1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সিরিয়া

ডায়েরির পাতায় পাতায় সিরিয়া যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন

যে বয়সে শিশুরা মায়ের কোলে মাথা গুঁজে আদর-ভালোবাসা নেয়, হেসে-খেলে কেটে যায় সোনালী দিন, সেই বয়সেই মিরিয়াম রউইককে দেখতে হয়েছে কল্পনাতীত নিষ্ঠুরতা৷ সমসাময়িক পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ঘর-বাড়ি-চারপাশ ধ্বংস হতে দেখেছে সে৷

default

এক কিশোরীর ছবি

দিন রাত সময় কেটেছে আতঙ্কেই৷ তবে ভয়ে সে কুঁকড়ে যায়নি৷ বরং ভয়ের সেই সময়গুলোকে সে লিখে রেখেছে ডায়েরিতে৷ যেন যে কোনো সময়েই পাতা উল্টে তাকানো যায় অতীতে৷ এক সময়কার সিরিয়ার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র আলেপ্পো যখন জঙ্গিরা দখল করে নেয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর৷ তখন শিশুমনের স্মৃতির গাঁথুনিতে একে একে যোগ হয়েছে ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন৷ মিরিয়াম লিখেছে, ‘‘এক সকালে ভয়ঙ্কর আওয়াজে জেগে উঠি৷ মনে হচ্ছিল যেন সব চুরমার হয়ে যাচ্ছে৷ মানুষ ‘আল্লাহু আকবার' বলে চিৎকার দিচ্ছিল৷''

‘‘আমি প্রচণ্ড ভয় পাই৷ মনে হচ্ছিল, সবকিছু বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ তীব্র শক্তি দিয়ে আমি আমার পুতুলকে বুকে চেপে ধরি৷ তাকে বলতে থাকি, ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, আমি আছি তোমার সাথে৷''

এভাবে তার ডায়েরির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর সেই সব দিনের উপাখ্যান৷ মাতৃভাষা আরবিতে লেখা সেই ডায়েরির সন্ধান পান একজন ফরাসি সাংবাদিক৷ বার্তা সংস্থা এএফপি তা প্রকাশ করে৷

ডায়েরি জুড়ে রয়েছে এক কর্মজীবী খ্রিষ্টান পরিবারের গল্প৷ নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিচিত জগত ছেড়ে যাওয়ার গল্প৷ কিভাবে জঙ্গিরা ওই এলাকায় আসে, কিভাবে তাদেরকে পরিচিত এই জগৎ ছাড়ার নির্দেশ দেয়, আর তারাও সেটা মানতে বাধ্য হয়– এসবের বর্ণনা৷ ৮ বছর বয়সে আলেপ্পোর পতন দেখা মিরিয়ামের বয়স এখন ১৩ বছর৷

সম্প্রতি এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সে বলে, ‘‘যুদ্ধ যখন একটা বিরতি নেয়, তখন মা আমাকে ডায়েরি লিখতে উৎসাহ জোগান৷ আমি ভাবি, হ্যাঁ, আমার ডায়েরি লেখা উচিত, কারণ, এর মাধ্যমেই একদিন আমি স্মরণ করতে পারবো–কী হয়েছিল এই সময়ে৷''

ফরাসি এক সাংবাদিক মিরিয়াম ও তার ডায়েরির কথা জানতে পারেন৷ তিনি বুঝতে পারেন, এই ডায়েরি যুদ্ধকে ভেতর থেকে দেখার একটা দরজা খুলে দিতে পারে৷ ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্য ন্ত সময়ে এই ডায়েরি লেখা হয়৷ যুদ্ধ হোক আর শান্তি হোক, শিশুর বড় হওয়া তো আর থেমে থাকে না৷ লড়াই-সংঘাতের মাঝেই বড় হচ্ছিল মিরিয়াম৷ ডায়েরিতে তাই বড় হওয়ার নানা ধাপের যেন ধারাবিবরণী দিয়েছে মেয়েটি৷ আলেপ্পোর দেয়ালে দেয়ালে সে দেখেছে বিপ্লবী স্লোগান৷ সরকার বিরোধী বিক্ষোভ, নগরের পূর্বাংশে বছরব্যাপী অবরোধ– এ রকম নানা কিছুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে৷

আলেপ্পোপৃথিবীর প্রাচীনতম নগরগুলোর একটি৷ কিছুদিন আগেও এটি ছিল সিরিয়ার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র৷ সিরিয়ার লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আগে এটি আগলে রেখেছিল সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের বহু নিদর্শন৷ তবে বিদ্রোহী আর সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ের এক পর্যায়ে নগরটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়৷ দুইপক্ষ দুই অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়৷ সিরিয়ার এই সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে৷

ইরান ও রাশিয়ার সহায়তাপুষ্ট সরকারি বাহিনী গত বছরের শেষের দিকে নগরের পূর্বাংশে নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছে৷ মিরিয়াম লিখেছে, আলেপ্পো ছিলএকটা স্বর্গ৷ এটা ছিল আমাদের স্বর্গ৷'' এত সংঘাতের মাঝেও তার শিশুমনের বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে আঁকাআঁকি এবং গান৷ এসব নিয়ে বসলে তার সময় কেটে যায় বেশ৷ তবে এরপরও সে ভুলতে পারে না ২০১৩ সালের সেই অন্ধকার দিনটির কথা৷ যেদিন তাকে এবং তার পরিবারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল৷

সে লিখেছে, ‘‘আমি তাড়াহুড়া করে ব্যাগপ্যাকে আমার বইপত্র নিতে শুরু করি৷ আমি আমার বইগুলোকে খুবই ভালোবাসি৷ এগুলো ছাড়া আমি চলতে পারি না৷ ছররা গুলি থেকে বাঁচতে আমি দু'-দু'টো কোটও পরে নিই৷'' ‘‘রাস্তায় আরবীয় পোশাক কালো জেল্লাবা পরা এক ব্যক্তিকে দেখি৷ জঙ্গলের মতো দাড়িওয়ালা ওই লোকের হাতে একটা বন্দুক রয়েছে৷ আমি খুবই ভয় পেয়েছিলাম৷ এরপর ওইদিন একটি নিরাপদ স্থানে যেতে আমাদেরকে অনেকদূর হাঁটতে হয়েছে৷''

সেদিন পরিবারটি শহরের পশ্চিমাংশের সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পৌঁছায়৷ তবে সেখানকার জীবনও উগ্বেগহীন ছিল না৷বিদ্রোহীরা প্রায়ই এই এলাকা লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করতো৷ ‘‘সবচেয়ে ভয় পেয়েছিলাম মিসাইলে৷ এক সন্ধ্যায় আমি ঘুমাতে যাচ্ছি৷ হঠাৎ শুনি ভয়ঙ্কর এক আওয়াজ৷ কানে প্রায় তালা লেগে যাচ্ছিল৷ তাকিয়ে দেখি পুরো আকাশ যেন লাল হয়ে গেছে৷'' ‘‘আমরা যেখানে ছিলাম, তার পাশের রাস্তায় এসে সেই মিসাইল পড়ে৷''

মিরিয়াম বলেন, ‘‘মা-বাবা তখন আমাকে চিনি দেন৷ দিয়ে বলেন, ‘এটা খাও৷ এতে তোমার ভয় কমবে৷' কিন্তু ওই চিনি খাওয়ার পর আমি আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখিনি৷'' কিভাবে তাদের পরিবার প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়– সেই সব কথাও বলা আছে ডায়েরিতে৷ কষ্টের সেই দিনের কথা বলতে বলতে বর্ণনায় মজাও নিতে শুরু করে সে৷

মিরিয়াম বলে, ‘‘আমি আবার কাঁচের টুকরাকে ভয় পেতাম৷ আমাদের জানালা ছিল কাঁচের তৈরি৷ আমার কাছে মনে হতো, এই কাঁচ যে কোনো সময় ভেঙে আমার উপর পড়তে পারে৷ এ কারণে জানালায় ম্যাট্রেস ঝুলিয়ে রাখতাম৷'' হাসতে হাসতে সে বলে, ‘‘আমিতো খুব সুন্দর, আমি সেটা হারাতে চাইতাম না৷'' গত ডিসেম্বরে সর্বশেষ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করার পর পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক হয়৷ তবে এখনো বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ঠিক হয়নি৷

মিরিয়াম বলে, ‘‘মাথার উপর বোমা পড়তে পারে– এমন ভয় আর নেই৷ আমি আমার শৈশব ফিরে পেতে শুরু করেছি৷ প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে আমি আবার খেলতে শুরু করেছি৷'' এ কথা যখন বলছিলেন, তখন তার চোখ চকচক করছিল৷ আলেপ্পোর লড়াই শেষ হওয়ার পর তারা তাদের বাড়িতে কেবল একবার গিয়েছে৷

ডায়েরির বর্ণনায় উঠে আসে সে দিনের অনুভূতিও, ‘‘তখন মনে হচ্ছিল, যেন আমার হৃদপিণ্ডে প্রাণ ফিরে এসেছে৷ যদিও সেটা এখন কেবলই ধ্বংসাবশেষ৷ সেখাকার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে৷'' ‘‘কিন্তু সেখানকার মুহুর্তগুলো আমি মনে করতে পারি৷ সেটা নিয়ে ‘অতীত-সুখের' অনুভূতি কাজ করে৷ কিন্তু আমি সেখানে বাস করতে আর যাবো না৷''

চারিদিকে ধ্বংস আর তাণ্ডব দেখতে দেখতে বড় হওয়া এই মেয়েটি এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হতে চায়৷ কারণ, সে তারকারাজিকে ভালোবাসে৷ কে জানে হয়ত মাটির পৃথিবীর অশান্ত পরিস্থিতিই দূর আকাশের তারা প্রতি তার ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে৷ আকাশ ছোঁয়ার এই স্বপ্ন দেখার পরও সে কোনোদিনই তাঁর ডায়েরিকে ত্যাগ করেনি৷ সে বলে, এটা একটা অন্য রকম বিষয়৷ যদিও আমি নতুন করে জীবন শুরু করছি৷ তবে আমি আমার অতীতকে ভুলে যেতে চাই না৷ এমনকি গত রাতেও আমি আমার নোটবুকের উপর ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম৷

এসএন/ (এএফপি)

নির্বাচিত প্রতিবেদন