1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ইরাক

ইরাকে মানসিক বিপর্যয়ের মুখে শিশুরা

ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর জঙ্গি কার্যক্রম এবং মোসুল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরা৷ খাদ্যের অভাবে তারা ভুগছে অপুষ্টিতে৷ সহিংসতার যে রূপ তারা দেখেছে, তা ভয়ংকর চাপ ফেলেছে মনোজগতেও৷

‘‘দেখো, সে এখন হাঁটতে পারছে!'' ৪৩ বছরের হানান মোহাম্মদ তার দু'বছরের শিশুকে দুই পায়ের ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন৷ মাত্র কিছুদিন আগেই মোসুল থেকে পালাতে পেরেছেন হানান৷ যুদ্ধের কারণে তার আগের কয়েক সপ্তাহ খাবার এবং পানির তীব্র অভাবে পড়তে হয় তাঁদের৷

তিনি বলেন, ‘‘দায়েশের (আইএসকে স্থানীয়ভাবে এ নামেও ডাকা হয়) কারণে আমাদের সবসময় ক্ষুধার্ত থাকতে হতো৷ কেনার মতো কিছু পাওয়া যেত না, পাওয়া গেলেও তার দাম হতো আকাশচুম্বী৷'' এ কারণেই তিনি তাঁর সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারেননি৷ অপুষ্টিতে তাঁর ছয় মাসের এক শিশু মারাও গিয়েছে৷ তার ছেলে হাঁটা শুরু করলেও, একই কারণে এক সময় হাঁটা বন্ধ করে দেয়৷

দুই ছোট শিশুকে নিয়ে সালামিয়াতে আশ্রয় নিয়েছেন হানান৷ মোসুল থেকে পালিয়ে আসা ইরাকিদের পুনর্বাসনে ক্যাম্প খোলা হয়েছে এখানে৷

ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া অনেকের সাথে আইএসের যোগাযোগ আছে৷ আইএস জঙ্গিদের সাথে সম্পর্ক থাকায় হানান তাঁর স্বামীকে তালাক দিয়েছেন৷ এর কিছুদিন পরেই এক বোমা হামলায় মারা যান হানানের স্বামী৷

ডিভোর্সের পর হানান তাঁর সন্তানদের নিয়ে তাঁর মা-বাবার সাথে থাকতেন৷ কিন্তু পরে আইএস তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয় এবং মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে৷ সেখানে কোনো খাবার বা পানি ছিল না৷ প্রতিনিয়ত চারপাশে বোমা পড়তে থাকতো৷ কেউ পালাতে চাইলে আইএস জঙ্গিরা তাদের হত্যা করতো৷

বড়দের মতোই শিশুরাও যুদ্ধের কারণে সমান এবং অনেকক্ষেত্রেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ ক্যাম্পটিতে শত শত শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বলে জানালেন দাতা সংস্থা সামারিটান পার্স-এর কেলি নাউ৷ এই ক্যাম্পে শিশুদের বিশেষ খাবার দেয়া হয়৷ মাদের বোঝানো হয় বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা৷ ইরাকের বেশিরভাগ নারীর ধারণা, ৪০ দিন পর শিশুকে বুকের দুধের চেয়ে কেনা দুধ খাওয়ানো ভালো৷

মোসুল থেকে আসা শিশুদের শতকরা ৫ ভাগ ভুগছে অপুষ্টিতে৷ এদের মধ্যে কারো কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক৷ হানান মোহাম্মদের মতো অনেক মাই তাঁদের সন্তান হারিয়েছে৷ নদী অথবা কুয়া ছাড়া আর কোনো পানি সহজলভ্য ছিল না৷ পাওয়া যেত না গুড়ো দুধও৷ ‘‘এখানে আমি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, যা আমাকে সুদান বা ইয়েমেনেও মোকাবেলা করতে হয়নি'', বলছিলেন নাউ৷

শিশুদের আচরণ শিশুসুলভ নয়

কিন্তু অপুষ্টিই মোসুলের শিশুদের একমাত্র শত্রু নয়৷ যুদ্ধের সহিংসতা, হত্যা, বোমা হামলার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে তারা৷ আইএস-এর মোসুল দখলের পর গত তিন বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ শিশু এই ভয়াবহতার শিকার হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন ইরাকে ইউনেস্কোর ডেপুটি প্রতিনিধি৷

মোসুল যুদ্ধের শেষ দিকে প্রায়ই দেখা যেতো শিশুরা একা একাই চিকিৎসা কেন্দ্রে চলে আসছে৷ এদের কেউ কেউ অনেকদিন ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে ছিল, কেউ আবার মৃত্যুর গন্ধে ছেড়েই দিয়েছিল খাবার৷

শিশুদের আছে অন্য রকম বিপদও৷ বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে স্বামী যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর আইএস-এর সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চান মা৷ আর এ জন্য অতীত মুছে ফেলতে শিশুকে ফেলে রেখে যান ক্যাম্পের কাছাকাছি৷ সিরিয়া এবং ইরাকে আইএসবিরোধী মনোভাব যত তীব্র হচ্ছে, এমন অনেকশিশুর ভাগ্যও হচ্ছে দোদুল্যমান৷ আইএস জঙ্গিদের পরিবারের সাথে এ সব শিশুদেরও রাখা হচ্ছে একটি বিশেষ ক্যাম্পে৷

তিন বছর আগে অপহরণ হওয়া ইয়াজিদি শিশুদেরও উদ্ধার করা হয়েছে৷ এদের সবাই এখনও ভয়ংকর আতঙ্কিত৷ শারীরিক এবং মানসিক এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে শিশুদের বেশ কিছু সময় লাগবে বলে আশংকা করছেন চিকিৎসকরা৷

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই শিশুদের আচরণ ঠিক শিশুদের মতো নয়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা ‘‘রোবটের মতো আচরণ করে'', বলছিলেন সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষক এইলিন ম্যাককার্থি৷

বেশিরভাগ শিশুই পরিবারের সদস্য হারিয়েছে, অনেকেই দুঃস্বপ্ন দেখে এবং মাঝেমধ্যেই আক্রমণাত্মক আচরণ করে৷ শিশুদের সাথে নানারকম খেলা খেলে তাদের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হচ্ছে৷ একইসাথে শিশুদের বাবা-মাকেও মানসিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরাও তাঁদের সন্তানকে সাহায্য করতে পারেন৷

দ্রুত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন ম্যাককার্থি৷ তা না হলে একসময় এই শিশুদের হতাশা থেকে শুরু করে অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়তে হতে পারে বলে আশংকা তার৷ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী এই শিশুরা বড় হলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়াতে পারে এই ট্রমা৷

এই সমস্যার সমাধানে সেভ দ্য চিলড্রেন কাজ করছে ইরাকি সরকারের সাথে৷ তবে ম্যাককার্থি বলছিলেন, এক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে মানসম্মত থেরাপিস্টের অভাব৷

কিন্তু গবেষকরা বলছেন, যদি ইরাকে চলমান সংঘর্ষের মূল কারণ চিহ্নিত ও সমাধান না করা হয়, তাহলে এমন ঘটনা অনেকের সাথেই ঘটতে থাকবে৷ মানসিক এই রোগ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়লে পুরো সমাজই এতে আক্রান্ত হতে পারে বলেও আশংকা তাদের৷

জুডিট নয়রিংক/এডিকে

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়