1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

ডাইনি অপবাদ মোকাবিলায় বেকায়দায় ভারত

ডাইনি অপবাদ দিয়ে সম্প্রতি এক নারীর শিরশ্ছেদের ঘটনা আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে, ভারতের কিছু এলাকায় মেয়েদের ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত্যার কুপ্রথা এখনও রয়ে গেছে৷ এর আসল কারণ জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য ও প্রতিশোধস্পৃহা৷

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ডাইনি প্রতিরোধক বিশেষ আইন থাকা সত্ত্বেও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামে গত ২০শে জুলাই ৬৩ বছরের এক ও বৃদ্ধা পাঁচ সন্তানের মা পনি ওরাংকে ডাইনি সন্দেহে হত্যা করা হয়৷ মধ্য রাতে গ্রামের শ-দেড়েক লোক পনি ওরাং-এর বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে নির্যাতনের পর, ধারালো অস্র দিয়ে গলা কেটে খুন করে৷ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তার মধ্যে ন'জন নারী৷ গ্রামের কিছু লোক অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রামের ওঝা বিধান দেন যে, ঐ ডাইনি নারীর কুদৃষ্টিতেই নাকি অসুখ ছড়িয়েছে৷

দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের অপরাধ ভারতের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে দৈন্য কবলিত উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যেই বেশি হয়৷ এর কারণ, এরা ডাইনিবিদ্যায় বিশ্বাস করে৷ আর এই অন্ধ বিশ্বাস বেড়েই চলেছে, যার বেশিরভাগ শিকার নারী৷ গালিগালাজ, নির্যাতনের পর কখনও কখনও খুনও করা হয় এ সব নারীদের, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে৷

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং ডয়চে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ধরণের হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কুসংস্কার হলেও অপরাধটা করা হয় সাধারণত জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য এবং প্রতিশোধস্পৃহা থেকে৷

Symbolbild Asien Frauen Gewalt

ডাইনি নারীর কুদৃষ্টিতে নাকি অসুখ ছড়ায়!

ডয়চে ভেলে: সত্যিই কি ভারতের গ্রামাঞ্চলে ডাইনিবিদ্যা আছে?

ভারতে এখনও বহু মানুষ আছেন যাঁরা ডাইনিবিদ্যায় বিশ্বাস করেন৷ যদিও আমার স্থির বিশ্বাস, ডাইনি বলে কিছু হয় না৷ তা সত্ত্বেও এই বিশ্বাসের শিকার হন নারীরাই বেশি৷ প্রথমে নির্যাতন, হিংসা এবং তারপর খুন৷ প্রচলিত গ্রাম্যপ্রবাদ, ডাইনিদের নাকি জন্মগত এক ম্যাজিক বা জাদুশক্তি থাকে৷ সংবাদপত্রের খবরে বলা হচ্ছে, লোকেরা তাই রোগ-ব্যাধির চিকিৎসায় ওদের কাছেই যায়৷ প্রসঙ্গত আশারাম বাপুর নাম উঠতেই পারে৷ তাঁর ভক্তরা গুরুর আশ্চর্য্য জাদুশক্তিতে বিশ্বাস করে চিকিৎসার জন্য তাঁর কাছেই ছুটে যায়৷ এখন অবশ্য তিনি চিকিৎসার নামে এক নাবালিকাকে যৌন নিগ্রহের দায়ে বিচারাধীন আছেন৷

ডাইনি অপবাদে পুরুষ বা নারীদের নির্যাতন ও খুন করার ঘটনার ছবিটা কেমন?

ভারত সরকারের সাম্প্রতিকতম হিসেব বলছে, ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ডাইনি অপবাদে খুন হয়েছেন ২,১০০ জন, যাঁদের বেশিরভাগই নারী৷ তবে ভারতের সর্বত্র এমনটা হয় না৷ কয়েকটি রাজ্যের উপজাতি অঞ্চলেই সাধারণত এটা হয়ে থাকে৷ ২০০২ সালে আসামে ডাইনি অপবাদে খুন হন ১৩০ জন, যাঁদেরও বেশিরভাগই ছিলেন নারী৷ পূর্ব ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ডাইনিকাণ্ড নাম দিয়ে ‘বিচার' হয় ১৫০০ জনের৷ ঐ সব ঘটনায় খুন হন ২১০ জন৷ পূর্ব ভারতের ওড়িষা রাজ্যে মাওবাদী এলাকায় ডাইনিবিদ্যার প্রচণ্ড প্রভাব, যদিও ঐ সব এলাকা অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং অনুপজাতি প্রধান৷ এছাড়া অন্য সব রাজ্যের মধ্যে ঝাড়খন্ড, হরিয়ানা ও কর্নাটকে ডাইনিবিদ্যার কুসংস্কার রয়েছে৷ এই তথ্য জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর৷

Indira Jaising

ইন্দিরা জয়সিং ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একজন আইন বিশেষজ্ঞ...

নারীরাই কেন এর শিকার বেশি হন?

দুর্ভিক্ষ, খরা, গ্রামের কুঁয়োতে জল শুকিয়ে যাওয়া – সব কিছুর জন্যই বলির পাঁঠা করা হয় মেয়েদের৷ পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবই এর প্রধান কারণ৷ এছাড়াও অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে মেয়েদের জমিজমা, বিষয়-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা৷ কখনও কখনও দেখা গেছে, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে এবং অপেক্ষাকৃত সচ্ছল এলাকাগুলিতেও এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়৷ এখানেই শেষ নয়, মানসিক স্বাস্থ্য বা হরমোনজনিত কারণে মেয়েদের হাবভাব বা চালচলনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে সেটাকেও ডাইনির লক্ষণ বলে মনে করা হয় ভারতে৷ আর তখন পরিবারের লোকেরা চিকিৎসার জন্য মেয়েদের নিয়ে যায় কাছের হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে৷ সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা সুলভ না হলে এটা চলতে থাকবেই৷ বলা বাহুল্য, এর মধ্যে সমাজের জাতপাতের ব্যাপারও আছে৷ উঁচুজাতের লোকেরা ডাইনি নাম দাগিয়ে পায়ের নীচে রাখতে চায় নীচুজাতকে৷

ডাইনি প্রতিরোধক আইন ঠিকমত কার্যকর হচ্ছে না কেন?

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের আইন বিভিন্ন রকমের৷ সমস্যাটা হচ্ছে এর যথাযথ রূপায়ন নিয়ে৷ এই যেমন আসামে ২০০৮ সাল থেকে ১৫ শতাংশ মামলার কোনো সুরাহা হয়নি৷ পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি৷ এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেই৷

এক্ষেত্রে করণীয় কী?

বিভিন্ন ধরণের নারী নির্যাতনের মধ্যে ডাইনি অপবাদ অন্যতম৷ তাই অসাম্য ও লিঙ্গবৈষম্যের মানসিকতা দূর করতে সচেতনতা অভিযান শুরু করতে হবে একেবারে তৃণমূলস্তর থেকে৷ প্রণয়ন করতে হবে উপযুক্ত নীতি৷ একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে সরকার ও নাগরিক সমাজকে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে৷ এটা সম্ভব হতে পারে তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে৷ এক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ৷ ডাইনি প্রথা প্রতিরোধে গড়ে তুলতে হবে কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠন৷ সংস্থান রাখতে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের৷ মিলন ঘটাতে হবে দুর্গত এবং দুর্গতদের পরিবারের মধ্যেও৷

ইন্দিরা জয়সিং ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একজন আইন বিশেষজ্ঞ এবং ভারত-ভিত্তিক এনজিও ‘ল'ইয়ার কালেক্টিভ' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা৷ এই সংগঠন মানবাধিকার প্রসারে সক্রিয়৷ ইন্দিরা জয়সিং ভারতের প্রথম মহিলা অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেলও৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন