1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

জনমতকে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টায় সরকার

জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, দমন-পীড়ন ছাড়া উপায় থাকে না৷ আর এই দমন-পীড়ন শুরু হয় মূলত বিরোধীদলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর৷ তারপর তা সমাজের অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার মানুষের উপর প্রয়োগ হতে থাকে৷

Bangladesch Generalstreik 18.12.2012

প্রতীকী ছবি

এমন অনাচারের ফলে সমাজে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়৷ বেড়ে যায় গুম ও খুনের ঘটনা৷ সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, এই গুম-খুনের অভিযোগ উঠতে থাকে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে৷ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, দলের অঙ্গ সংগঠন, ছাত্র সংগঠন নানা রকমের অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে৷ অন্যদিকে দমন-নিপীড়নে বিরোধীদল দূর্বল হয়ে পড়ায়, এ সবের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ থাকে না৷ সামগ্রিকভাবে দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু থাকে না৷ জনমানুষের জীবন হয়ে পড়ে চরম নিরাপত্তাহীন৷ ক্ষমতাসীনদের আচার-আচরণ-দাম্ভিকতায় মানুষ অতীষ্ট হয়ে ওঠে৷ কিছু অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা বলে ক্ষমতাসীনরা তাঁদের যাবতীয় অপরাধ আড়াল করতে চান৷

গত সাত-আট বছরে মোটামোটিভাবে বাংলাদেশে এমনই একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে৷ এমন অবস্থায় সাধারণত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সমাজের অগ্রসর মানুষেরা৷ এর মধ্যে লেখক-শিল্পী-শিক্ষক-সাংবাদিক – অনেকেই থাকেন৷ তবে গণমাধ্যমই এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিক সমাজের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে৷

নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার মোক্ষম পন্থা

দমনে-নিপীড়নে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর, সরকারের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই নাগরিক সমাজ৷ তাঁরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন৷ যেহেতু নাগরিক সমাজ বিবেকবান মানুষ হিসেবে পরিচিত থাকেন, সেহেতু তাঁদের প্রতিবাদের প্রভাব মানুষের উপর পড়ে৷ মানুষ সাহসী হয়ে উঠতে থাকে৷

বাংলাদেশে বর্তমানে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই৷ দমনে-পীড়নে বিএনপি ছন্নছাড়া৷ এরশাদের জাতীয় পার্টি কোনো দলের পর্যায়েই পড়ে না৷ এদের ‘তোষামোদী দল' বলা যেতে পারে৷ তাছাড়া সরকারের নেতিবাচক, খারাপ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কোনো প্রতিবাদ নেই৷ প্রতিবাদ একমাত্র আসছিল নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে৷ বিশেষ করে সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাংবাদিক, তথা গণমাধ্যম৷ এর মধ্যে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল টেলিভিশনের রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘টকশো'৷

তাই বিরোধী দল নিয়ন্ত্রণের পর, সরকারের দায়িত্ব হয়ে পড়ে গণমাধ্যম তথা নাগরিক সমাজ নিয়ন্ত্রণ, টকশো নিয়ন্ত্রণ৷ সরকার মনে করে, নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার এটাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা৷

বর্তমানে দেশে প্রতিটি মানুষের জীবনই নিরাপত্তাহীন৷ আর গণমাধ্যম কর্মীদের জীবন আরও বেশি নিরাপত্তাহীন৷ একের পর এক ব্লগারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই নিরাপত্তাহীনতার কিছুটা প্রকাশ দেখা গেছে৷ বাস্তবে গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর৷ ব্লগারদের উপর ক্ষিপ্ত সমাজের ছোট ধর্মীয় উন্মাদ একটি অংশ৷ সত্যি কথা বলতে কি, গণমাধ্যম কর্মীদের উপর এই ধর্মীয় উন্মাদরা তো ক্ষিপ্তই, তার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত সরকার, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী৷ ফলে তাদের বিপদ বহুবিধ৷ ব্লগার, প্রকাশকদের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার অন্যদের ভয় দেখাতে চেয়েছে যে, পরিণতি এমন হলে কিছু করার থাকবে না৷

এর সঙ্গে সাংবাদিক, সম্পাদকদের হত্যার হুমকি, গুমের হুমকি-প্রচেষ্টা তো আছেই৷ ফলে কিছু গণমাধ্যম কর্মী অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছেন৷ গণমাধ্যম মালিকদের যেহেতু আরও অন্য ব্যবসা আছে, ফলে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে-হচ্ছে ভিন্ন পন্থায়৷ কাউকে কাউকে অন্য ব্যবসায় সুবিধা দেয়া হয়েছে-হচ্ছে৷ আবার কারো অন্য ব্যবসায় সমস্যা তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে-হচ্ছে৷ যে সব গণমাধ্যম কর্মী এত প্রতিকৃলতার মধ্যেও সত্য লিখছিলেন, সত্য বলছিলেন, তাঁদেরও নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে নানা পন্থা অবলম্বণ করা হচ্ছে৷ এছাড়া দলীয় মাস্তানদের দিয়ে অনেকের চরিত্রহনন করানো হচ্ছে, মৌখিকভাবে মালিকদের চাপ দিয়ে টকশোতে অনেককে নিষিদ্ধ করানো হয়েছে, অনেকের লেখা পত্রিকাগুলো ছাপাও হচ্ছে না৷ এমনকি বিপদে পড়ার ভয়ে অনেক পত্রিকা নিজেরাই ‘সেন্সর' করছে৷ প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের বিজ্ঞাপণ বন্ধ করিয়ে দিয়ে অন্যদের ভয় দেখানো গেছে৷ এখানেই শেষ নয়৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এক ধরণের ভিতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে৷ তারপরও পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না৷ সরকার অবশ্য নানা উপায়ে এই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা অব্যহত রেখেছে৷

ঘুস দিয়ে অথবা ভয়-ভিতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

লেখক-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে স্বৈরশাসকরা দু'টি উপায় অবলম্বন করে থাকে৷ এক. সুযোগ-সুবিধা, অর্থ-সম্পদ দিয়ে৷ দুই. ভয় দেখিয়ে৷ অর্থ-সম্পদ দিয়ে নাগরিক সমাজের অনেককে পক্ষে নেয়ার প্রবণতা আইয়ুব খানের সময় থেকে দেখা গেছে৷ বাংলাদেশে সামরিক শাসক জিয়াউর রাহমানও নাগরিক সমাজের অনেককে পদ-পদবি দিয়ে পক্ষে নিয়েছিলেন৷ তবে নাগরিক সমাজের বড় একটি অংশের চরিত্র দুষিত করে দিয়েছেন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ৷ মন্ত্রীত্ব, পদ-পদবি, ঢাকায় প্লট বাঅর্থ দিয়ে নাগরিক সমাজের অনেককে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এরশাদ৷ যাঁদের নিতে পারেননি, তাঁদের উপর জুলুম-নির্যাতন করেছেন৷

Bangladesh Journalist Golam Mortoza

গোলাম মোর্তজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

বর্তমানে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বা পাবেন এই লোভে নাগরিক সমাজের বড় একটি অংশ সরকারের দুর্নীতি-অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ড সমর্থন করছেন৷ যাঁরা এখনও সত্য কথা বলছেন, লিখছেন, তাঁদের নানা রকমের ভয়-ভিতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে৷ কেউ একজন নিজে ভয় না পেলে, সন্তানদের কথা বলে ভয় দেখানো হচ্ছে৷ দেশে যেহেতু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে কিছু নেই, নেই আইনের শাসন, বিপদে পড়লে আশ্রয়ের জায়গাও নেই, সেহেতু অনেকে নিজে থেকেও সতর্ক হয়ে গেছেন৷ হিসেব করে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন৷ চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখছেন, কিন্তু বলছেন না, প্রতিবাদ করছেন না৷ আর যিনি বলতে চান, তাঁকে বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না৷ পত্রিকাগুলিও তাঁর লেখা ছাপতে অপারগতা প্রকাশ করছে৷

লোভি-নীতিভ্রষ্ঠ একদল তোষামোদকারী ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে শুরু করে, গুম-খুন, সন্ত্রাস, ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুট – এ সব অপকর্মকে ভালো কর্ম বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন৷ সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত খারাপ সময় অতিক্রম করছে৷

বন্ধুরা, গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে আপনি কী একমত? আমাদের লিখে জানান নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন