1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সাক্ষাৎকার

‘এই আইনের কারণে বাল্যবিয়ে আরো বাড়তেই পারে’

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে এখনো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংশোধন সম্ভব৷ কিন্তু আইনের সংশোধন যদি না হয়? ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক মনে করেন সেক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি৷

ডয়চে ভেলে: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে মেয়েদের স্বার্থরক্ষা কতটুকু হয়েছে?

ব্যারিস্টার সারা হোসেন : সম্পূর্ণভাবে হয়নি৷ সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের পুরনো যে আইন ছিল, সেখান থেকে যে পরিবর্তন নতুন আইনের মধ্যে পেয়েছি, কিছু কিছু ইতিবাচক দিক আছে অবশ্যই, সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সমন্বয় কিভাবে করা যেতে পারে বাল্যবিয়ে নিরোধের জন্য সে ব্যাপারে কিছু দিক নির্দেশনা বা ধারাগুলো দেয়া আছে৷ পাশাপাশি আমাদের কাছে মনে হচ্ছে মেয়েদের অধিকার রক্ষা করা হয়নি, বরং এই আইন মেয়েদের অধিকার রক্ষা করার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ সেখানে এটা প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ আমলে আমরা পাইনি, পাকিস্তান আমলে আমরা পাইনি, অথচ স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে এমন একটা ধারা আমরা পাচ্ছি৷ বিশেষ কোনো কারণে ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হলে সেটাকে বাল্যবিয়ে হিসেবে গ্রহণ করা হবে না, যদি তার পিতা-মাতা বা অভিভাবকের অনুমোদন থাকে এবং আদালতের অনুমোদন থাকে৷ এখানে অনেকে এই ধারাটা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যেহেতু এখানে মেয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি, অথচ আমাদের শরীয়া আইনেও মেয়ের সম্মতির বিষয়টির অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ বলা হয়েছে, তার সিদ্ধান্ত ছাড়া বিয়েই হতে পারে না৷ অথচ আমাদের আইনে তার সম্মতির বিষয়ে কোনো উল্লেখই নেই৷

অডিও শুনুন 09:30

‘‘যদি অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার জন্য তারা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সুযোগ না পায়’’

 

এটা কি মেয়েদের অধিকার লঙ্ঘন ঘটাবে? নাকি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে?

বিশেষ বিধান যেটা রাখা হয়েছে সেটা মেয়েদের অধিকারের লংঘন ঘটাবে৷ সেখানে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে যে, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে অথবা তার মতের বাইরে কেউ তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে এবং সে গর্ভবতী হয়েছে,সেখানে যদি তার বাবা-মা মনে করে তথাকথিত ইজ্জত রক্ষার জন্য তার সেখানে বিয়ে দেয়া উচিত, সেখানে কিন্তু একটা মেয়েকে তার ধর্ষণকারীর সঙ্গেও বিয়ে দেয়া যাবে৷ যদি আদালত অনুমোদন দেয়৷ এ রকম ঘটনা যদি ঘটে যায়, সেখানে নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি মেয়ের অধিকার খর্ব হবে৷ 

সরকার হঠাৎ করে এই বিশেষ বিধান কেন করতে গেল?

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, নারীরা ১৬-১৭ বছর বয়সে নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করে ফেলছে৷ বা কারো সঙ্গে সম্পর্ক করে ফেলছে বাবা-মায়ের মতের বাইরে৷ সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, ওই সমস্ত ক্ষেত্রে যাকে সে বিয়ে করেছে, তার বিরুদ্ধে মামলা করা বা তাদের দু'জনকে আরো বেশি বেকায়দায় ফেলা দেয়া বা অসুবিধার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়৷ সেই সব ক্ষেত্রে হয়তো কিছু ব্যতিক্রম রাখা যেতেই পারে৷ কিন্তু ওই ধরনের ঘটনা শুধু কাভার না করে আরো ব্যাপকভাবে বিশেষ বিধানে রাখা হয়েছে৷ আল্টিমেটলি বিশেষ বিধানটা যেভাবে এসেছে তার প্রতিবাদ বাংলাদেশে সকল নারী সংগঠন থেকে করা হয়েছে, মানবাধিকার সংগঠন করছে, অধিকাংশ প্রগতিশীল আইনজীবী করছেন, উন্নয়ন নিয়ে যেসব বেসরকারি সংগঠন কাজ করে তারাও প্রতিবাদ করে যাচ্ছে৷ এই প্রতিবাদের মুখে কেন বিশেষ বিধানটা রাখা হলো সেটা বোঝা অনেক কঠিন৷ ইতিমধ্যে হাইকোর্ট থেকে একটা রুল জারি করা হয়েছে৷ সরকারকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে যে, কেন এই বিধানকে সংবিধান সম্মত নয় এমন ঘোষণা দেয়া হবে না৷

এক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কোনো চাপ আছে বলে আপনার মনে হয়?

আড়ালে হয়ত ছিল৷ মুখে মুখে অতটা শোনা যায়নি৷ সামনা-সামনি তো তাদের কিছু বলতে শুনিনি৷ সেটাও মনে হয় একটা আশঙ্কার কারণ৷ ধর্মীয় বলব না, মৌলবাদী দলগুলো যদি প্রকাশ্য কোনো আপত্তি না করে থাকে তাহলে তারা বিরোধিতা করতে পারে এমন ধারণা থেকে সরকার আগ বাড়িয়ে কেন এটা করতে যাবে? শরীয়া আইনে কিন্তু এটা পরিষ্কার, আমাদের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনেও কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, একটা মেয়ে যখন সাবালিকা হবে, তখন তার সম্মতি ছাড়া তাকে কোনোভাবেই বিয়ে দেয়া যাবে না৷ শরীয়া আইনে যেটা আছে, এখানে এই আইনে সেটাও উপেক্ষা করা হয়েছে৷

এই আইন কি মেয়েদের শিক্ষা অর্জনে  বাধা সৃষ্টি করবে?

বাধা সৃষ্টি করতেই পারে৷ আমরা যদি দেখি যে, এই আইনটা ব্যবহার করে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদের সম্মতির বাইরে, তাহলে তাদের শিক্ষায় একটা বাধা আসতেই পারে৷ সরকার থেকে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে, বা যে পদক্ষেপগুলো অনেক বছর ধরে চলে আসছে যে, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার জন্য যে ভর্তুকি দেয়া হয় বা এখন আমরা যে ঘোষণাগুলো পাচ্ছি যে মেয়েদের জন্য আরো বেশি করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, এ সব নীতি ও ঘোষণার কারণে বাংলাদের নারীদের পরিবর্তন আসছে৷ অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে৷ অন্যদিকে যদি আমরা দেখি যে, অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার প্রবণতা যদি আগের মতোই থেকে থাকে, তাহলে তো আমরা বলতেই পারি যে, এই আইন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে৷ 

কর্মক্ষেত্রে কি এর প্রভাব পড়বে?

পড়তে পারে৷ যদি অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার জন্য তারা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সুযোগ না পায়৷ অল্প বয়সে বিয়ে হলে দেখা যায় যে, তারা অল্প বয়সে গর্ভবতী হচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে তারা ঘর পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে৷ তখন তো তারা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে৷ তখন তো ওই সুযোগগুলো তার জন্য প্রযোজ্য হবে না৷

ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি৷ ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়৷ আমাদের দেশে অভিভাবকরা এমনিতেই মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিতে চায়৷ এতদিন বিশেষ বিধান ছিল না৷ এখন তা করার ফলে সমস্যা কি বাড়বে না? 

আমরা আশঙ্কা করছি সমস্যা বাড়বে৷ এখন ঝুঁকিটা হচ্ছে এই কারণে যে, আগের আইনটা যখন করা হয় ১৯২৯ সালে, তখন তো গণমাধ্যম বা প্রচারের ব্যবস্থা অতটা সহজ ছিল না৷ অনেক বছর লেগেছে সবাইকে বোঝাতে যে, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ আর ছেলে ২১৷ কিন্তু গত এক দুই বছরে নতুন আইনটা নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, তখন গণমাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়ে গেছে৷ এই আলোচনার কারণে মাঠ পর্যায়ে আমরা এখন বলতে শুনছি, শহরেও অনেক জায়গায় এটা শুনছি যে, ও তাহলে মেয়েদের বিয়ে এখন যে কোনো বয়সে দেয়া যাবে৷ অথচ আইন কিন্তু এটা বলছে না৷ শুধু বিশেষ বিধানের ক্ষেত্রে এটা বলা হচ্ছে৷ আসলে আইন কিভাবে হয়েছে, প্রচার কিভাবে হচ্ছে বা মানুষ কিভাবে সেটা বুঝছে এসব কারণেই আমরা অনেক বেশি রিস্কে থাকব৷ আমাদের আশঙ্কা – কম বয়সে বিয়ের হার বেড়ে যেতেই পারে৷ 

নারী সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ থাকলেও সরকার খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, এর কারণ কী?

আইনটা তো তারা ওভাবেই পাশ করে ফেলছেন৷ আর এটা দুর্ভাগ্য যে, সংসদে যে নারী প্রতিনিধিরা আছেন বা যারা প্রগতিশীল বা যারা মানবাধিকারে বিশ্বাসী, আমি আশা রাখতে চাই যে অধিকাংশই এই কাতারের মধ্যে পড়েন, তারা কেউ তেমন কোনো প্রশ্নও তুললেন না, বক্তব্যও রাখলেন না৷ এটাও একটা দুঃখের বিষয়৷

অন্য কোনো দেশের আইনের সঙ্গে আমাদের এই আইনের মিল আছে?

বিশেষ বিধান অন্যান্য অনেক দেশেই আছে৷ এই যে ধর্ষণ হয়ে গেলে ধর্ষণকারীর সঙ্গে বিয়ে দেয়া – এ রকম ধারাগুলোও আছে৷ কিছুদিন আগে তুরস্কে এমন একটি আইন করার কথা উঠেছিল৷ কিন্তু তুমুল প্রতিবাদের মুখে তুরস্কের সরকার শেষ পর্যন্ত আইনটি প্রণয়ন করলেন না৷ অন্যান্য দেশগুলোতেও আছে৷ এখন কথা হচ্ছে, অন্যান্য দেশগুলোতে যা-ই থাকুক না কেন আমাদের বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা আছে৷ আমাদের দেশে নারীদের প্রতিনিধিত্ব যেখানে রাজনীতিতে-সরকারে রয়েছে, এখানে আমরা ইতিমধ্যে অনেক ধরনের অর্জন করে ফেলেছি, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে, সেখানে বিষয়টি সকলের কাছে জানা বা গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, সেখানে তো আমাদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে৷ অন্য ১০ জনের মতো না করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমাদের আইনগুলো তৈরি করা উচিত৷ বিশেষ বিধান যেটা রাখা হয়েছে সেটা বেশি ঢালাও৷ এটা আরো সংকীর্ণ করে রাখা যেত৷ আমি এখনো আশা রাখছি, যারা এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার, তাদের সঙ্গে যদি আলোচনা করা যায় তাহলে এখনো এটা সংশোন করা সম্ভব৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়