1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

‘ক্রসফায়ার’ বনাম ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’

বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে অনেক দিন, সেই ব়্যাব প্রতিষ্ঠার কাল থেকে৷ কিন্তু ২০১৪ সালে রাজনীতির একটা ভিন্ন রূপ ধরা পড়েছে৷ আর সেটা হলো সহিংসতা৷ ক্রসফায়ারকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’৷

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টারে নিহত হয়েছেন ১২৮ জন৷ ওদিকে একই জরিপের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৪৭ জন৷ এই জরিপ থেকে গাণিতিকভাবে এটাই স্পষ্ট হয় যে, সহিংসতায় রাজনীতি এগিয়েছে (না পিছিয়েছে!)৷ বহুল সমালোচিত ক্রসফায়ারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাদের রাজনীতি এখন সবার ওপরে তার অবস্থান ঘোষণা করছে৷

আসক-এর জরিপে আরো কিছু তথ্য রয়েছে৷ জানা গেছে, ২০১৪ সালে ৮৮ জন গুম এবং গুপ্ত হত্যার শিকার হয়েছেন৷ হিন্দু সম্প্রদায়ের ৭৬১টি বাড়ি-ঘরে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে৷ তাঁদের ১৯৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে৷ ভাঙচুর করা হয়েছে ২৪৭টি মন্দির এবং প্রতিমা৷ এছাড়া ২০১৪ সালে সীমান্তহত্যা ও নির্যাতনসহ ২৭৩টি ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে৷

আসক-এর তথ্যে যে চিত্র পাওয়া গেল, তাতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে – এমন হোমিওপ্যাথিক কথা বলার পক্ষে আমি নই৷ আমি বরং বলতে চাই যে, মানবাধিকারের সংজ্ঞা না পল্টালে আমরা হয়ত আর মানবাধিকারের পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যই থাকবো না৷ কারণ প্রবাদেই আছে, ‘সারা অঙ্গে ব্যাথা ওষুধ দেব কোথা'৷

আসক তাদের প্রতিবেদনে তুলনামূলক চিত্রও প্রকাশ করেছে৷ তাতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের তুলনায় বাংলাদেশে ক্রসফায়ার বেড়েছে৷ ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২ জন৷ আর ২০১৪ সালে তা হয়েছে দ্বিগুণ৷ তবে চিত্রটা গত দু'বছরে সীমাবদ্ধ রাখলে ক্রসফায়ারের প্রতি সুবিচার করা হবে বলে মনে হয় না৷

২০০৪ সালে ব়্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে চার হাজার ব্যক্তি৷ তবে ২০১৪ সালে ব়্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা তাঁদের নতুন রূপ দেখিয়েছেন আমাদের৷ নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে কয়েক কোটি টাকা ঘুস নিয়ে হত্যার অভিযোগ আছে তাঁদের বিরুদ্ধে৷ এতে জড়িত ব়্যাবের পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা৷ মামলাটি যেহেতু বিচারাধীন, তাই তাঁরা আসলেই দোষী কিনা – তা এখন বলতে পারলাম না৷ কিন্তু কত ঘটনার অভিযোগ তো আমলেই নেয়া হয়নি৷ সেসবের কী হবে?

বাংলাদেশে চলতি বছরের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতাকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে৷

আসক-এর হিসাব অনুযায়ী, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৬৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে. যাতে নিহত হয়েছেন ১৪৭ জন৷ আর আহত হয়েছেন আট হাজার ৩৭৩ জন মানুষ৷

বলা বাহুল্য, এ হিসাব ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কেন্দ্রিক৷ কিন্তু তার আগে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে সহিংসতা হয়েছে, রাজনীতির মোড়কে তা অতীতের সব রেকর্ডকে ভেঙে ফেলেছে৷ আর সেই রাজনীতিই বাংলাদেশে পুরনো বছরের শেষ এবং নতুন বছরের প্রথম দিনে হরতালের ছায়া ফেলেছে৷

রাজনৈকি সহিংসতার ঘটনায় ২০১৪ সালে সারা দেশে কয়েক হাজার মামলা হয়েছে৷ কিন্তু এ সব মামলার পরিণতি কী – তা জানা যায়নি৷ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, এই সব মামলায় শেষ পর্যন্ত আসামিদের শাস্তি পাওয়ার তেমন কোনো নজির নেই৷ তার ওপর অনেক সময় মূল হোতারা আড়ালেই থেকে গেছেন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার নেতা-কর্মীদের চেয়ে সাধারণ মানুষই বেশি৷ তাঁদের জীবন গেছে, নষ্ট হয়েছে সম্পদ৷ কিন্তু তাঁরা এর কোনো প্রতিকার পাননি৷ অনেকে আজ পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন৷ কেউ তাঁদের খোঁজও রাখেন না৷ আসলে সহিংসতায় শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয় না৷ মৃত্যু হয় একটি স্বপ্নের, একটি পরিবারের৷

সর্বশেষ সোমবার বিএনপি-র ডাকা হরতালে নোয়াখালিতে পিকেটারদের ইটের আঘাতে নিহত হয়েছেন স্কুল শিক্ষিকা শামসুন্নাহার৷ ঢাকার বাসিন্দা শামসুন্নাহার তাঁর কর্মস্থলে যোগ দিতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু হয়ে গেলেন লাশ৷ তাঁর মৃত্যু নিয়ে আমরা দোষারোপের রাজনীতি দেখেছি৷ কিন্তু তাঁর পরিবারের পাশে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতাকে দাঁড়াতে দেখিনি৷

DW-Korrespondent in Bangladesch, Harun Ur Rashid Swapan

ডয়চে ভেলের ঢাকা প্রতিনিধি হারুন উর রশীদ স্বপন

বাংলাদেশে গুম, গুপ্ত হত্যা, হত্যা যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে৷ নিখোঁজ ব্যক্তিদেরও মিলছে না কোনো খোঁজ৷ অভিযোগ রয়েছে যে, এই নিখোঁজ আর গুমের সঙ্গে যোগ আছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের৷ তবে এ কথা অস্বীকার করেছে তারা৷ ঢাকার শাহজাহানপুরে শিশু জিহাদ যেমন মরে প্রমাণ করেছে যে, সে ওয়াসার-পাইপে সত্যিই পড়ে গিয়েছিল, তেমনি কোনো ঘটনা না ঘটার আগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গুম-অপহরণে তাদের জড়িত থাকার স্বীকার করবে না৷ অথবা নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মতো হাতে-নাতে ধরা না পড়লে, হবে না৷

গত অক্টোবরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে৷ এতে উল্লসিত সরকারের নীতি-নির্ধারকরা৷ তাঁরা বলছেন, ‘‘বাংলাদেশ যে মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে, এটা তার স্বীকৃতি৷'' এর উত্তরে মানবাধিকার নেতারা বলছেন, ‘‘মানবাধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, বাংলাদেশ এই পদের যোগ্য৷''

তবে এই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় যে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে৷ এটা আসক-এর প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে আরো বেশি৷ সহিংসতা-হত্যাকাণ্ডে রাজনীতিই যখন শীর্ষে অবস্থান নেয়, তখন বলাই যায় যে ‘মাথায় পচন ধরেছে'৷ এ বড় কঠিন রোগ৷ এটা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, চুল থেকে নখ পর্যন্ত সব জায়গায়৷

রাজনীতিই সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে৷ পুলিশ, প্রশাসন, ব়্যাব, নাগরিক – সবকিছু৷ আর রাজনীতির চরিত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ আচরণ করে৷ তাই আমরা প্রায়ই শুনি, ‘‘রাজনীতি ঠিক হলে সব ঠিক হয়ে যাবে৷'' আর রাজনৈতিক সহিংসতা যদি ক্রসফায়ারকেও ছাড়িয়ে যায়, তাহলে আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি!

নতুন বছর, নতুন সময়, নতুন দিন৷ আশাবাদী হতে চায় মন৷ কিন্তু সেটা তো হতে পারছে না৷ কারণ সামনেই ৫ই জানুয়ারি আবারো ফিরে আসছে৷ কী হয় কে জানে?

নির্বাচিত প্রতিবেদন