1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

কলকাতায় সব ঘরের জন্য ভাস্কর্য

এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে নবীন-প্রবীণ ভাস্করদের দল ক্যালকাটা স্কাল্পটরস৷ নামমাত্র দামে তারা ভাস্কর্য পৌঁছে দিতে উদ্যোগী শিল্পানুরাগীদের ঘরে৷

এমন কতবার হয়েছে যে আপনি কোনো চিত্র বা ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে গিয়েছেন, ঘুরে ঘুরে শিল্পীদের কাজ দেখতে দেখতে কোনো কোনো কাজ আপনার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তাদের এমনই চড়া দাম যে আপনার হাত ছোঁয়াবারও সাহস নেই৷ শিল্প অনুরাগী যাঁরা, তাঁদের সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে এই দুস্তর ফারাকটা কোনো নতুন ঘটনা নয়৷ যে কারণে চিত্রকলাই বলুন বা ভাস্কর্য, তা সবসময় বিত্তবানের বাড়ি বা শিল্পপতিদের দপ্তর কিংবা বিলাসবহুল হোটেলের লবির শোভাবর্ধন করে৷ আমার-আপনার বাড়িতে তাদের জায়গা হয় না৷

অথচ ঘটনাটা একেবারেই এমন নয় যে অর্থবান মানুষেরাই শিল্পকলার একমাত্র সমঝদার৷ বরং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ একইভাবে তার রস নিতে পারেন, কিন্তু তাঁদের সামর্থ্য থাকে না একটা ছবি বা ভাস্কর্য কেনার৷ অন্যদিকে শিল্পী বা ভাস্করেরাও একই রকম নিরুপায়৷ ক্যানভাস, রং বা ভাস্কর্যের বিভিন্ন উপাদানের যা দাম হয়েছে, তার সঙ্গে পারিশ্রমিক, শিল্পীর সম্মানদক্ষিণা এবং গ্যালারির কমিশন যোগ করলে শিল্পকর্মের অর্থমূল্য যে পর্যায়ে পৌঁছায়, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে৷ তবুও নিজেদের সীমিত সামর্থ্যকে অতিক্রম করেই অনেক সময় মধ্যবিত্ত শিল্প সংগ্রহের দিকে ঝোঁকেন৷ এ সেই, পকেটে একটি পয়সা থাকলে ক্ষুধার নিবৃত্তির জন্যে খাবার কেনা, আর আরও একটি বাড়তি পয়সা থাকলে তা দিয়ে ফুল কেনার রোম্যান্টিক জীবনদর্শন৷

সেই প্রেক্ষিতে একটা মস্ত বড় কাজের শুরুটা করে দিল কলকাতার ভাস্করদের সংগঠন ক্যালকাটা স্কাল্পটরস৷ উদ্যোগটা এসেছিল কেবলমাত্র এই ভাবনা থেকেই যে ভাস্কর্যকে পৌঁছে দিতে হবে মানুষের ঘরে ঘরে, যৎসামান্য বিনিময় মূল্যে৷ যে শিল্প-অনুরাগী জন সামর্থ্যের অভাবে গ্যালারিতে ঢুকে একটা ভাস্কর্য কিনতে সংশয়, সংকোচ বোধ করেন, ভাস্কর্যকে পৌঁছে দিতে হবে তাঁদের কাছে৷ এতে যেমন ভাস্কর্য সম্পর্কে, বা বৃহত্তরভাবে শিল্প সম্পর্কে তাঁদের আগ্রহ এবং সচেতনতা বাড়বে, তেমন শিল্পকেও নিছক ব্যবসায়িক শৃঙ্খলে আর বাঁধা থাকতে হবে না৷ শিল্পের সঙ্গে সমঝদারের সম্পর্কও আরও অনেক সহজ আর অনায়াস হবে৷

কী বললেন ক্যালকাটা স্কাল্পটর্স-এর সদস্যরা? খুব একটা নতুন কথা বললেন ওঁরা৷ যে, সাধারণত যে সংকর ধাতু দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি হয়, সেই ধাতুর পাঁচ কেজি বা ১০ কেজির ক্রয়মূল্য ওঁদের দেওয়ার জন্য৷ ভাস্কররা সেই ধাতু নিয়েই কাজ করবেন এবং বিনিময়ে একটি বা দুটি ছোট মাপের ভাস্কর্য, যাঁরা ধাতুর দাম দিয়েছেন, তাঁদের বিনামূল্যে দেওয়া হবে৷ ধরা যাক, একজন দিয়েছেন পাঁচ কেজি ধাতুর দাম, সেই ধাতু থেকে ছোট ছোট পাঁচটি ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে, তার থেকে একটি ভাস্কর্য তিনি বেছে নিয়ে যেতে পারবেন৷ এভাবেই, যিনি ১০ কেজি ধাতু দিয়েছেন, তিনি হয়ত নিজের পছন্দমতো দুটি ভাস্কর্য বেছে নেওয়ার অধিকারী হবেন৷

এখানে একটা প্রশ্ন অবশ্যই ওঠে যে, তা হলে বাকি ভাস্কর্যগুলো নিয়ে কী হবে? সেটাও খুব অভিনব এক উদ্যোগের রসদ হয়ে উঠবে৷ সমকালীন ভাস্করদের গোষ্ঠী ক্যালকাটা স্কাল্পটরস সারা বছরজুড়ে দলবদ্ধ প্রদর্শনী, কর্মশালা বা প্রশিক্ষন শিবির ছাড়াও আরও অনেক সমাজমুখী, শিল্পমুখী কাজ করে থাকে৷ তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, প্রবীন ভাস্কর, যাঁরা হয়ত এখন আর সক্রিয় নেই, অবসর নিয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং নবীন ভাস্কর যারা, সবে কাজ শুরু করেছে, তাদেরকেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া৷ এই যে উদ্বৃত্ত ভাস্কর্যগুলো, সেগুলোকে নামমাত্র একটা দামে বিক্রি করে, সেই অর্থ দিয়ে এক তহবিল গড়তে চায় ক্যালকাটা স্কাল্পটর্স, যা ওই প্রবীন এবং নবীন ভাস্করদের সাহায্যে কাজে লাগবে৷

চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ চন্দননগরের স্কাল্পচারস স্টুডিওতে এই উদ্যোগেরই প্রাথমিক পর্ব ঘটে গেল দারুণ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে৷ ক্যালকাটা স্কাল্পটর্স এবং এই গোষ্ঠীর বাইরেরও মোট ১৬-১৭ জন ভাস্কর তিনদিন ধরে গড়ে ফেললেন প্রায় ৬০টি ছোট আকারের ভাস্কর্য৷ যাঁরা ধাতুর অর্থমূল্য অনুদান দিয়ে এই ভাস্কর্য কর্মশালার রসদ জোগালেন, তাঁদের মধ্যে যেমন শিল্প অনুরাগী ব্যক্তিমানুষও রইলেন, তেমনই থাকল কলকাতার এক নামি আর্ট গ্যালারি এবং দিল্লির এক বিখ্যাত শিল্পকলা বিষয়ক পত্রিকা৷ এই ৬০টি ভাস্কর্যের দাম গড়ে তিন হাজার টাকা করে হবে, যা বিক্রি হবে সাধারণ শিল্পরসিকদের মধ্যে৷ আর তার থেকেও বড় কথা, এটা সবে শুরু৷ ক্যালকাটা স্কাল্পটর্স-এর এই উদ্যোগ এমন ব্যাপক সাড়া ফেলেছে যে এখনই টানা এক বছর নানা জায়গায়, পশ্চিমবঙ্গে এবং সারা ভারতে এমন ভাস্কর্য কর্মশালা করা যায়৷ আর তা হলে সত্যিই হয়ত একদিন ভাস্কর্যরা জায়গা পাবে সব বাড়িতে, সবার জীবনে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন