1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

ঝরে পড়লো ‘মাদিবা' নামের নক্ষত্রটি...

ইতিহাসের সাক্ষী আমরা সকলেই৷ কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেরাই ইতিহাস সৃষ্টি করেন৷ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমনই এক কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা৷ ৫ই ডিসেম্বর, জোহানেসবার্গে নিজ বাসভবনে রাত সাড়ে আটটায় তাঁর মৃত্যু হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জেকব জুমা গভীর রাতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন – এমন ঘোষণার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল দুঃসংবাদের আশঙ্কা৷ স্থির কণ্ঠে তিনি গোটা বিশ্বের সামনে ম্যান্ডেলার মৃত্যুর খবর জানালেন৷ দীর্ঘদিনের অসুস্থতার ফলে এই দুঃসংবাদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা সহ গোটা বিশ্ব প্রস্তুত থাকলেও এই মুহূর্ত কারো কাছেই কাম্য ছিল না৷

সভ্যতার দোহাই দিয়ে শেতাঙ্গরা একসময় যখন বর্ণবাদের ঘূর্ণাবর্তে বিলীন করে চলেছিল মানবতাবাদকে, ঠিক তখনই সব শক্তি নিয়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষুদ্রাকায় এই মানুষটি৷

Muhammad Yunus und Nelson Mandela

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ম্যান্ডেলা

প্রতিবাদের ভাষা তাঁর জানা ছিল৷ বুঝেছিলেন, শক্ত হাতেই ধরতে হবে হাল, উঁচুতে তুলতে হবে ঝান্ডা৷ তাই শেষ পর্যন্ত আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস নামের সশস্ত্র দলটির নেতৃত্ব উঠে আসে তাঁরই হাতে৷ অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেইন শহরে গঠিত হওয়ার সময় এ দলের নাম ছিল ‘সাউথ আফ্রিকান নেটিভ ন্যাশনাল কংগ্রেস'৷ পরে ১৯২৩ সালে নতুন নামে আবির্ভূত হয় দলটি৷ ম্যান্ডেলা দলের সর্বশক্তি ব্যবহার করেন বর্ণবৈষম্য, বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে৷ না, পথ মসৃণ ছিল না, ছিল বন্ধুর৷ এমনকি, ১৯৬২ সালে নাশকতার অভিযোগ তুলে তাঁকে পুরে দেয়া হয় কারাগারে, দির্ঘায়িত হতে হতে শেষ পর্যন্ত একটানা ২৭ বছরের কারাবাস৷

১৯৯০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান মানবাধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত এই নেতা৷ ততদিনে বিশ্বসভায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় আসন করে নিয়েছেন নিজের দেশে ‘মাদিবা' নামে পরিচিত ম্যান্ডেলা৷ দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন, জয় হয়েছিল তাঁর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনেরই৷ সুবাদে দক্ষিণ আফ্রিকা পেয়েছে রাজনীতির এক নতুন ধারা, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুবর্ণের গণতন্ত্র৷

Nelson Mandela tot

গোটা বিশ্ব প্রস্তুত থাকলেও এই দুঃসংবাদ কারো কাছেই কাম্য ছিল না

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ – এই পাঁচটি বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ম্যান্ডেলা চেষ্টা করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে গড়ে তুলতে৷ তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ক্ষমতায় আসীন এএনসি৷ ঘৃণা, বিদ্বেষ, প্রতিশোধস্পৃহা নয় – গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অটুট বিশ্বাস ও প্রখর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজে বিভাজন অনেকটাই দূর করেন ম্যান্ডেলা৷ আর ইতিহাসের এমনই দিকপরিবর্তন যে, এক সময় নাশকতার মিথ্যা অভিযোগে যাঁকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল, সেই নেলসন ম্যান্ডেলাকেই ভূষিত করা হয় নোবেল শান্তি পুরস্কারে৷

ব্যক্তিগত জীবন

নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম ১৯১৮ সালের ১৮ই জুলাই, দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বু রাজবংশে৷ ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর, তিনি চলে আসেন জোহানেসবার্গে৷ দারিদ্র্যের কারণে ম্যান্ডেলাকে কখনও কাজ করতে হয়েছে খনিতে, কখনও বা ‘ল ফার্মে'৷ ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে হয়েছে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে, পরে অবশ্য তিনি আইন পড়েছেন আলেক্সান্দ্রায়৷ ১৯৪৩ সালে যুক্ত হন এএনসির সঙ্গে৷

প্রথম স্ত্রী এভিলিন কোটো মাস৷ কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় ১৯৫৭ সালে৷ এরপর উইনি ম্যান্ডেলার সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন৷ সেই সময়েই ম্যান্ডেলার বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বিপ্লব, জেল খাটা, একের পর এক রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সেইসঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম আর বিপ্লবে নেতৃত্ব৷ সে কাজে উইনি ছিলেন তাঁর সত্যিকারের সঙ্গিনী৷

তারপরও ‘মাদিবা'র ব্যক্তিগত জীবন স্থায়ী ছিল না, ছিল না শান্তির৷ নিজের মা, দুই ছেলে, এমনকি নাতনির মৃত্যুও তাঁকে দেখতে হয়েছে৷ বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বহু দিনের সাথী উইনির সঙ্গে৷ কিন্তু হাল ছাড়েননি ন্যান্ডেলা৷ আবারো সংসার পেতেছেন৷ বিয়ে করেছেন গ্রাসা মাচেলকে৷

শারীরিক অসুস্থতা

ম্যান্ডেলার শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে তো বটেই, গোটা বিশ্বকেই বারবার উদ্বিগ্ন করে তুলেছে৷ প্রথমে প্রস্টেট ক্যান্সার, তারপর ফুসফুসে সংক্রমণ আর তার সঙ্গে বয়সজনিত কারণে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন তিনি৷ ২৭ বছর কারাবাসের মধ্যে প্রায় ১৮ বছর তাঁকে বন্দি রাখা হয়েছিল রবেন আইল্যান্ডে, সেখানে প্রতিকূল আবহাওয়ায় তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল যক্ষা৷ শেষ পর্যন্ত সেই যক্ষাই তাঁর শ্বাসযন্ত্রের চিরস্থায়ী ক্ষতি করে দিয়েছে, নিয়েছে প্রাণ৷

আজ তিনি নেই৷ অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর অবদান এনে দিয়েছে এমন যুগান্তকারী এক পরিবর্তন, যার প্রভাব গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে৷ জীবনের ৬৭ বছর তিনি উৎসর্গ করেছিলেন রাজনীতির কাজে, তাই নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ৷ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের কথায়, ‘‘ম্যান্ডেলার কাহিনির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অসাধারণ শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত৷''

গোটা বিশ্বের সব স্তরের মানুষের কাছে তাই তো তিনি মহান এক নায়ক৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন