1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

মুক্তিযুদ্ধ

একাধিক মৃত্যুকূপের তীর থেকে বেঁচে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা শিখা

ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন কিশোরী শিখা চক্রবর্তী৷ যেন আগে থেকেই তিনি জানতেন যে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে যোগ দিতে হবে তাঁকে৷ এখনও নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের একজন শুটার তিনি৷

Shikha Chakrabartee, Freiheitskämpferin 1971, Narayangonj, Bangladesch Foto: Swapnil Bhattacharya, Datum: 10.10.2011

শিখা চক্রবর্তী

‘‘যুদ্ধ শুরু হলে আমার বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন সপরিবারে ভারত চলে যাওয়ার৷ আমরা ছয় ভাই-বোন এবং বাবা-মা রওয়ানা দিলাম৷ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কুমিল্লা পৌঁছলাম৷ সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় এক কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি৷ রশিদ মিয়ার বাড়ি৷ সেখানে মিষ্টি আলু সিদ্ধ, ভাতের মাড় এবং খুদের জাও খেতে দেয় আমাদের৷ এরপর গোয়াল ঘরে ইট মাথায় দিয়ে ঘুমাতে হয়৷ এর মধ্যে রাত ২/৩ টার দিকে বিশাল মশাল জ্বালিয়ে রশিদ মিয়ার বাড়িতে একদল ডাকাত এসে হাজির৷ আমার বাবা খুব ভয় পেয়ে যান৷ কিন্তু রশিদ মিয়া অভয় দিয়ে বলেন আপনারা স্রষ্টাকে ডাকতে থাকুন৷ ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷ আমি সব ব্যবস্থা করবো৷ ডাকাত দল দরজায় আঘাত করলে রশিদ মিয়া গিয়ে দরজা খোলেন৷ তারা রশিদকে জিজ্ঞেস করে, তিনি বাড়িতে কোনো হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন কিনা৷ তিনি তা অস্বীকার করেন৷ বলেন, না আমি কোনো হিন্দু পরিবারকে জায়গা দিইনি৷ ডাকাতরা কোরআন শরিফ ছুঁয়ে দিব্যি খাওয়ার কথা বলে৷ রশিদ মিয়া ঘর থেকে কোরআন শরিফ এনে তা মাথায় ও বুকে ছুঁয়ে কসম করে বলেন, তিনি কোনো হিন্দুকে বাড়িতে আশ্রয় দেননি৷ ফলে ডাকাতরা তাঁর কথা বিশ্বাস করে চলে যায়৷ আমার মা রশিদ মিয়াকে বলেন, আপনি এ কী করলেন, দাদা? কোরআন শরিফ নিয়ে কসম করলেন, আপনার কোনো ক্ষতি হবে না তো? তিনি উত্তর দেন, না দিদি, আপনারা আট জনের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমি এটা করেছি৷ এতে কোনো ক্ষতি হবে না৷''

নারায়ণগঞ্জ থেকে ভারত পাড়ি দেওয়ার সময় এভাবেই বেশ কয়েকবার মৃত্যুকূপের তীর থেকে বেঁচে গেছেন শিখা এবং তাঁর বাবা-মা, ভাই-বোন৷ তিনি জানান, ছয় ভাই-বোন এবং বাবা-মা যখন শীতলক্ষা নদী পার হওয়ার জন্য নৌকায় ওঠেন, তখন বেশ কাছেই পাকিস্তানি সেনাদের দেখতে পান তাঁরা৷ কিশোরী মেয়ে হিসেবে শিখাকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে তাঁর বাবা শিখাকে নৌকার পাটাতনের নীচে লুকিয়ে রেখেছিলেন৷ এছাড়া তাঁর এক বছর বয়সি ছোট্ট বোন কাঁদছিল বলে নৌকার অপর যাত্রীরা তাঁর মাকে বলেছিলেন ছোট্ট শিশুটিকে গলা টিপে নদীর পানিতে ফেলে দিতে৷ তবে এতোটা নির্দয়-নিষ্ঠুর হওয়া সম্ভব ছিল না তাঁর মায়ের পক্ষে৷ ছোট্ট বোনটির মুখে ফিডার দিয়ে কোনো রকমে চুপ করানো হয়েছিল৷ এরপর আবারও সীমান্ত পার হওয়ার জন্য দালাল ধরতে গিয়ে এক ডাকাতের হাতে পড়ে যান তাঁরা৷ তবে সেই দফাও স্বয়ং সেই ডাকাতের বৌ-ছেলের সহযোগিতার কারণে প্রাণে বেঁচে যান৷ অপর দালাল ধরে তখনকার দিনে ৩০০ টাকা দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত পৌঁছেন শিখা এবং তাঁদের পরিবার৷

Shikha Chakrabartee mit Ihrem Mann, Sohn und Tochter. Shikha Chakrabartee, Freiheitskämpferin 1971, Narayangonj, Bangladesch Foto: Swapnil Bhattacharya, Datum: 10.10.2011

স্বামী বিমান ভট্টাচার্য, এবং ছেলে স্বপ্নিল ও মেয়ে শতাব্দীর সাথে মুক্তিযোদ্ধা শিখা চক্রবর্তী

১৯৫৬ সালের পহেলা জুলাই নারায়ণগঞ্জের মিশনপাড়ায় জন্ম সাহসী নারী শিখা চক্রবর্তীর৷ পিতা কৃষ্ণ কমল চক্রবর্তী এবং মা অনিতা চক্রবর্তী৷ বৈবাহিক সূত্রে শিখা ভট্টাচার্য হিসেবে পরিচিত৷ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর সময় মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী শিখা৷ এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি৷ কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কারণে সেবছর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি৷ পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে গিয়ে হাজির হন ভারতের ত্রিপুরায় সূর্যমনি শিবিরে৷ পরে বিজয়নগর শিবিরে যান তাঁরা৷ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাই এডওয়ার্ড কেনেডি ঐ শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বলে জানান শিখা৷

এরপর বাবা-মার অনুমতি নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নেন শিখা৷ তবে শুটিং-এ দক্ষতা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি তাঁর৷ বরং তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিয়ে আগরতলায় অবস্থিত জিবি হাসপাতালে দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত তিনি সেখানে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় রত ছিলেন৷ অনেক সময় যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত মুক্তিসেনাদের বিভৎস অবস্থা দেখে রাতে ঘুমাতে পারতেন না, খেতেও পারতেন না শিখা এবং তাঁর সহকর্মীরা৷ সেখানে তৎকালীন ‘কে' ফোর্সের প্রধান যুদ্ধাহত জেনারেল খালেদ মোশাররফের পরিচর্যা করেন তিনি৷

দেশ স্বাধীন হলে ২৮শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে আসেন শিখা এবং তাঁদের পরিবার৷ কিন্তু এসে দেখেন বাড়িঘর সব লুটপাট হয়ে গেছে, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তবুও জন্মভূমিতে স্বাধীনভাবে নতুন জীবন শুরু করেন তাঁরা৷ পরে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে যোগ দেন তিনি৷ এখনও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বুকে নিয়ে আগরতলার জিবি হাসপাতালের মতোই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন এই সাহসী ও ত্যাগী নারী মুক্তিযোদ্ধা৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই

সম্পাদনা: দেবারতি গুহ

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও