1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

চোরাচালানির ক্ষতি, চিড়িয়াখানার লাভ

চোরাপথে পাচার হচ্ছিল তিনটি বাচ্চা শিম্পাঞ্জি, পাঁচটি বিরল প্রজাতির মার্মোসেট বানর৷ উদ্ধার হওয়ার পর তাদের রাখা হতে পারে কলকাতা চিড়িয়াখানায়৷

সুদূর জার্মানি থেকে কলকাতার চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়েছিল ওদের৷ সেটা ১৯৮৯ সাল, ওদের দু'জনের বয়স তখন মোটে পাঁচ৷ ওদের নামকরণ হয়েছিল বাবু এবং রানি৷ কলকাতা চিড়িয়াখানার দর্শকদের অতিপ্রিয় শিম্পাঞ্জি দম্পতি৷ ওদের নানা কাণ্ডকারখানা ২২ বছর ধরে মাতিয়ে রেখেছিল সবাইকে৷ দু'জনের মধ্যে রানি তাও একটু সভ্যভদ্র ছিল, হয়ত মহিলা বলেই! কিন্তু বাবুর নাচনকোঁদন ছিল দেখার মতো৷ দর্শকদের ছুঁড়ে দেওয়া রোদচশমা চোখে পরে হাসিমুখে বাবুকে ক্যামেরার সামনে ‘পোজ' দিতে দেখা গিয়েছে বহুবার৷ শহরে শীত এসেছে, খবরের কাগজের ফটোগ্রাফার বা টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা পার্সনরা চিড়িয়াখানার ছবি তুলে এনেছেন অথচ তার মধ্যে বাবুর ছবি নেই, এমন বোধহয় কখনও হয়নি৷

সেই আমোদপ্রিয় বাবুই গত তিন বছর ধরে ভয়ঙ্কর মনমরা৷ দর্শকদের সামনে আসতেই চায় না৷ নির্জনে মুখ গোঁজ করে বসে থাকে৷ কারণ বাবু এখন সাথিহারা৷ বছর তিনেক আগে ফুসফুসের সংক্রমণে মারা গিয়েছে রানি৷ সেই সময় বাবুকে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়েছিল চিড়িয়াখানার কর্মীদের পক্ষে৷ প্রথমত ভয়ঙ্কর বদমেজাজি এবং মারমুখী হয়ে উঠেছিল বাবু৷ তেড়ে কামড়াতে যেত দর্শক, এমনকি তার নিয়মিত দেখভাল করত যারা, সেই কর্মীদেরও৷ তখন বাধ্য হয়েই খাঁচায় আটকে রাখা হয়েছিল বাবুকে৷ তখন বাবু খালি খাঁচার গরাদে মাথা ঠুকত, চিৎকার করত, অথবা চুপচাপ বসে কাঁদত৷ শিম্পাঞ্জি যে নিজের মৃত সঙ্গীর শোকে এমন পাগল হতে পারে, না দেখলে বিঃশ্বাস করা সত্যিই শক্ত ছিল৷

সেই তখন থেকেই বাবুর একজন মানাসই সঙ্গীর খোঁজে উদ্যোগী হয়েছিল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ৷ কিন্তু কাজটা নেহাত সহজ ছিল না৷ কারণ, প্রথমত শিম্পাঞ্জিরা বন্দি দশাতেও জোড়েই থাকে৷ এক যদি না কোনো শিম্পাঞ্জির পুরুষ সঙ্গী মারা গিয়ে থাকে, হঠাৎ করে একটি জোড়বিহীন মেয়ে শিম্পাঞ্জি পাওয়াও শক্ত৷ তা ছাড়া বাবুর বয়স এখন প্রায় ২৭৷ শিম্পাঞ্জি বাঁচে ৩৫ থেকে ৪০ বছর৷ কাজেই বাবুর জন্যে যদি কমবয়সি একটা মেয়ে শিম্পাঞ্জি জোগাড়ও করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে বাবু মারা গেলে তারও একলা হয়ে পড়ার সম্ভাবনা৷ তা ছাড়া দীর্ঘ ২২ বছর রানির সঙ্গে থাকতে অভ্যস্ত বাবু আদৌ সেই নতুন মেয়ে শিম্পাঞ্জিকে নিজের খাঁচায় মেনে নেবে কিনা, সংশয় ছিল সেই নিয়েও৷ তাই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এমনও ভাবছিলেন যে, দেশ বা বিদেশের অন্য কোনও চিড়িয়াখানা থেকে যদি এক জোড়া শিম্পাঞ্জি পাওয়া যায়, অন্য কোনো প্রাণীর বিনিময়ে৷ যেমন জিরাফ এখন বাড়তি হয়েছে কলকাতার চিড়িয়াখানায়৷ জার্মানির কোলন শহরের চিড়িয়াখানা থেকে ওই ১৯৮৯ সালেই যে একজোড়া জিরাফ আনা হয়েছিল, তাদের নাতি-পুতিরা এখন সংখ্যায় অনেক৷ কাজেই জিরাফ দিয়ে শিম্পাঞ্জি পাওয়া যায় কিনা, সেই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন চিড়িয়াখানায়৷

এই অবস্থায় হঠাৎই প্রায় কোলে এসে পড়ল একেবারে তিন তিনটে শিম্পাঞ্জির বাচ্চা৷ একটি মেয়ে এবং দুটি ছেলে৷ দক্ষিণ ভারতের কোনো এক বিত্তবান লোকের বাড়ির ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার জন্য আফ্রিকা থেকে চোরাপথে পাচার করা হচ্ছিল তাদের৷ সঙ্গে পাঁচটি বিরল প্রজাতির মার্মোসেট বানর, পাঁচটি ম্যাকাও, ছটি কাকাতুয়া এবং চারটি ধূসর টিয়া৷ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বন দপ্তরের কর্মীরা কলকাতার পূর্ব শহরতলীর বাগুইআটি অঞ্চলের এক পাখি ব্যবসায়ীর বাড়িতে হানা দিয়ে প্রাণিগুলিকে উদ্ধার করেন৷ তদন্তে জানা গিয়েছে, মধ্য আফ্রিকা থেকে প্রথমে বিমানে হংকং, সেখান থেকে ফের বিমানে ঢাকা, তার পর বাংলাদেশ থেকে সড়কপথে বনগাঁ সীমান্ত পার হয়ে এগুলিকে কদিনের জন্য আনা হয়েছিল কলকাতায়৷ এখান থেকেই এরা পাড়ি দিত দক্ষিণ ভারত৷

কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রাণীগুলির কোনো যত্ন নেওয়া হয়নি৷ ফলে সবকটিই প্রায় অভুক্ত এবং অসুস্থ ছিল৷ শিম্পাঞ্জির বাচ্চা তিনটির মধ্যে মেয়েটির গায়ে জ্বর ছিল৷ অন্য দুটি খাঁচার মধ্যে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে কাঁপছিল৷ উদ্ধার হওয়ার পরও অবশ্য শুল্ক দপ্তর আর বন দপ্তরের অধিকারগত কাজিয়া এবং সরকারি নিয়মনীতির ফাঁসে পড়ে প্রাণীগুলির নাভিশ্বাস উঠেছিল৷ তবে শেষপর্যন্ত ওদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে চিড়িয়াখানায় এবং চিকিৎসা, যত্নআত্তি শুরু হয়েছে৷ কলকাতা চিড়িয়াখানায় মার্মোসেট বানরের সফল প্রজনন হয়েছে, মার্মোসেটগুলি সেখানেই থাকতে পারে৷ পাখির জন্যেও সম্প্রতি নতুন, বড় খাঁচা তৈরি হয়েছে৷ আর শিম্পাঞ্জির জন্যে তো হাপিত্যেশ করে বসেই ছিল সবাই৷ কাজেই যদি আইনি সম্মতি এবং প্রশাসনিক ছাড়পত্র পাওয়া যায়, তা হলে কলকাতা চিড়িয়াখানাই হতে পারে ওদের স্থায়ী ঠিকানা৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন