1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

কেন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বাংলাদেশিরা?

বৈধভাবেই বাংলাদেশের বাইরে বাস করেন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি৷ এদের বেশির ভাগ শ্রমিক হলেও, অনেকে স্থায়ীভাবেও ছাড়ছেন দেশ৷ বিদেশে নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলেও বেড়ে চলেছে অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা৷ কিন্তু কেন?

নাতি ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে স্নাতক করার সুযোগ পেয়েছে৷ দাদির কাছে গেছে বিদায় নিতে৷ দাদি তো মহা খাপ্পা৷ দাদির একটাই কথা, ‘‘অত দূরে যাইতে কেনে রে বো, চিনা-জানা কেউ নাই৷ কিলা থাকবে, কিতা খাইবে, কিতা মাতবে৷ এর তাকি বালা লন্ডন যাগি৷ অমুকর পুত তমুক আছে, বালাউ থাকবেনে৷''

সিলেটিদের নিয়ে এই কৌতুক দেশের অন্য অঞ্চলেও বেশ জনপ্রিয়৷ সিলেটে যাঁরা ইংল্যান্ডপ্রবাসী, তাঁদের বলা হয় লন্ডনি৷ অন্য মানুষের ধারণা লন্ডনি মানেই অন্য জগতের বাসিন্দা৷

একই ধারণা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও৷ সবারই একটা ধারণা, বিদেশ মানেই ভালো৷ যাঁরা বিদেশে থাকেন, তাঁরা কাজ যাই করুন না কেন, দেশে ফিরলে সমাজে ব্যাপক সম্মানের সাথে তাঁদের দেখা হয়৷ কিন্তু সেই একই কাজ দেশে করলে সমাজে শুরু হয় কানাঘুষা৷

ফলে স্বভাবতই দেশে জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে না পেরে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষই স্বপ্ন দেখেন দেশের বাইরে যাওয়ার, সে যে দেশই হোক না কেন৷ তবে সে স্বপ্ন কিছু ক্ষেত্রে সত্যি হলেও কিছু ক্ষেত্রে আবার চরম ভুল৷ 

বিদেশ, কী দেশ?

প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বাস করেন দেশের বাইরে৷ এর মধ্যে দশ লাখ বাস করেন শুধু সৌদি আরবেই৷ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ – সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরেইন এবং অন্য অনেক দেশেই থাকছেন বাংলাদেশিরা৷

এই বৈধ অভিবাসীদের বাইরে বড় একটি অংশ বিভিন্ন দেশে বাস করছেন অবৈধভাবে৷ যেভাবেই হোক, পালিয়ে হলেও তারা থেকে যাচ্ছেন কোনো না কোনো দেশে৷ কয়েকটা অভিজ্ঞতার কথা বললে মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা যাবে৷

২০১৫ সালে নেপালে ভূমিকম্পের পরদিন থেকে কিছুটা সময় থাকতে হয়েছিল বাংলাদেশ দূতাবাসে৷ প্রতিদিন সকালে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার সময় দেখতাম বেশ কিছু লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন দূতাবাসের সামনে৷ একদিন কৌতূহল থেকে কথা বললাম একজনের সাথে৷ ভদ্রলোক বাংলাদেশি৷ কাজ করছেন ছোট্ট একটা গার্মেন্টসে৷

চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বললেন, কয়েক বছর আগে অন অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ নিয়ে শরীয়তপুর থেকে এসেছিলেন কাঠমান্ডুতে৷ দালালরা সিঙ্গাপুর পাঠাবে বলে এখানে রেখে পালিয়েছে৷ এর মধ্যে ভিসার মেয়াদও গেছে শেষ হয়ে৷ ফলে এখানেই এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর কারখানায় অল্প বেতনে নিয়েছেন পোশাক শ্রমিকের চাকরি৷

ভূমিকম্পের পর কারখানা বন্ধ হওয়ায় এমন অনেকেই পড়েছেন বিপদে৷ ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করায় যে পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে, তা তাদের কাছে নেই৷ ফলে এখন কারাগারে যাবার আশংকাই তাঁদের মধ্যে বেশি৷ পরে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলছিলেন, এমন প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি আছেন নেপালে৷

এবার আরেক প্রতিবেশী মালদ্বীপের গল্প৷ এক দ্বীপ রিসোর্টের স্যুভেনির শপে গেছি কী আছে দেখতে৷ এক নারিকেল গাছ ব্যারিকেড দিয়ে নারিকেল পাড়া হচ্ছে৷

- এই, আস্তে পাইরো, নীচে মানুষ যাইতে আছে৷

শুনে চমকে উঠি৷ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

– ভাই, আপনারা বাংলাদেশি?

- হ৷

- কইত্থাইকা আইসেন?

- আমি বরিশাল, অয় পইট্টাখালি (গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে)৷

- আপনাদের তো ভিসা আছে, তাই না?

- আমার আছে, ওর নাই৷

- তাহলে দেশ যায় কীভাবে!

- বছরে একবার প্লেনের টিকেট দেয়৷ আমি যাই৷ ও তিন বছরে ধরে যায় না৷ 

যাঁরা বৈধভাবে আছেন, তাঁদের কষ্ট কোনো অংশেই কম না৷ যে উন্নত জীবনের লোভে তাঁরা বিদেশ যান, অচিরেই তাঁরা বুঝতে পারেন, সে জীবনযাপন করে আর যাই হোক, দেশে পরিবারকে টাকা পাঠানোটা কষ্টসাধ্য৷ ফলে খেয়ে না খেয়ে, দিনরাত পরিশ্রম করে, নিজের জীবনের চিন্তা বাদ দিয়ে হলেও তাঁরা দেশে রেমিটেন্স পাঠান৷ 

নিজভূমে পরবাস

প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশে কি কাজ করে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব৷ কিন্তু জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র না হওয়ায় আমাদের এখনও সে সমাজকাঠামো গড়ে ওঠেনি৷ ফলে অর্থনৈতিকভাবে সমাজের নীচের স্তরে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের এখনও দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করা হয়৷ যদিও হাস্যকরভাবে, আমাদের সব পণ্য ও সেবার জোগানদাতা এরাই৷

ফলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার চেয়ে সামাজিক স্বীকৃতিটাই অনেক ক্ষেত্রে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় বিদেশগামীদের ক্ষেত্রে৷

‘টাকা যার, ক্ষমতা তার' – এই নীতি কাগজে-কলমে স্বীকৃত না হলেও, অলিখিত এই চুক্তিতেই এখনও চলে বাংলাদেশ৷ পোশাক শিল্প আকারে বড়, কাজেই সেক্ষেত্রে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পের অবস্থাও অনেকটা একই রকম৷ ন্যূনতম বেতন মাত্র ৮ হাজার টাকা করার দাবি, আর সে দাবি আদায়েই পোশাকশিল্প শ্রমিকদের কেমন আন্দোলন করতে হয়েছে, তা কম-বেশি সবারই জানা৷

ভিডিও দেখুন 10:53

‘নগ্ন করে নির্যাতন করা হয় শরণার্থীদের’

এর জন্য সমাজে নিজের কাজ ও যোগ্যতার স্বীকৃতি না থাকায় অনেকটাই নিজ দেশেও পরবাসী হয়েই কাটাতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে৷ যে কোনো মূল্যে সে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে চান তাঁরা৷ আর তখনই একমাত্র উপায় হিসেবে সামনে আসে বিদেশযাত্রা৷

শিক্ষা ও চাকরির দুরবস্থা

শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশে চলছে পরীক্ষানিরীক্ষা৷ কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে এখনও রয়েছে প্রশ্ন৷ নিজের আগ্রহ বা দক্ষতা বিবেচনায় না রেখে চাকরির বাজার বিবেচনায় উচ্চশিক্ষার বিষয় বাছাইয়ের প্রবণতা বাড়ছেই৷

ডাক্তার হতে পারলেও জীবন নিশ্চিত৷ না হলে অন্তত ইঞ্জিনিয়ার৷ বেড়ে চলেছে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, এবং বিবিএ-এমবিএর কদরও৷ কিন্তু একটা রাষ্ট্র চলতে গেলে অন্য যেসব ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, সেদিকে আমাদের খেয়াল কই?

যাঁরা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যেও রয়ে যাচ্ছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা, ভয়৷ পড়াশোনা শেষ হলে চাকরি পাওয়া যাবে তো? এ নিশ্চয়তা সরকার দিতে পারছে না৷

চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়৷ অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল করে পাশ করলেও, পড়ে থাকতে হয় তলানিতে৷ ফলে, জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে সার্টিফিকেটের আড়ালে৷

শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশই চান দেশের বাইরে গিয়ে একটা ডিগ্রি নিয়ে আসার৷ যদি এতে বাড়ে ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা৷ অনেকক্ষেত্রে বিদেশের সেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন, তাও যাচাই করতে চান না শিক্ষার্থীরা৷ আর একবার বাইরে গেলে ফিরে না আসার প্রবণতাও অনেক বেশি৷

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

ফলে যতই সরকারের পক্ষ থেকে জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখা হোক না কেন, মেধাপাচার রোধ করতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না৷ 

সামাজিক নিরাপত্তা, ও সামাজিক সেবা

আইনের শাসন কতটা আছে বাংলাদেশে? রাস্তায়, বাসায়, কর্মস্থলে কতটা নিরাপদ বোধ করেন সাধারণ মানুষ? মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকেই নিজের ভবিষ্যত জীবন দেশের বদলে বিদেশেই দেখতে পছন্দ করেন৷

এছাড়াও রয়েছে সেবার ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন৷ বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে বলে একটি ঘোষণা আমরা শুনেছি৷ কিন্তু রাস্তায় যানজট, জলাবদ্ধতা, মূল্যস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, সড়ক ও নৌ-পরিবহনে নৈরাজ্য, এমন নানা পর্যায়ে এখনও রয়েছে চরম বিপর্যয়৷

বেশিরভাগ নাগরিকই নিজেরা দেশের মাটি আঁকড়ে ধরে থাকলেও, নিজের সন্তানকে এই পরিবেশে বেড়ে উঠতে দিতে চান না৷

ফলে সমাজের প্রায় সব স্তরেই বিদেশগামীদের সারি হচ্ছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়