1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

চা শিল্পের সম্ভাবনা, সমস্যা ও কিছু অর্জনের কথা

প্রথম চা গাছ রোপণ থেকে ধরলে বাংলাদেশে চা শিল্পের বয়স ১৭৮ বছর৷ সুদীর্ঘ এ সময়ে দেশের মানচিত্র বদলেছে দু'বার৷ তবে চা শিল্পের অগ্রযাত্রা থামেনি৷ অমিত সম্ভাবনার অনুপাতে অনেকটা অর্জিত না হলেও এই শিল্পের অর্জনও কিন্তু কম নয়৷

বাংলাদেশের চা শিল্প

এই অঞ্চলে প্রথম চা বাগান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ১৮২৮ সালে৷ অবিভক্ত ভারতে চট্টগ্রামের কোদালায় তখনই জমি নেয়া হয়৷ বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম ক্লাব ১৮৪০ সালে সেখানেই পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা হয় প্রথম চা গাছ৷

তবে প্রথম বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয় সিলেটে, ১৮৫৪ সালে৷ সে বছর সিলেট শহরের উপকণ্ঠে মালনিছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়৷ এ বাগানে চা উত্‍পাদনের মধ্য দিয়ে চা শিল্পের যাত্রা শুরু হয়৷ তখন থেকে ধীরে ধীরে চা এ দেশে একটি কৃষি ভিত্তিক শ্রমঘণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে৷ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, আমদানি বিকল্প দ্রব্য উত্‍পাদন এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মাধ্যমে চা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে৷

ড. মাইনউদ্দীন আহমেদের ছবি

ড. মাইনউদ্দীন আহমেদ, পরিচালক, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট

চা উৎপাদন শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি৷ ১৮৬০ সালে হবিগঞ্জের লালচাঁন্দ চা বাগান ও মৌলভীবাজারের মির্তিঙ্গা চা বাগানে চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়৷ ২০০০ সালে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়েও ছোট আঙ্গিকে চায়ের চাষ শুরু হয়৷ ২০০৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামেও শুরু হয় চায়ের চাষ৷

বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়৷ ১৯৫৭-৫৮ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন৷ সে সময়ে চা শিল্পে মাঠ ও কারখানা উন্নয়ন এবং শ্রম কল্যাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে৷

চা শিল্পের বর্তমান অবস্থা

চা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল৷ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমাগত নগরায়নের ফলে ও জনতার শহরমুখিতার কারণে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে৷ এছাড়া সামজিক উন্নয়নের ফলেও চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে৷ বিগত তিন দশক ধরে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে৷ ফলে চায়ের রপ্তানি হঠাত্‍ করেই কমে গেছে৷ তারপরও জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম এবং সুদূরপ্রসারী৷জিডিপিতে চা খাতের অবদান ০ দশমিক ৮১ শতাংশ৷

বাংলাদেশের ১৬২টি বাগানের ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ২০১৫ সালে ৬৭ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন কেজি চা উৎপন্ন হয়েছে৷ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন প্রতি বছর আনুমানিক ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রপ্তানি হয়৷ কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, কুয়েত, ওমান, সুদান, সুইজারল্যান্ডসহ অনেকগুলো দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশের চা৷

গত দশ বছরে পৃথিবীতে চায়ের চাহিদা দ্বিগুণ বেড়েছে৷ এই চাহিদার সাথে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশ, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কা পৃথিবীর প্রায় ৫২ ভাগ চায়ের চাহিদা পূরণ করছে৷

তবে চা উত্‍পাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে না পারলে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে বাংলাদেশের চা বিদেশে রপ্তানি করা খুব কঠিন হবে৷

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশে চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয়টি ‘চায়ের রাজ্য' শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত৷ গবেষণার মাধ্যমে উন্নততর প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ধারাবাহিকতার লক্ষ্যেই ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)৷ শুরু থেকেই ইনস্টিটিউটটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ চা বোর্ডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যর্ক্রম চালিয়ে আসছে৷ এ ইনস্টিটিউটের বর্তমানে ৩টি পূর্ণাঙ্গ ও একটি নতুন সৃষ্ট উপকেন্দ্র রয়েছে৷

বিটিআরআই তার জন্মলগ্ন থেকে সীমিত সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে চা শিল্পের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে আসছে৷ উদ্ভাবন করেছে অনেক লাগসই প্রযুক্তি৷

উচ্চ ফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুণগতমানের ১৮টি ক্লোন উদ্ভাবন করেছেন বিটিআরআই-এর গবেষকরা৷ উদ্ভাবিত চায়ের ক্লোনগুলোর উত্‍পাদন ক্ষমতা হেক্টর প্রতি ৩ হাজার কেজি থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার কেজি৷ অদূর ভবিষ্যতে আরও দু'টি নতুন ক্লোন বিটি-১৯ ও বিটি-২০ চা শিল্পের জন্য অবমুক্ত করা হবে৷

চায়ের ক্লোন উদ্ভাবন ছাড়াও এ পর্যন্ত চার ধরণের বাই-ক্লোনাল ও এক প্রকারের পলিক্লোনাল বীজ উদ্ভাবন করেছে বিটিআরআই৷ জার্মপ্লাজম সমৃদ্ধ জীন ব্যাংক স্থাপন করেছে ৫১৭টি৷

সমগ্র বাংলাদেশে চা আবাদীর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, পঞ্চগড়, ঠাঁকুরগাও, নীলফামারি, দিনাজপুর, লালমণিরহাট, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর নেত্রকোণা, টাংগাইলের মধুপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায় মোট ১,০১,৭২ হেক্টর ক্ষুদ্রায়তনের চাষযোগ্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে৷

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে চায়ের উত্‍পাদন বছরে ৩১ মিলিয়ন কেজি থেকে বেড়ে ৬৭ মিলিয়ন কেজিতে পৌঁছেছে৷ আবাদী জমি ৪২ দশমিক ৬ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৬০ হাজার হেক্টর হয়েছে৷ হেক্টর প্রতি গড় উত্‍পাদন ৭৩৫ কেজি থেকে ১২৭০ কেজিতে উন্নীত হয়েছে৷ এমন উন্নয়নে গবেষণাপ্রসূত জ্ঞান ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ভূমিকা অনস্বীকার্য৷

চা শিল্পের শ্রমিক

চা বাগানে কর্মরত শ্রমিক

উচ্চ উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন উন্নত মানের চায়ের ক্লোন উদ্ভাবন করে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা স্বর্ণপদকও পেয়েছেন৷ স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা হলেন মরহুম এম এম আলী, ড. এস এ রশীদ, মরহুম হারাধন চক্রবর্তী ও জনাব এ.এফ.এম. বদরুল আলম৷ এছাড়া ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক ড. কে. এ. হাসান চা শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে জাতীয় পুরস্কারেও ভূষিত হন৷

বাংলাদেশে চা শিল্পের সমস্যা

চা শিল্প বিনিয়োগের অভাবে তীব্র আর্থিক সংকটের সম্মুখীন৷ বিদ্যমান ব্যাংক ঋণের সুদের হার এত বেশি যে বিনিয়োগের জন্য ঋণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা উত্‍পাদনকারীদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ চা চাষাধীন জমির মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ অতিবয়স্ক, অলাভজনক চা এলাকা রয়েছে যার হেক্টর প্রতি বার্ষিক গড় উত্‍পাদন মাত্র ৪৮২ কেজি৷ এই অতিবয়স্ক চা এলাকার কারণেই হেক্টর প্রতি জাতীয় গড় উত্‍পাদন বৃদ্ধি করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে৷ তাছাড়া চা বাগানের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, চা কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত্‍ সরবরাহে সমস্যা এ শিল্পের উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে চা শিল্পকে প্রতি বছরই খরার মোকাবেলা করতে হচ্ছে৷ ফলে অসংখ্য গাছ মরে যাচ্ছে৷ এ কারণেও চায়ের উত্‍পাদন ব্যহত হচ্ছে৷

সমস্যা সমাধানের উপায়

চা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য৷ চায়ের মাঠ ও কারখানা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নিম্ন সুদে, সহজ শর্তে পর্যাপ্ত তহবিল প্রয়োজন৷ চা সেক্টরে বিনিয়োগের ৫-৭ বছর পর থেকে কাঙ্খিত হারে উত্‍পাদন শুরু হয়৷ এ কারণে ঋণ প্রদানের বছর থেকেই সুদ আরোপ করা উচিত নয়৷ এছাড়া চা শিল্পকে রক্ষা করার জন্য বিদেশ থেকে চায়ের আমদানি যথাসম্ভব নিরুত্‍সাহিত করা প্রয়োজন৷

চা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য – এ কথা কি আপনি বিশ্বাস করেন? লিখুন আমাদের, নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়