1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

কারা আগুন লাগায়?

কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহে সাম্প্রতিক এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিল৷ তার মধ্যে সব থেকে বড় প্রশ্ন, নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা কতটা যত্নবান?

Symbolbild Feuer Streichholz Streichhölzer Zündholz

প্রতীকী ছবি

মাত্র গত সপ্তাহের ঘটনা৷ নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়ের নাটকের দল তৃতীয় সূত্র-র নতুন নাটক ‘যারা আগুন লাগায়' এর অভিনয় চলছিল কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর প্রেক্ষাগৃহে৷ নবারুণ ভট্টাচার্যের ভাষান্তরে সুইস-জার্মান নাট্যকার মাক্স ফ্রিশ-এর এই নাটকের শেষ দৃশ্যে অগ্নিকাণ্ডের বিভ্রম তৈরি করতে আগুনে-লাল আলোর সঙ্গে ধোঁয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল৷ সেই ধোঁয়ার গন্ধ নাকে যেতেই দর্শকাসনে বসে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াতেই নজর গিয়েছিল প্রেক্ষাগৃহে ঢোকা-বেরনোর একটিমাত্র সংকীর্ণ দরজার দিকে৷ মনে হয়েছিল, সত্যিই যদি কোনওদিন প্রেক্ষাগৃহে আগুন লাগে, তা হলে ওইটুকু পরিসর দিয়ে এত দর্শক নিরাপদে বেরোতে পারবেন তো!

Indien Theater gegen Faschismus Mephisto

অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস চত্বরে বিভিন্ন পোস্টার

ঘটনাচক্রে সত্যিই আগুন লাগল! এবং ঘটনাচক্রে সুমন মুখোপাধ্যায়ের দলেরই একটি নাটকের অভিনয় চলাকালীন৷ না, সেটি ‘যারা আগুন লাগায়' নাটকটি নয়, কিন্তু স্বয়ং সুমন মুখোপাধ্যায়ও বিচিত্র এই সমাপতনের কথা না বলে পারছেন না৷ নাটক শেষ হতে যখন আর মিনিট সাতেক বাকি, তখন মঞ্চের ডান দিকে, দ্বিতীয় উইংসের ধারে গুটিয়ে রাখা দ্বিতীয় যবনিকাটিতে হঠাৎ আগুন লেগে যাওয়াটা সুমনের কাছে অদ্ভুত ঘটনা বলে মনে হচ্ছে৷ ‘কিউরিয়াস ইনসিডেন্ট,' বলেছেন সুমন৷

যদিও নাট্যকর্মী এবং দর্শকদের একাংশের তৎপরতায় বড় কোনও বিপত্তি এবং নিশ্চিত প্রাণহানি এড়ানো গিয়েছে৷ আগুন আয়ত্তের বাইরে না গেলেও ভয়ে হুড়োহুড়ি করে ওই সংকীর্ণ দরজা দিয়ে বাইরে বেরোতে চাইলে অন্তত পদপিষ্ট হয়ে কিছু মানুষ হতাহত হতেই পারতেন৷ সংবাদমাধ্যমের একাংশ আবার এই দুর্ঘটনার পিছনে যড়যন্ত্রের ছায়া খুঁজতে শুরু করেছে, যেহেতু একাডেমীতে সেদিনের সন্ধ্যায় একইসঙ্গে দুটি নাটক ছিল৷ একটি সুমন মুখোপাধ্যায়ের দলের এবং অন্যটি কৌশিক সেনের দলের৷ আবারও বলতে হয়, নেহাতই ঘটনাচক্রে সুমন ও কৌশিক, দুজনেই বর্তমান রাজ্য সরকারের কট্টর সমালোচক বলে পরিচিত!

আগুন লাগার আকস্মিকতা এবং তাঁদের দুজনের দলের অভিনয়ের দিনই আগুন লাগার ঘটনা সুমনের কৌতুহলকে উসকে দিয়েছে, যেটা নেহাত অস্বাভাবিক নয়৷ কিন্তু এমন একটা দুর্ঘটনা কি সত্যিই অপ্রত্যাশিত বা অভাবনীয় ছিল এই রাজ্যের নাট্যকর্মীদের কাছে! গোটা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের কর্তৃত্ব নিয়েই টানাপোড়েন চলছে গত বছর দুয়েক ধরে৷ জল্পনা, রাজ্যে ক্ষমতার হাত বদলের পর যেভাবে সরকারি, আধা সরকারি এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এক ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার চেষ্টা চলছে, তার ছায়াই পড়েছে অ্যাকাডেমিতেও৷

কৌশিক সেন আগুন লাগার ঘটনার পরই অ্যাকাডেমির কিছু অব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে মন্তব্য করেছেন, এগুলো কাদের কাছে গিয়ে বলবেন, তা তাঁরা জানেন না৷ কারণ অ্যাকাডেমির পরিচালনভার এখন কাদের হাতে, সেটাই তাঁদের জানা নেই৷ ঠিকই বলেছেন কৌশিক৷ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর পরিচালনভার থাকে যে বোর্ড অফ ট্রাস্টির হাতে, তার সদস্যরা পদত্যাগ করার পর অ্যাকাডেমি এখন কার্যত অভিভাবকহীন৷

কিন্তু বর্তমান রাজ্য সরকারের একজন মন্ত্রী নিজে প্রথমে একজন নাট্যকর্মী! আরও এক নাট্যকর্মী তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে লোকসভা ভোটে জিতে সাংসদ হয়েছেন৷ অন্য আরেক বিশিষ্ট নাট্যকর্মী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি করে দেওয়া বিভিন্ন কমিটিতে ছিলেন বা আছেন৷ আরও এক নাট্য নির্দেশক বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ৷ প্রবীণ নাট্য-ব্যক্তিত্ত্বদেরও অনেককেই ইদানীং সরকার পক্ষের কাছাকাছি থাকতে দেখা যায়৷ আর সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী নিজে বাংলার অভিনয় জগতের একজন গুণগ্রাহী৷ রাজনৈতিক বিরোধ সত্ত্বেও নাট্যকর্মীদের মধ্যে সদ্ভাব থাকার যে কথাটা শোনা যায় সেটা যদি সত্যি হয়, তা হলে বরং এটাই কি বেশি কৌতুহলজনক নয় অ্যাকাডেমির ঐতিহ্য রক্ষায় এরা কেউ তৎপর হলেন না!

রবীন্দ্রসদন - নন্দন চত্বরের লাগোয়া অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস কলকাতার অন্যতম সাংস্কৃতিক পীঠস্থান৷ শুধু কলকাতা নয়, সারা ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান এটি, ১৯৩৩ সালে ভারতীয় যাদুঘর ভবনের একটি ঘরে যার সূত্রপাত করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্প অনুরাগী, রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়৷ ১৯৫০ সালে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নিজস্ব দপ্তর, চিত্র-সংগ্রহশালা, প্রদর্শনী কক্ষ এবং প্রেক্ষাগৃহ তৈরির কাজে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় ছাড়াও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু৷

অচিরেই এই অ্যাকাডেমি হয়ে ওঠে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র৷ বিশেষত জনপ্রিয় হয় তার প্রেক্ষাগৃহ, যার মঞ্চে ঢাকা এবং কলকাতা শহরের প্রায় সবকটি মুখ্য বাংলা নাটকের দল এবং তাদের যশস্বী অভিনেতারা কোনও না কোনও সময় অভিনয় করেছেন৷ শহরের বাইরে, মফস্বল এবং দূরবর্তী জেলার নাটকের দলগুলির কাছেও নাগরিক দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর সেরা মাধ্যম ছিল অ্যাকাডেমির প্রেক্ষাগৃহ৷ নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও অন্যান্য কলাকুশলীদের কাছে এই মঞ্চ প্রায় তীর্থস্থানের সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছে বরাবরই৷

সেই ঐতিহাসিক মঞ্চ এবং প্রেক্ষাগৃহ কী করে এমন অবহেলায় পড়ে থাকল, সেই প্রশ্ন এখন ভাবাচ্ছে শিল্প-সংস্কৃতির অনুরাগীদের৷ অথচ থিয়েটার দেখাও এখন বেশ ব্যয়সাধ্য হয়ে উঠেছে৷ বড় দলের নাটক থাকলে অ্যাকাডেমি প্রেক্ষাগৃহের দোতলায় টিকিটের দাম ১০০ টাকা এবং একতলায় ২০০ টাকা! অর্থাৎ যে দামে বিলাসবহুল মাল্টিপ্লেক্স সিনেমার টিকিট কাটতে হয়, গ্রুপ থিয়েটারের নাটকের টিকিটের জন্য সেই একই দাম দিতে হয় দর্শকদের৷ হলভাড়া ছাড়াও অন্যান্য খাত থেকে অর্থ আসে৷ প্রেক্ষাগৃহের বাইরে একটি নোটিস বোর্ড থেকেই জানা যাচ্ছে, সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থসাহায্য প্রেক্ষাগৃহের উন্নয়নে খরচ হচ্ছে৷

Indien Theater gegen Faschismus Mephisto

অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহ

সেখানে প্রেক্ষাগৃহের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায়শই বিকল থাকা বা দমকলের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা না থাকাটা আদৌ প্রত্যাশিত নয়৷ প্রেক্ষাগৃহে আপৎকালীন প্রস্থানের একটিমাত্র দরজা থাকা এবং সেটিও দরকারের সময়ে বন্ধ পাওয়ার খুব চড়া মাশুল দিতে হতে পারত! এবারের অগ্নিকাণ্ড সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়