ডায়েরির পাতায় পাতায় সিরিয়া যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন | বিশ্ব | DW | 17.06.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সিরিয়া

ডায়েরির পাতায় পাতায় সিরিয়া যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন

যে বয়সে শিশুরা মায়ের কোলে মাথা গুঁজে আদর-ভালোবাসা নেয়, হেসে-খেলে কেটে যায় সোনালী দিন, সেই বয়সেই মিরিয়াম রউইককে দেখতে হয়েছে কল্পনাতীত নিষ্ঠুরতা৷ সমসাময়িক পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ঘর-বাড়ি-চারপাশ ধ্বংস হতে দেখেছে সে৷

default

এক কিশোরীর ছবি

দিন রাত সময় কেটেছে আতঙ্কেই৷ তবে ভয়ে সে কুঁকড়ে যায়নি৷ বরং ভয়ের সেই সময়গুলোকে সে লিখে রেখেছে ডায়েরিতে৷ যেন যে কোনো সময়েই পাতা উল্টে তাকানো যায় অতীতে৷ এক সময়কার সিরিয়ার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র আলেপ্পো যখন জঙ্গিরা দখল করে নেয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর৷ তখন শিশুমনের স্মৃতির গাঁথুনিতে একে একে যোগ হয়েছে ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন৷ মিরিয়াম লিখেছে, ‘‘এক সকালে ভয়ঙ্কর আওয়াজে জেগে উঠি৷ মনে হচ্ছিল যেন সব চুরমার হয়ে যাচ্ছে৷ মানুষ ‘আল্লাহু আকবার' বলে চিৎকার দিচ্ছিল৷''

‘‘আমি প্রচণ্ড ভয় পাই৷ মনে হচ্ছিল, সবকিছু বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ তীব্র শক্তি দিয়ে আমি আমার পুতুলকে বুকে চেপে ধরি৷ তাকে বলতে থাকি, ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, আমি আছি তোমার সাথে৷''

এভাবে তার ডায়েরির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর সেই সব দিনের উপাখ্যান৷ মাতৃভাষা আরবিতে লেখা সেই ডায়েরির সন্ধান পান একজন ফরাসি সাংবাদিক৷ বার্তা সংস্থা এএফপি তা প্রকাশ করে৷

ডায়েরি জুড়ে রয়েছে এক কর্মজীবী খ্রিষ্টান পরিবারের গল্প৷ নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিচিত জগত ছেড়ে যাওয়ার গল্প৷ কিভাবে জঙ্গিরা ওই এলাকায় আসে, কিভাবে তাদেরকে পরিচিত এই জগৎ ছাড়ার নির্দেশ দেয়, আর তারাও সেটা মানতে বাধ্য হয়– এসবের বর্ণনা৷ ৮ বছর বয়সে আলেপ্পোর পতন দেখা মিরিয়ামের বয়স এখন ১৩ বছর৷

সম্প্রতি এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সে বলে, ‘‘যুদ্ধ যখন একটা বিরতি নেয়, তখন মা আমাকে ডায়েরি লিখতে উৎসাহ জোগান৷ আমি ভাবি, হ্যাঁ, আমার ডায়েরি লেখা উচিত, কারণ, এর মাধ্যমেই একদিন আমি স্মরণ করতে পারবো–কী হয়েছিল এই সময়ে৷''

ফরাসি এক সাংবাদিক মিরিয়াম ও তার ডায়েরির কথা জানতে পারেন৷ তিনি বুঝতে পারেন, এই ডায়েরি যুদ্ধকে ভেতর থেকে দেখার একটা দরজা খুলে দিতে পারে৷ ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্য ন্ত সময়ে এই ডায়েরি লেখা হয়৷ যুদ্ধ হোক আর শান্তি হোক, শিশুর বড় হওয়া তো আর থেমে থাকে না৷ লড়াই-সংঘাতের মাঝেই বড় হচ্ছিল মিরিয়াম৷ ডায়েরিতে তাই বড় হওয়ার নানা ধাপের যেন ধারাবিবরণী দিয়েছে মেয়েটি৷ আলেপ্পোর দেয়ালে দেয়ালে সে দেখেছে বিপ্লবী স্লোগান৷ সরকার বিরোধী বিক্ষোভ, নগরের পূর্বাংশে বছরব্যাপী অবরোধ– এ রকম নানা কিছুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে৷

আলেপ্পোপৃথিবীর প্রাচীনতম নগরগুলোর একটি৷ কিছুদিন আগেও এটি ছিল সিরিয়ার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র৷ সিরিয়ার লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আগে এটি আগলে রেখেছিল সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের বহু নিদর্শন৷ তবে বিদ্রোহী আর সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ের এক পর্যায়ে নগরটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়৷ দুইপক্ষ দুই অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়৷ সিরিয়ার এই সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে৷

ইরান ও রাশিয়ার সহায়তাপুষ্ট সরকারি বাহিনী গত বছরের শেষের দিকে নগরের পূর্বাংশে নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছে৷ মিরিয়াম লিখেছে, আলেপ্পো ছিলএকটা স্বর্গ৷ এটা ছিল আমাদের স্বর্গ৷'' এত সংঘাতের মাঝেও তার শিশুমনের বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে আঁকাআঁকি এবং গান৷ এসব নিয়ে বসলে তার সময় কেটে যায় বেশ৷ তবে এরপরও সে ভুলতে পারে না ২০১৩ সালের সেই অন্ধকার দিনটির কথা৷ যেদিন তাকে এবং তার পরিবারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল৷

সে লিখেছে, ‘‘আমি তাড়াহুড়া করে ব্যাগপ্যাকে আমার বইপত্র নিতে শুরু করি৷ আমি আমার বইগুলোকে খুবই ভালোবাসি৷ এগুলো ছাড়া আমি চলতে পারি না৷ ছররা গুলি থেকে বাঁচতে আমি দু'-দু'টো কোটও পরে নিই৷'' ‘‘রাস্তায় আরবীয় পোশাক কালো জেল্লাবা পরা এক ব্যক্তিকে দেখি৷ জঙ্গলের মতো দাড়িওয়ালা ওই লোকের হাতে একটা বন্দুক রয়েছে৷ আমি খুবই ভয় পেয়েছিলাম৷ এরপর ওইদিন একটি নিরাপদ স্থানে যেতে আমাদেরকে অনেকদূর হাঁটতে হয়েছে৷''

সেদিন পরিবারটি শহরের পশ্চিমাংশের সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পৌঁছায়৷ তবে সেখানকার জীবনও উগ্বেগহীন ছিল না৷বিদ্রোহীরা প্রায়ই এই এলাকা লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করতো৷ ‘‘সবচেয়ে ভয় পেয়েছিলাম মিসাইলে৷ এক সন্ধ্যায় আমি ঘুমাতে যাচ্ছি৷ হঠাৎ শুনি ভয়ঙ্কর এক আওয়াজ৷ কানে প্রায় তালা লেগে যাচ্ছিল৷ তাকিয়ে দেখি পুরো আকাশ যেন লাল হয়ে গেছে৷'' ‘‘আমরা যেখানে ছিলাম, তার পাশের রাস্তায় এসে সেই মিসাইল পড়ে৷''

মিরিয়াম বলেন, ‘‘মা-বাবা তখন আমাকে চিনি দেন৷ দিয়ে বলেন, ‘এটা খাও৷ এতে তোমার ভয় কমবে৷' কিন্তু ওই চিনি খাওয়ার পর আমি আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখিনি৷'' কিভাবে তাদের পরিবার প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়– সেই সব কথাও বলা আছে ডায়েরিতে৷ কষ্টের সেই দিনের কথা বলতে বলতে বর্ণনায় মজাও নিতে শুরু করে সে৷

মিরিয়াম বলে, ‘‘আমি আবার কাঁচের টুকরাকে ভয় পেতাম৷ আমাদের জানালা ছিল কাঁচের তৈরি৷ আমার কাছে মনে হতো, এই কাঁচ যে কোনো সময় ভেঙে আমার উপর পড়তে পারে৷ এ কারণে জানালায় ম্যাট্রেস ঝুলিয়ে রাখতাম৷'' হাসতে হাসতে সে বলে, ‘‘আমিতো খুব সুন্দর, আমি সেটা হারাতে চাইতাম না৷'' গত ডিসেম্বরে সর্বশেষ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করার পর পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক হয়৷ তবে এখনো বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ঠিক হয়নি৷

মিরিয়াম বলে, ‘‘মাথার উপর বোমা পড়তে পারে– এমন ভয় আর নেই৷ আমি আমার শৈশব ফিরে পেতে শুরু করেছি৷ প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে আমি আবার খেলতে শুরু করেছি৷'' এ কথা যখন বলছিলেন, তখন তার চোখ চকচক করছিল৷ আলেপ্পোর লড়াই শেষ হওয়ার পর তারা তাদের বাড়িতে কেবল একবার গিয়েছে৷

ডায়েরির বর্ণনায় উঠে আসে সে দিনের অনুভূতিও, ‘‘তখন মনে হচ্ছিল, যেন আমার হৃদপিণ্ডে প্রাণ ফিরে এসেছে৷ যদিও সেটা এখন কেবলই ধ্বংসাবশেষ৷ সেখাকার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে৷'' ‘‘কিন্তু সেখানকার মুহুর্তগুলো আমি মনে করতে পারি৷ সেটা নিয়ে ‘অতীত-সুখের' অনুভূতি কাজ করে৷ কিন্তু আমি সেখানে বাস করতে আর যাবো না৷''

চারিদিকে ধ্বংস আর তাণ্ডব দেখতে দেখতে বড় হওয়া এই মেয়েটি এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হতে চায়৷ কারণ, সে তারকারাজিকে ভালোবাসে৷ কে জানে হয়ত মাটির পৃথিবীর অশান্ত পরিস্থিতিই দূর আকাশের তারা প্রতি তার ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে৷ আকাশ ছোঁয়ার এই স্বপ্ন দেখার পরও সে কোনোদিনই তাঁর ডায়েরিকে ত্যাগ করেনি৷ সে বলে, এটা একটা অন্য রকম বিষয়৷ যদিও আমি নতুন করে জীবন শুরু করছি৷ তবে আমি আমার অতীতকে ভুলে যেতে চাই না৷ এমনকি গত রাতেও আমি আমার নোটবুকের উপর ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম৷

এসএন/ (এএফপি)

নির্বাচিত প্রতিবেদন