1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির পেছনে বড় রাজনীতি

কওমি মাদ্রাসার দেয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রীকে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স ডিগ্রীর সমমর্যাদা দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশে বিতর্কের সূচনা হয়েছে৷ এই বিতর্কের দুটো দিক আছে – একটি রাজনৈতিক, অন্যটি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট৷

এই দুই দিকের মধ্যে কোনো চীনের প্রাচীর তোলা নেই, একটি আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয় - ফলে এই দুই দিকের দিকেই আমাদের সমানভাবে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক৷ তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে বলে আমি মনে করি৷ এটিকে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা বলেই বিবেচনা করতে হবে এবং তা কেবলমাত্র কওমি মাদ্রাসার একটি সনদের স্বীকৃতি বিষয়ক সমঝোতা মনে করারও কারণ নেই৷ সে কারণে আমার লক্ষ হচ্ছে এটা ব্যাখ্যা করা কেন ক্ষমতাসীন দল এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে৷ অনেকেই এটাকে কেবল মাত্র ২০১৮ সালের শেষে (বা ২০১৯ সালের গোড়াতে) অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ভোটের হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন, সেটাকে একেবারে নাকচ না করেই বলা যায় যে এর কারণ এককভাবে নির্বাচনের হিসেব নয়, এর কারণ এর চেয়েও গভীরে বলেই আমি মনে করি৷ এর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে আগেই৷ সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর এর যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্যে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কওমি মাদ্রাসার ভূমিকা এবং বিশেষত সমাজে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলছেন তাঁদের অনেকের অতীতের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি ও মন্তব্যকে আপাতত ধর্তব্যে না নিলেও বলা যায় যে, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা বিষয়ে তাঁরা আবারও সীমিত বিবেচনা দ্বারা চালিত হচ্ছেন৷ একার্থে সেটাও তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসূত৷

কী ঘটেছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদের স্বীকৃতির ঘোষণা দেবার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়েছে যে এখন থেকে তাকমিল বা দাওরা-ই-হাদিস সনদকে আরবি এবং ইসলামি স্টাডিজের মাস্টার্সের সমমানের বলে বিবেচনা করা হবে৷ এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে, এবং এই ডিগ্রি প্রদানের পরীক্ষার তত্ত্বাবধান ও ডিগ্রি প্রদানের জন্যে একটি বোর্ড তৈরি করা হয়েছে যার নাম দেয়া হয়েছে আল হাইয়াতুল উলাইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ৷ এই বোর্ডের অধীনে আনা হয়েছে কওমি মাদ্রাসা সংক্রান্ত জাতীয় শিক্ষা বোর্ড বলে পরিচিত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া এবং অন্য ছয়টি আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ডকে৷ কওমি মাদ্রাসায় দেয়া শিক্ষা এবং সনদকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়৷ ২০০৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে এই স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন৷ সেই ঘোষণা এসেছিলো ঐ সরকারের মেয়াদের প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং সেই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের সময় বা সুযোগ ঐ সরকার পায়নি৷ ক্ষমতার হাত বদলের কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়, কেননা আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো এবং সিভিল সোসাইটির এক বড় অংশ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলো না৷ এগারো বছর পরে বিএনপি'র প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ, যে সেই সময়ে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলো এই বলে যে এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং শিক্ষাখাতের জন্যে ক্ষতিকর, সেই নতুন করে এই স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে৷

এই বৈঠকে কওমি মাদ্রাসাগুলোর যে প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন তাঁদের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আছে – তাঁরা হেফাজতে ইসলাম বলে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনের নেতা, যারা ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের প্রেক্ষাপটে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে উপস্থিত হয়ে সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিলো যেগুলো বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলে দেয়ার কর্মসূচি বলেই বলা যায়৷ এই সব দাবিকে কেন্দ্র করে সরকার এবং হেফাজত মুখোমুখি হয়ে পড়ে এবং বিরোধী দল বিএনপি হেফাজতের প্রতি সমর্থন জানায়৷ ৫ মে হেফাজতের ঢাকায় দ্বিতীয় সমাবেশের পর অভূতপূর্ব নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে তাঁদেরকে ঢাকার শাপলাচত্বর থেকে অপসারণ করা হয়৷ হেফাজতের নেতারা তাঁদের বিরাট সংখ্যক কর্মীকে হত্যার অভিযোগ করেছিলো যা সরকার অস্বীকার করে এসেছে৷ হেফাজতের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিলো৷ ১১ এপ্রিলের এই বৈঠকে কেবলমাত্র কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতিই দেয়া হয় নি, প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের নেতাদের এই দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গনে যে ভাস্কর্যটি আছে সেটি সরিয়ে ফেলা দরকার৷ তদুপরি, এই বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের পাঠ্যপুস্তকগুলো থেকে সরকার এমন অনেক লেখা বাদ দেন যেগুলো হেফাজত নেতারা বাদ দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন এই যুক্তিতে এগুলো দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর মানস গঠনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ৷ সরকারের এই পদক্ষেপের জন্যে হেফাজতের নেতারা সরকার ও সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিবৃতিও দিয়েছেন৷ এই সব ঘটনার প্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি যতটা মাদ্রাসা শিক্ষা বিষয়ক তারচেয়ে বেশি হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে হেফাজতের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট৷

রাজনৈতিক দৃশ্যপট

২০১৩ সালে হেফাজত যখন সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মে মাসে সরকার যখন তাদেরকে কঠোর হাতে দমনের পদক্ষেপ নেয় তখন থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা এটা দেখাতে তৎপর ছিলেন যে হেফাজতের সঙ্গে তাদের আদর্শিক অবস্থান বিপরীতমুখী এবং তাদের সম্পর্ক বৈরী৷ তদুপরি হেফাজতের মত ধর্মভিত্তিক, এবং তাঁদের ভাষায় পশ্চাদপদ, শক্তির মোকাবেলা করার জন্যে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই৷ যদিও ২০১৩ সালের মে মাসের পরে ক্ষমতাসীনরা পর্যায়ক্রমে হেফাজতের সঙ্গে বিভিন্নভাবেই সমঝোতা করেছেন, হেফাজতের নেতারা ব্যক্তিগত ও সাংঠনিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা গ্রহণ করেছেন এবং তারা সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন তথাপি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থক গোষ্ঠী হেফাজতকে তাদের শত্রু বলেই দেখাতে চেয়েছেন৷ আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি'র সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোটগত অবস্থানের দিকে বারংবার অঙ্গুলি সংকেত করে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং সমর্থকরা বলেন যে, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক শক্তিকে পুনর্বাসিত করা এবং তাদের ওপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করার অতীত ও বর্তমান ইতিহাস হচ্ছে বিএনপি'র৷ ইতিহাস তাদের এই যুক্তির পক্ষে যথেষ্ট উদাহরণের যোগান দিয়েছে৷

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতে ইসলামীকে কার্যত নিষিদ্ধ দলে পরিণত করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দল এটাই দেখাতে চেয়েছেন যে তারা ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন৷ ২০১৩ সালে থেকে দেশি এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত সংগঠন এবং ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, দেশের মূলধারার রাজনীতিতে সহিংসতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি, ইসলামিক স্টেটের উত্থান, বৈশ্বিকভাবে এবং দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী তৎপরতার অনুকূল পরিবেশের কারণে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ একটি ভয়াবহ রূপ লাভ করে৷ গত বছরগুলোতে সরকার বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা অভিযানকে তাঁদের ‘জিরো টলারেন্সের' নীতির প্রকাশ হিসেবে হাজির করে আসছে, যদিও সরকার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উপস্থিতি অস্বীকার করে এবং জঙ্গি মোকাবেলার জন্যে সর্বাত্মক বা কমপ্রিহেনসিভ কোনো কৌশলের কথা সুস্পষ্ট করে বলেনি৷ স্বচ্ছতার অভাবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ধরনের অভিযানগুলো ক্রমাগতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে৷ এই সব বক্তব্য এবং পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকার দেশে এবং বিদেশে এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে যে জঙ্গিবাদ এবং ইসলামপন্থিদের বিপরীতে সেক্যুলারিজমের পক্ষে তারাই লড়াই করছেন এবং সেক্যুলার শক্তি হিসেবে কেবল তারাই বিবেচিত হতে পারেন৷

২০১৪ সালের বিতর্কিত একপাক্ষিক নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের শাসনের প্রক্রিয়ায় বল প্রয়োগ প্রাধান্য লাভ করেছে এবং বল প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলো অভাবনীয় ক্ষমতা লাভ করেছে৷ ক্ষমতাসীনরা তাদের নৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে উপস্থিত করেছে দুটি আদর্শ – উন্নয়ন এবং ইসলামপন্থার মোকাবেলা৷ সরকার উন্নয়নের একটি সীমিত ধারণাকেই গ্রহণ করেছেন যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে লক্ষ্য, বিপরীতক্রমে পরিবেশ রক্ষা বা মানবিক উন্নয়নের দিকটি অবহেলিত হচ্ছে; এই ধরনের উন্নয়ন ধারণা একাধারে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়াচ্ছে৷ রাজনীতির মতোই দেশের অর্থনীতিতে সকলের অংশ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে৷ রাজনীতির ওপরে প্রভূত নিয়ন্ত্রণ আরোপ, নাগরিকদের ওপরে ব্যাপক নজরদারির ব্যবস্থা তৈরি এবং বলপ্রয়োগ সহ প্রচলিত আইনের অপব্যবহার সরকারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়েছে৷ কিন্তু তাতে করে সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর, বিশেষত অনিশ্চয়তা, ভীতি এবং নিরাপত্তাহীনতার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার আশু সমাধান তৈরি হচ্ছে না৷ 

এই সমাধানের জন্যে দরকার আদর্শিক দিক-নির্দেশনা৷ সেটি আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকরা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ‘সেক্যুলারিজমকে' বিবেচনা করেছে এবং তার প্রকাশ হিসেবে ‘ইসলামপন্থার' বিরুদ্ধে সংগ্রামকে হাজির করে আসছে৷ এখানে মনে রাখা দরকার যে পৃথিবীর যে কোনো দেশের মতোই বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির বিভিন্ন ধারা রয়েছে৷ ক্ষমতাসীন দল ও তার সমর্থকরা ইসলামপন্থার বিরোধিতা বলতে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামের বিরোধিতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে৷ ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই ধারায় বিভক্ত করে ফেলার প্রবণতা প্রাধান্য লাভ করে৷ সেখানে ইসলামপন্থিদের প্রতীক হিসেবে হেফাজতকেই চিহ্নিত করা হয়৷ হেফাজত ইসলামপন্থিদের তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের নেতা ও কর্মীদের অধিকাংশই এসেছেন দেশের দেওবন্দী ধারার কওমি মাদ্রাসা থেকে৷ এই শক্তির উত্থানের এবং শক্তি সঞ্চয়ের কারণ একাধিক, তবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামপন্থি রাজনীতিতে শূন্যতা৷ এই ধরনের দল এবং সংগঠন কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেনি৷

যারা বাংলাদেশের রাজনীতিকে সেক্যুলার এবং ইসলামপন্থিদের বিরোধ এই কাঠামো বা ফ্রেমে দেখাতে চেয়েছেন তারা সহজেই হেফাজতকে ‘ইসলামপন্থিদের প্রতিনিধি' হিসেবে উপস্থাপন করেছেন৷ হেফাজতের নেতারাও সেই পরিচয়কে ধারণ করেছেন৷ হেফাজতের কওমি মাদ্রাসা নির্ভর অবস্থানের ফলে হেফাজত বিষয়ক আলোচনায় কওমি মাদ্রাসা প্রসঙ্গটি প্রাধান্য লাভ করে৷ কিন্তু সেই আলোচনায় মূলধারার রাজনীতি এবং শিক্ষার বিষয়ের বাইরে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনা প্রধান হয়ে ওঠে৷ এই ধরনের অভিযোগ তোলা এবং গুরুত্ব দেয়া হয় যে, কওমি মাদ্রাসাগুলো ‘জঙ্গি' তৈরি করে৷ সংখ্যার বিবেচনায় দেশে যত কওমি মাদ্রাসা রয়েছে এবং যে পরিমাণ শিক্ষার্থী তাতে শিক্ষা লাভ করে তাঁর তুলনায় দেশের জঙ্গি সংগঠনে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ সামান্য৷ এ ধরনের যোগাযোগ একেবারেই নেই বা ছিলো না তা বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি যেভাবে ও যে ভাষায় এই অভিযোগ তোলা হয় তাতে মনে হয় যে সব কওমি মাদ্রাসাই জঙ্গি তৈরি করে চলেছে – যে অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি৷ বিপরীতক্রমে দেশের কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো এবং দেশের আলেম সমাজের একাংশ এই সব অভিযোগকে একেবারেই নাকচ করে দিয়েছেন, তাঁরা প্রায়শই একে ‘ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণার' অংশ হিসেবেই দেখাতে চেয়েছেন৷ তারা যে সব মাদ্রাসা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ এবং প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিয়েছেন বলেও শোনা যায়নি৷

জঙ্গিবাদের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি একার্থে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এবং পশ্চিমা বিশ্বের নীতি নির্ধারকদের একাংশের অব্যাহত প্রচারণার সঙ্গেও যুক্ত৷ এই সময়ে পাকিস্তানে অবস্থিত কিছু মাদ্রাসার সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানের সংশ্লিষ্টতা, বিশেষত কয়েকটি মাদ্রাসা থেকে তালেবান নেতৃবৃন্দ ও তাদের অনুসারীদের এক বড় অংশের শিক্ষা লাভের প্রেক্ষিতে এই ধারণা প্রচার করা হয় যে, দেওবন্দী ধারার অনুসারী পাকিস্তানি মাদ্রাসাগুলো জঙ্গিবাদের উৎস; একই অভিযোগ ওঠে আহলে হাদিসের অনুসারীদের মাদ্রাসার বিষয়েও৷ বাংলাদেশেও দেওবন্দ ধারার মাদ্রাসা এবং আহলে হাদিস ধারার মাদ্রাসাগুলোকে একত্রে বিবেচনা করে তাঁদেরকেই জঙ্গিবাদের উৎস হিসেবে দেখানো হতে থাকে৷

ফলে সেক্যুলারিজমের পক্ষাবলম্বন, ইসলামপন্থি রাজনীতির বিরোধিতা, জঙ্গিবাদ মোকাবেলা সব এক কাতারে ফেলে হেফাজতকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়৷ এর পেছনে থাকে দুটি বিবেচনা – প্রথমত এতে করে মূলধারার রাজনীতির বিরোধী দল, বিশেষত বিএনপি, যে দলগতভাবে নিজের বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন ধরনের মামলার কারণে ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাকে কার্যত অর্থহীন করে তোলা সম্ভব হবে; দ্বিতীয়ত ক্রমবর্ধমান নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কাছে রক্ষণশীল, গ্রাম-নির্ভর কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইসলামপন্থিদের কোনও গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না বলে হেফাজত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হবে না৷ এই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ দেখাতে পারবে যে দেশের রাজনীতিতে উপস্থিত বিকল্প হচ্ছে দুটি - অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ইসলামপন্থিরা যাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে অথবা বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা নিজেরা৷ আদর্শিকভাবে পরস্পর বিরোধী দু'টি সুস্পষ্ট অবস্থানকে চিহ্নিত করা যাবে৷ ফলে আদর্শিক এবং সাংগঠনিকভাবেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ লাভবান হবে৷

কিন্তু ২০১৫ সাল থেকেই এটা বোঝা যায় যে এই ধরনের বিবেচনাপ্রসূত রাজনৈতিক কৌশল, যা রাজনীতিকে ইসলামপন্থি এবং সেক্যুলারপন্থি এই বিভাজনের দিকে নিয়ে যায়, তা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্যে প্রত্যাশিত ফল নাও বয়ে আনতে পারে৷ যে কারণে ২০১৫ সালে জঙ্গিদের হাতে নিহত ব্লগারদের ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে৷ ব্লগারদের উপর্যুপরি হুশিয়ারি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া যাবে না বলে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বেশুমার ব্যবহার এই পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে৷ এগুলোকে যারা সাময়িক বলে বিবেচনা করেছেন তারা নিশ্চয় এখন উপলব্ধি করতে পারছেন যে সেগুলো আসলে আওয়ামী লীগের অবস্থানগত পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিলো৷

এখানে বলা দরকার যে বাংলাদেশের সমাজের ইসলামিকীকরণের ধারা দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে কিন্তু গত এক দশকে তার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে৷ অন্ততপক্ষে তার উপস্থিতি আমরা সহজেই দেখতে পাই৷ বাংলাদেশে গত এক-দেড় দশকে যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে তাদের মধ্যে দৃশ্যমানভাবে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুভূতিশীল হবার প্রবণতা লক্ষণীয়৷ এই অনুভূতিশীলতা বা সংবেদনশীলতার মাত্রা এবং কারণ বিষয়ে গবেষণালব্ধ কোনো কিছু আমরা এখনও পাইনি৷ এ কথার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে দূরত্ব রাখার প্রশ্নে এই নতুন শ্রেণি উৎসাহী নয়, আবার এটাও আমরা জানিনা যে এই শ্রেনী এই দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলতে চান কিনা৷ কিন্তু বাংলাদেশে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই প্রবণতাকে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই অবজ্ঞা করা সম্ভব নয় যদি না তারা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে আদর্শিক অবস্থান থেকে সংগ্রাম করতে উৎসাহী হন৷ এই আদর্শিক সংগ্রাম কেবল কথার কথা নয়, কিংবা ক্ষমতায় থাকার রাজনীতিক কৌশল নয়৷ এই ধরনের সংগ্রামের অত্যাবশ্যক শর্ত হচ্ছে গণতান্ত্রিক এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্র সকলের জীবন এবং মতকে রক্ষার অঙ্গীকার পালন করবে৷

ধর্ম ও রাজনীতি প্রশ্নে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে এবং পরে আওয়ামী লীগের যেমন অবস্থানগত পার্থক্য রয়েছে তেমনি ২০১৩ সালের আগের এবং পরের অবস্থানেও পার্থক্য আছে৷ ২০১৩ সালের পরে আওয়ামী লীগের এই অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে তার দূরত্ব কমে আসে, কিন্তু তা এই প্রশ্নও উপস্থিত হয় যে কোনও ইসলামপন্থিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব৷ বিরাজমান রাজনীতির দৃশ্যপটে যে সমস্ত ইসলামপন্থি শক্তি রয়েছে আওয়ামী লীগ তার থেকেই পছন্দ করেছে৷ ২০০৬ সালে খেলাফত মজলিশের সঙ্গে ঐক্য করার ক্ষেত্রে যদি আসন্ন নির্বাচন বিবেচিত হয়ে থাকে তবে ২০১৭ সালে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতার কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরাজমান বাস্তবতা৷ হেফাজতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা বিষয়ে আলোচনার সময় অনেকেই বিস্মিত হন যে, ৬ এপ্রিল ঢাকায় ইসলামপন্থিদের আরেক অংশের একটি বিরাট সমাবেশ হয়েছে এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতাও দিয়েছেন৷ ইসলামপন্থিদের এই দুই অংশের মধ্যে পার্থক্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের ইসলামীকিকরণের প্রশ্নে পার্থক্য নেই এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন এবং তাদের দাবি মেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করা হচ্ছে৷ বাংলাদেশের রাজনীতি যে ইসলামপন্থিদের বক্তব্য এবং তাদের বিষয়ে আলোচনা দিয়েই চালিত হবে সেটা ২০১২ সালেও সম্ভবত অবিশ্বাস্য মনে হতো৷

Ali Riaz (Privat)

আলী রীয়াজ, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

কো-অপটেশন, পশ্চাদপসারন না ‘আদর্শিক' পরাজয়ের সূচনা?

হেফাজতের সঙ্গে সরকারের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাকে অধিকাংশ মানুষই আপস বা সমঝোতা বলেই বর্ণনা করছেন৷ মাদ্রাসা শিক্ষার স্বীকৃতি একটি উপলক্ষ্য, উপাদান বা প্রমাণ বলেই অনেকের ধারণা৷ তবে কেউ কেউ এও মনে করেন যে এতে করে আওয়ামী লীগ তাঁর একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে৷ ২০১৩ সালের মে মাসের পরে হেফাজত যেহেতু বিভিন্নভাবে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে সেহেতু সে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিলো এমন মনে করার কারণ নেই৷ ক্ষমতাকে সংহত করার জন্যে প্রতিপক্ষকে কো-অপ্ট করা বা নিজের কাছে নিয়ে আসার উদাহরণ বিরল নয়৷ ইসলামপন্থি – যারা সরকারের উদ্যোগে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে ঢাকায় সমবেত হয়েছিলেন এবং যারা হেফাজতের অংশীদার – তাদের সঙ্গে এই আপস সেই ধরনের কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে আমরা বিবেচনা করতে পারতাম যদি এই সম্পর্ক তৈরি হতো পারস্পরিক দেয়া-নেয়ার মধ্য দিয়ে এবং ক্ষমতাসীনদের কথিত আদর্শিক অবস্থানের প্রতি সরকারের বাইরে থাকা শক্তি সমর্থন জ্ঞাপন করতো৷

কিন্তু যা সহজেই দেখা যাচ্ছে তা হল ইসলামপন্থিদের মধ্যেকার তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল অংশের অবস্থানকে মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে একমত হচ্ছে৷ আমি আগেও বলেছি এটা একদিনে হয়নি এবং আমরা তার ধারণা পাচ্ছি অন্তত দুই বছরে ধরে৷ অর্থাৎ গত দুই বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলেই আওয়ামী লীগ এবং দেশ এই অবস্থায় উপনীত হয়েছে৷ একে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাদের অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে পশ্চাদপসারন বলেই ভাবতে পারেন৷ কিন্তু তারা সেটা ভাবুন অথবা নাই ভাবুন যেটা বিবেচ্য সেটা হচ্ছে এতে করে ২০১৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার নৈতিক এবং আদর্শিক ভিত্তি বলে যে দুটি বিষয়কে দাবি করা হচ্ছিলো (উন্নয়ন এবং ইসলামপন্থার বিরোধীতা) তার একটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়লো কিনা৷

সেই বিবেচনায়ই কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতিকে সীমিতভাবে দেখার সুযোগ নেই৷ একে বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করতে হবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়