1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

ইতিহাস যখন দেশপ্রেম শেখায়

ইতিহাস যুগে যুগে মানুষকে একটি সত্যই শেখায়, তা হলো পরিবর্তনশীল সমাজ যেন অতীতের ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র ও জাতিগঠনে নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে পারে৷ সেই লক্ষ্যে ইউরোপে নিজ অভিজ্ঞতার মধ্যে বাংলাদেশকে খুঁজেছেন লেখক৷

সাক্সেনহাউজেনের মূল ফটকে বড় বড় অক্ষরে লেখা – ‘‘কাজই তোমাদের মুক্ত করে''

‘‘কাজই তোমাদের মুক্ত করে''

আমার ছোট্ট মেয়ে নীলিমা এখন সতের৷ কলেজ শেষ করে প্যারিস ইউনিভার্সিটিতে ভাষা সাহিত্য ও ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করবে তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে সে এখন৷ সম্প্রতি ওর সাথে বিশ্বের চলমান ঘটনা ও মানবধিকার নিয়ে তুখোর আলোচনা চলছিল আমার৷ এক পর্যায়ে নীলিমা জিজ্ঞেস করে, ‘‘আচ্ছা পাপা, কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার কত দিন পরে ইতিহাসে স্থান পায়, একবছর, দশবছর, একশ’বছর পরে?'' তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দিতে পারিনি৷ তাই বলে উঠি, ‘‘আমার সাথে নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ‘সাক্সেনহাউজেন' দেখতে যাবি? সেখানেই পাবি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাসের বিভৎস নরহত্যার সন্ধান৷'' নীলিমা রাজি হয়ে গেল৷ পরদিনই আমরা বেরিয়ে পড়লাম বার্লিন থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের সেই বিভৎস নাৎসি জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে৷

সাক্সেনহাউজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ১৯৩৬ সনের জুলাই মাসে তৈরি হয় বার্লিনের উত্তরে ওরানিয়েনবুর্গে, নাৎসি পুলিশ প্রধান হাইনরিশ হিমলারের নিজস্ব উদ্যোগে৷ বার্লিন থেকে দূরত্ব বেশি না হওয়ায় নাৎসি বাহিনীর সর্বোচ্চ নজরদারিতে ছিল এই ক্যাম্পটি৷

১৯৩৬ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত ৯ বছরে শুধু এই সাক্সেনহাউজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেই দুই লক্ষ মানুষকে হত্যা করে নাৎসি বাহিনী৷ যাদেরকে হত্যা করে তাদের মাঝে ইহুদি ছাড়াও রোমা, সিন্টি, জিপসি, সমকামী এমনকি কমিউনিস্ট জার্মানরাও ছিল৷ এছাড়া প্রায় ১৩ হাজার যুদ্ধবন্দি সোভিয়েত সৈন্যও ছিল৷ তাদেরকেও গ্যাস চেম্বারে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হয়৷

৪০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে এই সাক্সেনহাউজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পটি পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য এখন উন্মুক্ত এক বিশাল জাদুঘর৷ প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পটি পরিদর্শন করেও পুরো শেষ করতে পারিনি৷ একসময় নীলিমা বলছিল, ‘‘কাঠের তৈরি শতাধিক ছোট ছোট ব্যারাকে বন্দিরা থাকত, যার উচ্চতা ২.৫ মিটার, চওড়া ৪ মিটার আর ৫৪ মিটার দীর্ঘ৷ একেকটি ব্যারাকে ৪০ জন বন্দি শুধু রাতে ঘুমাত৷ সারাদিন তাদের ব্যারাকের বাইরে বন্দি শিবিরে কাজ করতে হতো৷ তাই তো ক্যাম্পটির মূল ফটকে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, ‘‘কাজই তোমাদের মুক্ত করে৷''

আর অপেক্ষাকৃত কর্মঠ বন্দিদের প্রধান কাজ ছিল গ্যাস চেম্বারে মেরে ফেলা হাজার হাজার মানুষের লাশ মরা পোড়াবার চুল্লিতে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা৷ বন্দিদের মাঝে অনেক ডাক্তারও ছিল৷ তাঁরা বন্দিদের নিয়ে বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাত৷ তাই এক ফলকে লেখা ‘‘এখানে এক বাভেরিয়ান ডাক্তার বন্দি ১০৫ জন শিশুর উপর পরীক্ষা চালায়৷''

বর্তমান গণতান্ত্রিক জার্মান সরকার নাৎসিদের নিগ্রহের কাহিনি ও তার দলিল তথ্য উপস্থাপন করেছে৷ তাই হাজার হাজার মানুষ এই গণহত্যার কাহিনি অনুধাবন করার জন্য এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আসেন৷ স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীই বেশি চোখে পড়ল৷ দেখলাম, একদল স্কুল ছাত্র-ছাত্রী নরওয়ে থেকে একদিনের সফরে এসেছে৷ এই যুব সমাজ ইউরোপের ইতিহাস জানতে আর উপলব্ধি করতে অত্যন্ত আগ্রহী৷ মনে মনে শুধু ভাবলাম, আমরা কবে পারব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যুবসমাজের জন্য তথ্যসমৃদ্ধভাবে জাদুঘরে সাজাতে!

ফেরার পথে নীলিমাকে আরো একবার স্মরণ করিয়ে বললাম, জানো ৯ বছরে (১৯৩৩ - ১৯৪৫) ৬০ লক্ষের ও বেশি মানুষকে ইউরোপে হত্যা করেছে এই নাৎসি বাহিনী৷ আর শুধু এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেই ২ লক্ষ মানুষকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করেছে ওরা৷ কিন্তু মা তুমি তো জানো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাসে ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে৷’’ দেখলাম, নীলিমা একেবারে নিশ্চুপ৷ বাসায় ফেরার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি শুনতে চায় সে৷'’

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হয়েছে৷ কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম একটি চলমান যুদ্ধ৷ তাই যখন স্বাধীনতা বিরোধীরা ও যুদ্ধাপরাধীরা সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখায় ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ থেকে কমিয়ে দেখাবার চেষ্টা করে তখন মুক্তি সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের দরকার৷ এখনো মুক্তি পায়নি আমাদের গণতন্ত্র, এখনো সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় গোড়ামিমুক্ত হয়নি বাংলাদেশ৷ এখনো মুক্তির লক্ষ্যেই যুদ্ধ চলছে মুক্তমনা মানুষদের৷ সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো ‘নিরপেক্ষ চর্চা' প্রয়োজন৷

মোনাজ হক

সাক্সেনহাউজেনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মোনাজ হক

নীলিমা প্রশ্ন করলো, ‘‘আচ্ছা পাপা গণহত্যাই কি হলোকস্ট?'' বললাম, ‘‘হ্যাঁ, হলোকস্ট হলো ব্যাপক হত্যাকাণ্ড৷'' জাতিসংঘের গণহত্যাবিষয়ক কনভেনশনে গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পুরোপুরি বা আংশিক নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে যে হত্যাকাণ্ড সম্পাদিত হয়, তা-ই গণহত্যা৷ যেমনটি ঘটেছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে৷ ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত নাৎসি বাহিনী সারা ইউরোপে ৬০ লক্ষ ইহুদি, রোমা, সিন্টি, জিপসি ও সমকামী হত্যা করেছিল৷ ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে তুরস্কের অটোমান সম্রাট ১৫ লক্ষ আর্মেনীয় হত্যা করেছিল, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ৯ মাসে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছি পাকিস্তানি স্বৈর সরকার৷ '৭১-এর হলোকস্টের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে সমূলে উৎপাটন করা৷

মোনাজ হক, প্রকৌশলী ও ইউরো এশিয়া টুডের সম্পাদক

নির্বাচিত প্রতিবেদন