস প্রশ্ন তুলেছেন সনদের মার্কস বন্টন কীভাবে হবে, তা নিয়ে৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘এসএসসি, এইচএসসি, ব্যাচেলর নাই, কিন্তু মাস্টার্স পাস৷ বিষয়টা সমীকরণে কীভাবে মিলবে, বুঝছি না৷ কীভাবে কোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়, অন্যান্যদের সাথে সনদের মার্কস বন্টন হবে!''

আশরাফ সবুজ অবশ্য এই স্বীকৃতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে একত্রীকরণ এক অনন্য পদক্ষেপ, যা দেশে শান্তি শৃঙ্খলা ও প্রগতি আনতে সহায়ক হবে৷ তারাও এদেশের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করি৷ তাদের চিন্তাচেতনার মূল্যায়নও আবশ্যক৷''

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সমমান দেওয়ার লক্ষ্যে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি (পদাধিকার বলে) ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে৷ এই কমিটির তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে৷ দাওরায়ে হাদিসের সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন প্রণয়ন, সনদ তৈরিসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে৷ এই কমিটি দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থাকবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে৷

বাংলাদেশের একটি সাধারণ ধারার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্যে মাস্টার ডিগ্রির সমমান হবে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের ডিগ্রি৷ তবে এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে৷ তাঁরা বলছেন, যে শিক্ষার কারিকুলামে সরকারের হাত নেই, শিক্ষক সম্পর্কে সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই, নেই যথাযথ অবকাঠামো, সেই শিক্ষার মানই বা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার?

সরকারি হিসাবে ২০১৫ সালে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯০২৷ এর শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ৷ এ হিসাবের বাইরেও আরো কয়েক হাজার মাদ্রাসা৷ মূলত এসব মাদ্রাসার পড়ালেখা পুরোপুরিই আরবি শিক্ষানির্ভর৷ তবে কিছু মাদরাসায় খুবই সাধারণ পর্যায়ের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত পড়ানো হয়৷ আর শিক্ষকদের মান ও অবকাঠামো নিয়েও বড় রকমের প্রশ্ন রয়েছে৷   

কওমির সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘‘সরকার কওমি মাদরাসার দাবি মানলেও এর ফলাফল শুভ হবে না৷ মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সহজেই চাকরির বাজারে ঢুকতে পারবে না৷ আসলে কওমির এই সনদের স্বীকৃতি নিয়ে পরে নানা জটিলতা সৃষ্টি হবে৷ আমরা কোনোভাবেই কওমি মাদরাসার সনদকে সমর্থন করি না৷''

এই প্রসঙ্গে শিহাব শাহিন সরকারের উদ্দেশ্যে ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘‘দৈত্যকে যে বোতল থেকে বের করে দিচ্ছেন,তাকে পুনরায় বোতলে ভরার মন্ত্রটি জানা আছে কিনা! ভবিষ্যতই কেবল পারবে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে৷ ''

সংকলন: অমৃতা পারভেজ

সম্পাদনা: আশীষ চক্রবর্ত্তী

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

সংশ্লিষ্ট বিষয়