1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

থামেনি স্বামী হারানো মানুষগুলোর কান্না...

বৈধব্যের সাদা শাড়িতে মোড়া কতগুলো নির্জীব, নিস্তব্ধ মানুষ৷ স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের স্বাদ-আহ্লাদ যাঁদের মাটিতে মিলিয়ে গেছে৷ সমাজের এই অপাঙ্‌ক্তেয়, ব্রাত্য নারীদের যে স্বপ্ন দেখতে নেই, ভালো-মন্দ খেতে-পরতে নেই!

‘বিধবা' – কিছুদিন আগেও এ কথাটা শুনলে এমনই একটা চিত্র ফুটে উঠতো চোখের সামনে৷ ছবি, গল্প-উপন্যাস, অথবা নিজেদের চারপাশে আমার মতো আপনাদেরও নিশ্চয় বিধবাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে৷ আমি তো ছোটবেলায় ঠাকুমাকে শুধুমাত্র ঐ ‘শুভ্র' বেশেই দেখেছি৷ দেখেছি পিসিমনি, সুমিতা মাসি অথবা ছোট কাকাতো বোনটাকে হঠাৎ করে বিধবা হয়ে যেতে৷ হিন্দু বাড়ি, তাই ঠাকুমাকে নিরামিষ ছাড়া অন্য কিছু খেতে দেখিনি৷ কিন্তু বোনের বেলায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বড়রাও ‘আধুনিক' হয়েছেন, বুঝদার হয়েছেন৷ তাই শবরী, আমার বোনটা আজ মাছ খায়, রঙিন শাড়িও পরে৷ কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে একাই থেকে গেছে ও, বিয়ে করেনি৷ অফিস করে, বাড়ি ফেরে, ছেলেকে দেখাশোনা করে, তার বায়না মেটায়, কিন্তু একবারও নিজের মুখটা আয়নায় দেখে না৷ বৈধব্য ওর মনে বাসা বেঁধেছে বহু বছর হলো৷ তাই ও নিজের কথা ভাবতে ভুলে গেছে, গান করতে ভুলে গেছে, হাসতে ভুলে গেছে৷

Witwen feiern Holi in Vrindavan

ভারতের বৃন্দাবনে হোলি উৎসবে বিধবারা

কিন্তু কেন এমন হলো? সমাজ, পরিবার, এই আমরা, আমরা কি পারতাম না শবরীকে আবারো একটা নতুন জীবনের সন্ধান দিতে, ওকে আবার স্বপ্ন দেখার জন্য তৈরি করতে? পারতাম৷ কিন্তু ও যে বিধবা! তাই ওকে নিয়ে ভাবার এত সময় আমাদের কোথায়? ওর মতো মেয়েদের কষ্টটা দেখার জন্য যে মানবদরদী চোখ দরকার – সেই চোখ আমাদের আদৌ ফুটেছে কি? না৷

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের প্রচলন করেছিলেন সেই কবে৷ তাই ভারতের বৃন্দাবনে বিধবারা আজ হোলি উৎসবে রং খেললে অথবা নতুন দিল্লির ‘শিখ বিধবা পল্লী' নিয়ে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হলে আমরা ‘সাধু, সাধু' বলি ঠিকই, কিন্তু আজও আমার-আপনার ছোটবোন, বৌদি, দিদি, পিসি, ফুফু, চাচি অথবা মাসির নতুন করে বিয়ে দেয়ার কথা উঠলে আমরা এ ওর দিকে তাকাই, দশবার ভাবি৷

Deutsche Welle Süd-Ost-Asien Debarati Guha

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সম্পাদক

মুসলমান সমাজের চিত্রটাও যে খুব আলাদা, তা নয়৷ বাংলাদেশের সোহাগপুরের কথাই ভাবুন৷ নির্মম, নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী ঐ ‘বিধবা পল্লী'৷ আজও নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদী রূপ নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর পার হয়েছে, আর সময়ের সেই স্রোতে যেন উধাও হয়ে গেছে সেখানকার বিধবা ও তাঁদের পরিবারের পুনর্বাসনের সমস্ত উদ্যোগ৷ সরকার, ব্র্যাক, বাংলাদেশ ব্যাংক – নিজেদের ‘সময়-সুযোগ' মতো কখনও ছাগল, কখনও শাড়ি, চাল-ডাল, কখনও বা মাসে মাসে মাসোহারা বাবদ টাকা দিয়েছে৷ আবার অচিরেই এ সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সোহাগপুরের বিধবারা, পাননি সরকারের দেওয়া সেই মাসিক ‘ভিক্ষা'৷ সরকারে পরিবর্তন তাঁদের জীবনেও এনে দিয়েছে নতুন যুদ্ধ, কোনোক্রমে বেঁচে থাকার নতুন লড়াই৷

তারপরও এ বছর কিছুটা সুখের মুখ দেখেছেন এঁরা৷ সোহাগপুর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়েছে৷ তাই প্রথমবারের মতো বাংলা নববর্ষ পালন করেছে বিধবা পল্লীর বিধবারা৷ গণজাগরণ মঞ্চের দৌলতে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি, মিষ্টি, দই আর শুকনা খাবারও জুটেছে৷ আরো ক'টা মানুষ শুনেছেন স্বামী হারানো এই মানুষগুলোর কান্না৷

আশা করি আগামীর আলো আমাদের চোখ খুলে দেবে আরো খানিকটা, নতুনের পথ দেখাবে আমাদের৷ আমরা যাতে এই ব্রাত্য মানুষগুলোকে ভুলে না যাই, আমিও যাতে আবারো একটু ভাবি ছোট্ট বোন শবরীর কথা৷ পাশে বসে, এঁদের যেন আমরা বুকে টেনে নেই৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়